Home সংস্কৃতি ও বিনোদনটেলিভিশন স্কিপ ইন্ট্রো’ বাটনের আঘাতে হারিয়ে যাচ্ছে টিভি সিরিজের এক শিল্প

স্কিপ ইন্ট্রো’ বাটনের আঘাতে হারিয়ে যাচ্ছে টিভি সিরিজের এক শিল্প

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 4 minutes read
A+A-
Reset

প্রযুক্তি নতুন শিল্প তৈরি করে, আবার পুরনো শিল্পকেও মুছে দেয়

ইতিহাস বলছে, নতুন প্রযুক্তি যেমন নতুন শিল্পের জন্ম দেয়, তেমনই অনেক পুরনো শিল্পকে বিলুপ্তও করে। ছাপাখানার আবিষ্কার সাহিত্যকে নতুন যুগে নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছিল হাতে আঁকা অলঙ্কৃত পাণ্ডুলিপির শিল্প। সিনেমা জনপ্রিয় হওয়ার পর মিউজিক হলের যুগও প্রায় শেষ হয়ে যায়।

এখন একই রকম একটি পরিবর্তন ঘটছে টেলিভিশনের জগতে। বিপদের মুখে পড়েছে টিভি সিরিজের টাইটেল সিকোয়েন্স বা শুরুতে দেখানো শিল্পসমৃদ্ধ পরিচিতি অংশ। আর এর জন্য দায়ী একটি ছোট্ট প্রযুক্তিগত সুবিধা— “Skip Intro” বাটন।


সাধারণ লেখা থেকে শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছানো

টেলিভিশনের শুরুর যুগে টাইটেল সিকোয়েন্স বলতে ছিল কেবল কিছু স্থির লেখা। কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকে এগুলো ধীরে ধীরে গল্পের অংশ হয়ে উঠতে শুরু করে।

কোথাও চরিত্রদের পরিচয় দেওয়া হতো, কোথাও বিখ্যাত সংলাপ ব্যবহার করা হতো। যেমন The Adventures of Superman-এর শুরুতেই শোনা যেত—

“এটা কি পাখি? এটা কি বিমান? না, এটা সুপারম্যান!”

পরবর্তীকালে টাইটেল সিকোয়েন্সে যুক্ত হয় অ্যানিমেশন, বিশেষ ভিজ্যুয়াল এফেক্ট, স্টান্ট এবং স্মরণীয় সঙ্গীত।

The Addams Family-র বিখ্যাত আঙুলের টোকা দেওয়া সুর আজও বহু মানুষের মনে গেঁথে আছে।


সোনালি যুগ: যখন টাইটেল সিকোয়েন্স নিজেই ছিল শিল্পকর্ম

সহস্রাব্দের শুরুতে তথাকথিত ‘প্রেস্টিজ টিভি’-র যুগে এই শিল্প তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়।

The Sopranos-এর টাইটেলে প্রধান চরিত্র টনি সোপ্রানোকে দেখা যায় কখনও সিগারের ধোঁয়ার আড়ালে, কখনও গাড়ির আয়নায়। তিনি যেন দৃশ্যমান, অথচ অধরা—যেমন তিনি পুরো সিরিজ জুড়েই ছিলেন।

Mad Men-এর শুরুতে আকাশচুম্বী অট্টালিকা থেকে পড়ে যাওয়া এক মানুষের ছায়ামূর্তি দেখা যায়। সেটি একই সঙ্গে সাফল্যের মোহ এবং মানসিক ভাঙনের প্রতীক।

আর অনেকের মতে সবচেয়ে অসাধারণ ছিল True Detective-এর প্রথম মৌসুমের টাইটেল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে ফুটে উঠেছিল লুইজিয়ানার দূষণ, অপরাধ, ধর্ম, অপরাধবোধ এবং রহস্যময়তার আবহ।


টাইটেল সিকোয়েন্স কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল?

একটি ভালো টাইটেল সিকোয়েন্স শুধু নামের তালিকা নয়।

এটি দর্শককে বলে—“আপনার সময় আমাদের কাছে এত মূল্যবান যে ক্রেডিটসও আমরা শিল্পে পরিণত করেছি।”

একই সঙ্গে এটি সিরিজের জন্য এক ধরনের আত্মবিশ্বাসী ঘোষণা। যেন নির্মাতারা বলছেন—“এই গল্প এতটাই বিশেষ যে এর জন্য বিশেষ ভূমিকা প্রয়োজন।”

এগুলো গল্পের সারাংশ দেয়, আবহ তৈরি করে, নতুন দর্শককে আকৃষ্ট করে এবং পুরনো দর্শকের কাছে নতুন অর্থ তৈরি করে।

যেভাবে অপেরা শুরু হওয়ার আগে ওভারচার বাজে, ঠিক তেমনই একটি ভালো টাইটেল সিকোয়েন্স ছিল নাটকের অবিচ্ছেদ্য অংশ।


স্ট্রিমিং যুগে বদলে গেল সবকিছু

কিন্তু স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের যুগে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

একদিকে বিজ্ঞাপন আবার ফিরছে, ফলে সময়ের চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে দর্শকেরা এখন একটানা অনেকগুলো পর্ব দেখে ফেলেন—যাকে বলা হয় ‘বিঞ্জ-ওয়াচিং’।

একই পরিচিতি বারবার দেখতে অধিকাংশ মানুষ আর আগ্রহী নন।

এই প্রবণতা লক্ষ্য করেই ২০১৭ সালে Netflix চালু করে “Skip Intro” বাটন। পরে প্রায় সব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মই সেটি অনুসরণ করে।

২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী Netflix-এর দর্শকেরা প্রতিদিন প্রায় ১৩ কোটি ৬০ লাখ বার এই বাটনে ক্লিক করতেন।

তারপর থেকে সংখ্যাটা আরও বেড়েছে। ব্রিটিশ সম্প্রচার সংস্থা BBC-এর iPlayer-এও গত দুই বছরে ‘স্কিপ ইন্ট্রো’ ব্যবহারের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।


ফলে ছোট হয়ে যাচ্ছে টাইটেল সিকোয়েন্স

এই পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

এখনও কিছু ব্যতিক্রম আছে। যেমন The White Lotus-এর টাইটেল সিকোয়েন্স এক ধরনের ধাঁধার মতো, যেখানে নানা ইঙ্গিতপূর্ণ ছবি মুহূর্তের জন্য দেখা যায়।

কিন্তু ক্রমশ অনেক সিরিজ ছোট এবং সরল টাইটেলের দিকে ঝুঁকছে।

Pluribus নামের বিজ্ঞান-কল্পকাহিনি সিরিজে কয়েকটি অদ্ভুত আলোর বিন্দু ঘুরে ঘুরে শিরোনাম তৈরি করে—ব্যস, এতটুকুই।

হাসপাতালভিত্তিক নাটক The Pitt প্রায় পুরোনো দিনের মতো সাদামাটা লেখা ব্যবহার করেছে।

আর Steal নামের থ্রিলারে শিরোনাম মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঝলকে ওঠে।


কী হারিয়ে যাচ্ছে?

সমস্যা শুধু এই নয় যে অনেক সময় টাইটেল সিকোয়েন্সই সিরিজের সেরা অংশ হয়ে উঠত।

এর চেয়েও বড় ক্ষতি হচ্ছে দর্শকের অভিজ্ঞতায়।

আগে একটি পর্ব শেষ হওয়ার পর টাইটেল সিকোয়েন্স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। সেই বিরতিটুকু দর্শককে ভাবার সুযোগ দিত।

এখন এক পর্ব শেষ হতেই পরেরটি শুরু হয়ে যায়। উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আগেই তা মিলিয়ে যায়।


বাস্তব জগত থেকে কল্পনার জগতে যাওয়ার সেতু

একটি ভালো টাইটেল সিকোয়েন্স ছিল এক ধরনের জাদুমন্ত্রের মতো।

আপনি হয়তো সারাদিনের কাজ শেষে সোফায় বসেছেন। বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে ক্লান্ত শরীরে টিভি চালিয়েছেন।

টাইটেল সিকোয়েন্স আপনাকে ধীরে ধীরে বাস্তব জগত থেকে গল্পের জগতে নিয়ে যেত।

হয়তো সেটা ১৯৫০-এর দশকের এক অফিস, কিংবা লুইজিয়ানার অপরাধজগৎ।

এই কয়েক মিনিটের মধ্যবর্তী সময়টুকুই ছিল সেই সেতু, যেখানে দর্শক নিজের অবিশ্বাসকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে গল্পের জগতে প্রবেশ করতেন।


সবকিছু দ্রুততর, কিন্তু মানুষ আরও অস্থির

আজ ফোন করা সহজ, কেনাকাটা সহজ, টিভি দেখা সহজ।

একটি বোতাম চাপলেই অসংখ্য অনুষ্ঠান চোখের সামনে হাজির।

তবু আশ্চর্যজনকভাবে মানুষ আগের চেয়ে আরও অধৈর্য হয়ে উঠেছে। সবকিছু এখনই চাই, সঙ্গে সঙ্গে চাই।

কিন্তু এই তাড়াহুড়োরও একটি মূল্য আছে।

যখন প্রতিটি বিরতি মুছে যায়, প্রতিটি সীমারেখা অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন বিশেষ কিছু আর বিশেষ বলে মনে হয় না।

আর সেই কারণেই হয়তো টিভি সিরিজের টাইটেল সিকোয়েন্সের ধীর, শিল্পসমৃদ্ধ জগত হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা শুধু কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও নয়—একটি সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতাও হারাচ্ছি। ■

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles