অয়ন মুখোপাধ্যায়: আজ ২৬শে জুন। ক্যালেন্ডার বলছে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বাঙালি হিসেবে আমাদের একটা মস্ত বড় সুবিধে। আমাদের পূর্বপুরুষরা এত বেশি গুণী ছিলেন যে বছরের ৩৬৫ দিনের মধ্যে কোনো না কোনো দিন কারও না কারও জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী পড়েই যায়। ফলে একটা সুচারু স্ট্যাটাস দেওয়া বা হোয়াটস অ্যাপে একটা ছবি ফরোয়ার্ড করার চমৎকার সুযোগ আমরা কেউ হাতছাড়া করি না। বাবু বঙ্কিমচন্দ্র কেও আজ সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে শ্রদ্ধার সুনামিতে ভাসানো হবে, এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ট্র্যাজেডিটা অন্য জায়গায়। এই যে আমরা মহাসড়ম্বরে আমাদের আইকনদের জন্মদিন পালন করি, এটা আসলে আমাদের এক ধরনের যৌথ অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ উপায়।কারণ আমরাসারা বছর যাদের ছুঁয়েও দেখি না, বছরের একটা দিন তাদের চণ্ডীমণ্ডপে বসিয়ে ধূপধুনো দিলে মনে একটা পরম শান্তি আসে। যাক, বাঙালির সংস্কৃতিটা অন্তত বেঁচে রইল!
কেন জানিনা আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, বঙ্কিমচন্দ্র যদি আজ বেঁচে থাকতেন এবং ফেসবুকে একটা অ্যাকাউন্ট খুলতেন, তাহলে ঠিক কী হতো? প্রথমত, তাঁর কমলাকান্তের দফতর কিংবা সাম্য-র মতো প্রবন্ধ লেখার জন্য তিনি এত বেশি ট্রোলড হতেন যে তিন দিনের মাথায় অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করে হিমালয়ে চলে যেতেন। আমাদের এই পরম সহনশীল যুগে তাঁর মতো ক্ষুরধার ব্যঙ্গ হজম করার মতো পরিপাকতন্ত্র কি আমাদের আছে?
আমরা এখন বড্ড বেশি সরলরেখায় ভাবতে অভ্যস্ত। আমাদের মগজে হয় ‘হ্যাঁ’ আছে, না হয় ‘না’ আছে। মাঝ খানের যে ধূসর এলাকা, যেখানে বসে একজন লেখক সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেন, সেই জায়গাটাই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। বঙ্কিম ছিলেন সেই জটিলতার কারিগর। আর আজকের প্রেক্ষাপটে তাঁর বন্দেমাতরম গানটির দশা দেখলে তিনি নির্ঘাত সাহিত্যচর্চা ছেড়ে পুরোপুরি সন্ন্যাসী হয়ে যেতেন।
‘বন্দেমাতরম’ শব্দদুটো এখন আর কোনো উপন্যাসের অংশ বা কোনো আধ্যাত্মিক-জাতীয়তাবোধের রূপক নয়। ওটা এখন একটা নিখাদ রাজনৈতিক লাঠি। একদল ওই দুটো শব্দকে নিজেদের দেশপ্রেমের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহার করছে, যেন সকালে উঠে একবার জোরে ‘বন্দেমাতরম’ বললেই দেশের সব অনাহার, দুর্নীতি আর বেকারত্ব জাদু মন্ত্রে উধাও হয়ে যাবে। আরেক দল আবার এই শব্দ দুটোর মধ্যে এমন এক ফ্যাসিবাদের ভূত দেখতে পায় যে শুনলেই তাদের সেক্যুলার গা-গতরে জ্বর আসে।
মজার ব্যাপার হলো, আনন্দমঠ পড়ার চেয়ে তার উদ্ধৃতি ব্যবহার করার প্রবণতাই যেন বেশি। প্রথম দুটো লাইন মুখস্থ, ব্যস, ওটুকুই আমাদের জাতীয়তাবাদী কিংবা সাহিত্যিক আবেগের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। আনন্দমঠ-এর মূল দর্শন কী ছিল, বঙ্কিম কেন দেশকে মায়ের রূপে কল্পনা করেছিলেন, সেই জটিল ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বোঝার মতো সময় কিংবা আগ্রহ, কোনোটাই আজকের দুশো শব্দের পোস্ট নির্ভর ফেসবুক বদ্ধদের নেই।
বঙ্কিম বাবুর গানটা এখন ক্রিকেট ম্যাচের গ্যালারিতে ওড়ানো তেরঙা পতাকার মতো হয়ে গেছে, যার নিচে দাঁড়িয়ে আমরা অনায়াসে অন্যকে দেশদ্রোহী বা অন্ধ ভক্তের সার্টিফিকেট দিয়ে দিতে পারি। অথচ ভেতরের দর্শনটা অধরাই থেকে গেল। এটা আসলে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভোগবাদ, যেখানে আমরা জিনিসটা ব্যবহার করি, কিন্তু তার গুরুত্বটা বুঝতে চাই না।
বাঙালির এই আলসেমি, ভণ্ডামি আর হুজুগ প্রিয়তা নিয়ে বঙ্কিমবাবু তাঁর সময়েই কম চাবকাননি। আজ যদি তিনি দেখতেন, কপালকুণ্ডলা-র সেই বিখ্যাত সংলাপ, “তুমি অধম, তাই বলিয়া আমি উত্তম হইব না কেন?”, মানুষ না বুঝেই ইনস্টাগ্রাম রিলের ব্যাকগ্রাউন্ডে কিংবা ব্রেক-আপের পর ডিপির ক্যাপশন হিসেবে বসিয়ে দিচ্ছে, তাহলে তিনি হয়তো মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়তেন।এই সংলাপটা স্রেফ একটা ডায়লগ নয়। এটা মানুষের নৈতিকতার এক গভীর প্রশ্ন। চারপাশের পরিবেশ যদি পচে নর্দমা হয়ে যায়, তবে তুমি কি নিজেকে চন্দনকাঠের মতো বাঁচিয়ে রাখবে, নাকি তুমিও সেই পাঁকে মিশে যাবে? আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোল সংস্কৃতি আর কাদা ছোড়াছুড়ির দিকে তাকালে মনে হয়, আমরা এই প্রশ্নের উত্তরে সমস্বরে বলেছি, আমরা অধমই হব, কারণ উত্তম হওয়ার খাটনি অনেক বেশি।
আসলে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে লিখতে গেলে ওই চর্বিতচর্বণ “সাহিত্যসম্রাট” মার্কা গদ্গদ ভক্তি দিয়ে আর কোনো লাভ নেই। বঙ্কিমচন্দ্রকে স্রেফ একজন গল্পবলিয়ে ভাবলে তাঁর প্রতি চরম অবিচার করা হয়। তিনি ছিলেন আমাদের আধুনিক মননের অন্যতম প্রথম সমাজ বিশ্লেষক ও নির্মাতা। তিনি একদিকে জন স্টুয়ার্ট মিল, অগুস্ত কোঁতের মতো পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও দর্শনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে গীতার নিষ্কাম কর্ম যোগকে আধুনিক সমাজ ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেছিলেন।তিনি যে ‘অনুশীলন তত্ত্ব’-এর কথা বলেছিলেন, তার অর্থ ছিল মানুষের সব বৃত্তির সুষম বিকাশ। আজ আমাদের বৃত্তির বিকাশ বলতে বোঝায় কত দ্রুত কমেন্ট বক্সে গিয়ে কাউকে গালাগালি দেবো, কিংবা কত নিখুঁতভাবে নিজের স্বার্থ গুছিয়ে নিতে হবে। বঙ্কিমচন্দ্র যে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার কথা বলতেন, আজ আমরা তার সম্পূর্ণ উল্টো পিঠে দাঁড়িয়ে আছি।
একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বঙ্কিম ছিলেন সেই খিটখিটে অথচ ভয়ংকর বুদ্ধিমান জ্যাঠামশাই, যিনি আমাদের মেরুদণ্ডের ভেতরের জেলিটাকে খুব ভালো করে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, বাবুরা মুখে যত বড় বড় সমাজ সংস্কার বা দেশোদ্ধারের কথাই বলুক না কেন, ভেতরে তারা আসলে আফিংখোর কমলাকান্তের চেয়েও বেশি ঘোরগ্রস্ত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। কমলাকান্ত তাও আফিং খেয়ে সত্যিটা অন্তত বলত, আর আমরা কোনো নেশা না করেই চব্বিশ ঘণ্টা মিথ্যের বেসাতি করে চলেছি।
আজ তাঁর জন্মদিনে যদি সত্যিই বঙ্কিমচন্দ্র কে মনে রাখতে হয়, তবে সেটা কোনো লম্বা-চওড়া ভাষণ, সরকারি ছুটি কিংবা ‘বন্দেমাতরম’এর কপি-পেস্ট স্লোগান দিয়ে নয়। তাঁকে প্রাসঙ্গিক রাখার একমাত্র উপায় হলো তাঁর লেখাকে আজকের প্রদর্শন মুখী সংস্কৃতির মুখোমুখি দাঁড় করানো। আলমারি থেকে তাঁর একটা বই নামিয়ে ধুলোটা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে অন্তত কুড়ি পাতা পড়া এবং নিজেকে প্রশ্ন করা, আমি যে নিজেকে এত আধুনিক আর প্রগতিশীল ভাবছি, বঙ্কিমের দেড়শো বছর আগের যুক্তির সামনে আমি টিকতে পারছি তো?
সেটা করতে পারলে তাঁর জন্মদিন পালন নয়, তাঁর সঙ্গে আমাদের কথোপকথন টা অন্তত শুরু হবে। আর যদি তা না পারি, তবে ডিপিতে একটা মালা চড়িয়ে ডিজিটাল প্রণাম ঠুকে দেওয়াই সই। আমাদের উত্তম হওয়ার তো কোনো দায় নেই। অধম হয়েই দিব্যি মোচ্ছবে মোচ্ছবে দিন কেটে যাচ্ছে।