Home সংস্কৃতি ও বিনোদনসিনেমা ‘ইয়েস’: গণহত্যার উল্লাসের বিরুদ্ধে এক ইসরায়েলির চলচ্চিত্র

‘ইয়েস’: গণহত্যার উল্লাসের বিরুদ্ধে এক ইসরায়েলির চলচ্চিত্র

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
8 views 5 minutes read
A+A-
Reset

গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত পরিচালক নাদাভ লাপিদের বিতর্কিত ছবি নিয়ে মিশেল গোল্ডবার্গের মতামত

হাইলাইটস

  • ইসরায়েলি পরিচালক Nadav Lapid-এর নতুন ছবি Yes গাজা যুদ্ধের সময়কার ইসরায়েলি সমাজের কঠোর সমালোচনা।
  • ছবিতে এক সংগীতশিল্পীকে গাজায় গণহত্যা উদ্‌যাপনকারী নতুন জাতীয় সংগীত লিখতে বলা হয়।
  • ইসরায়েলে ছবিটি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে; অভিনেতাকে পর্যন্ত পুলিশ আটক করেছিল।
  • একই সঙ্গে ইউরোপের কিছু প্যালেস্টাইনপন্থী বামপন্থীও লাপিদকে বয়কট করার চেষ্টা করেছে।
  • লেখিকার মতে, যে শিল্পীরা নিজেদের সরকারের অপরাধের বিরোধিতা করেন, তাঁদের চুপ করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

২০২১ সালে ইসরায়েলি চলচ্চিত্র পরিচালক Nadav Lapid ফ্রান্সে চলে যান। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তাঁর দেশ একটি “সম্পূর্ণ নৈতিক পতনের” মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর, যখন গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে শুরু করে, তখন তিনি আবার ইসরায়েলে ফিরে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ—Yes—যা তাঁর মতে সেই নৈতিক পতনের সবচেয়ে নির্মম, তিক্ত এবং পরাবাস্তব প্রতিচ্ছবি।

Yes ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন সংগ্রামী পিয়ানোবাদক ও পার্টি-শিল্পী, যার নাম শুধু ‘ওয়াই’। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এমন একটি নতুন জাতীয় সংগীত রচনার, যা গাজায় গণহত্যাকে উদ্‌যাপন করবে। ছবির সেই গানটি বাস্তবে একটি ইসরায়েলি জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর ভিডিওতে ব্যবহৃত একটি গানের অনুকরণে তৈরি।

লাপিদের ছবিতে ইসরায়েলকে দেখা যায় এক গভীরভাবে আঘাতপ্রাপ্ত সমাজ হিসেবে, যেখানে জীবন পরিণত হয়েছে উন্মত্ত উৎসব, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং আত্মধার্মিকতার এক বেপরোয়া মিশ্রণে। লেখিকা মিশেল গোল্ডবার্গের ভাষায়, এটি যেন ২০২৩ সালের চলচ্চিত্র The Zone of Interest-এর একটি নতুন সংস্করণ—যেখানে আউশভিৎসের পাশের নাৎসি পরিবারের বদলে রয়েছে ইউরোভিশন-ধাঁচের উজ্জ্বল, চমকপ্রদ এক জগৎ।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। The Zone of Interest তৈরি হয়েছিল হলোকাস্ট শেষ হওয়ার বহু বছর পরে। কিন্তু Yes নির্মিত হয়েছে সেই সময়েই, যখন গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ চলছিল। ছবির নানা দৃশ্যে দূর থেকে বাস্তব গাজার ধ্বংস এবং বিস্ফোরণের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায়।


যুদ্ধের মধ্যে ছবি নির্মাণ

এমন একটি ছবি তৈরি করা সহজ ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং প্রবল জাতীয়তাবাদী আবেগে উন্মত্ত একটি দেশে কাজ করতে গিয়ে লাপিদকে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়।

ইসরায়েলের চলচ্চিত্র জগতের অনেকেই এই প্রকল্পে অংশ নিতে অস্বীকার করেন। এমনকি তাঁকে মেকআপ শিল্পী পর্যন্ত সার্বিয়া থেকে আনতে হয়েছিল। তিনি জানতেন, ছবির প্রকৃত বিষয়বস্তু সরকার বুঝতে পারলে নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।

এই আশঙ্কায় অভিনেতাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যেন তাঁরা সামাজিক মাধ্যমে ছবির কোনও তথ্য প্রকাশ না করেন। গাজার সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় তিনি প্রায় গোপন অভিযানের মতো করে শুটিং সম্পন্ন করেন।


ইসরায়েলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ছবিটি মুক্তির পর ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

ইসরায়েলের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘ওফির অ্যাওয়ার্ড’-এর অনুষ্ঠানের রাতে ছবির প্রধান অভিনেতা Ariel Bronz-কে পুলিশ আটক করে। অভিযোগ ছিল, তিনি কয়েক মাস আগে সামাজিক মাধ্যমে যে কবিতা পোস্ট করেছিলেন, তা নাকি সন্ত্রাসবাদে প্ররোচনা দিতে পারে।

সমালোচকদের কাছে Yes ছিল দেশদ্রোহিতার প্রতীক। কিন্তু আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটল ইউরোপে।


বামপন্থীদের একাংশের বয়কট

গাজার প্রতি সংহতির নামে ইউরোপের কিছু প্যালেস্টাইনপন্থী চলচ্চিত্রকর্মীও লাপিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

গত মাসে ফ্রান্সের Marseille International Film Festival-এ প্রায় এক ডজন চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমকি দেন যে, লাপিদ বিচারকমণ্ডলীতে থাকলে তাঁরা উৎসব বর্জন করবেন।

পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে লাপিদ বিচারকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হন। পরিবর্তে তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে একটি উন্মুক্ত মাস্টারক্লাস আয়োজনের কথা ছিল। কিন্তু সেটিও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায় চাপের মুখে।

লাপিদের বক্তব্য ছিল, তিনি বিচারক না হয়ে যদি উৎসবে শুধু হটডগ বিক্রেতা হিসেবেও উপস্থিত থাকতেন, তাহলেও এই প্রতিবাদকারীরা আপত্তি করতেন।


ইউরোপেও বিতর্ক

এটি প্রথম ঘটনা নয়।

স্পেনে তাঁর ছবি পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে প্রদর্শিত হয়েছে, কারণ বোমা হামলার হুমকি এসেছিল।

ইতালির এক পরিবেশক ছবিটি বিতরণ করতে অস্বীকার করেন। কারণ, তাঁর আশঙ্কা ছিল—একটি “গণহত্যাকারী রাষ্ট্র”-এর ছবি মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠতে পারে।

যদিও Yes বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসব Cannes Film Festival-এ প্রদর্শিত হয়েছে, তবু লাপিদের ধারণা, আরও অনেক উৎসব এবং পরিবেশক তাঁকে এড়িয়ে গিয়েছেন শুধু সম্ভাব্য বিতর্কের ভয়েই।


সমর্থনের ঢেউ

পরিস্থিতি পরে বদলাতে শুরু করে।

ফরাসি চলচ্চিত্র জগতের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি লাপিদের সমর্থনে প্রকাশ্য চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন প্যালেস্টাইনি বুদ্ধিজীবী Elias Sanbar এবং অভিনেত্রী Natalie Portman।

সেই চিঠিতে বলা হয়, ইসরায়েলি, রুশ বা ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের তাঁদের সরকারের অপরাধের জন্য দায়ী করা যায় না, বিশেষত যখন তাঁরা নিজেরাই সেই অপরাধের বিরুদ্ধে সরব।

চিঠিতে আরও বলা হয়, কোনও রাষ্ট্র অপরাধ করলেই সেই দেশের ভিন্নমতাবলম্বী শিল্পীদের সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা উচিত নয়।


সংস্কৃতির জগতে ভয়ের রাজনীতি

লাপিদের মতে, এই ঘটনার জন্য কেবল প্রতিবাদকারীরা দায়ী নন। আরও বড় দায় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলির।

তাঁর বিশ্বাস, অধিকাংশ উৎসব পরিচালক বা পরিবেশক আসলে ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন প্রশ্ন নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবেন না। তাঁরা শুধু ঝামেলা এড়াতে চান।

একসময় বিতর্ক, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক প্রশ্নই সিনেমাকে প্রাসঙ্গিক এবং আকর্ষণীয় করে তুলত। এখন সেখানে সতর্কতা ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা কাজ করছে।

ফলে সমকালীন জীবনের অস্থিরতা, বিভ্রান্তি এবং ভয়াবহ বাস্তবতা খুব কম চলচ্চিত্রেই প্রতিফলিত হয়।


কেন এই ছবি দেখা জরুরি

লাপিদের মতে, আজকের পৃথিবীর প্রকৃত চেহারা দেখা যায় সিনেমা শুরু হওয়ার আগে, যখন দর্শকেরা নিজেদের মোবাইলে খবর পড়েন। তখন তাঁরা বিশৃঙ্খলা, উন্মাদনা এবং সহিংসতার মুখোমুখি হন।

কিন্তু সিনেমা শুরু হলেই সেই বাস্তবতা থেকে তাঁরা দূরে সরে যান।

Yes সেই আরামদায়ক পালানোর পথকে প্রত্যাখ্যান করে। ছবির প্রায় শেষের দিকে একটি ভয়ঙ্কর সংলাপ শোনা যায়—

“যে ইসরায়েলিরা বড় হয়েছে এই প্রশ্ন শুনে—মানুষ কীভাবে ভয়াবহ অপরাধ ঘটাতে ঘটাতেও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে—আজ তারাই সেই প্রশ্নের উত্তর হয়ে উঠেছে।”

মিশেল গোল্ডবার্গের মতে, ছবিটিকে নিষিদ্ধ বা বয়কট করার চেষ্টা যতটা উদ্বেগজনক, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল সেই রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন, যা ছবিটি উন্মোচন করে।

তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট—একটি রাষ্ট্রের অপরাধের সমালোচনা করা শিল্পীদের নীরব করে দেওয়া নয়, বরং তাঁদের কথা শোনা প্রয়োজন। কারণ, অনেক সময় সত্য উচ্চারণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা হয়ে ওঠে শিল্পই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles