হাইলাইটস
- শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় উঠল স্পেন।
- জোড়া গোল করলেন মিকেল ওইয়ারজাবাল, একটি গোল পেদ্রো পোরোর।
- টানা চতুর্থ ম্যাচেও গোল হজম করল না স্পেন; উনাই সিমোন ভাঙলেন ইকার কাসিয়াসের বিশ্বকাপ রেকর্ড।
- লামিনে ইয়ামাল, মার্ক কুকুরেয়া, পেদ্রি ও রদ্রিদের দুরন্ত ফুটবলে স্পেনকে দেখা গেল পুরনো আক্রমণাত্মক রূপে।
- কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বললেন, “প্রায় নিখুঁত” ছিল দলের পারফরম্যান্স।
স্পেনের বিশ্বকাপ যেন সত্যিই শুরু হল নকআউট পর্বে। গ্রুপ পর্বে ধারাবাহিকতা থাকলেও সেই পরিচিত ছন্দ, গতি ও আক্রমণাত্মক সৌন্দর্য পুরোপুরি দেখা যায়নি। কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে শেষ ৩২-এর ম্যাচে যেন একেবারে অন্য স্পেনকে দেখা গেল। বল দখল, দ্রুত পাস, ডান-বাম দুই প্রান্ত দিয়ে অবিরাম আক্রমণ এবং নিখুঁত রক্ষণ—সব মিলিয়ে ৩-০ গোলের জয় স্পষ্ট করে দিল, ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা আবার বড় মঞ্চে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে প্রস্তুত।
ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে। মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই লামিনে ইয়ামালের শট অস্ট্রিয়াকে সতর্ক করে দেয়। অস্ট্রিয়ার কোচ রালফ রাংনিকের দল উচ্চচাপের কৌশল নিয়ে নামলেও সেটাই শেষ পর্যন্ত স্পেনের সুবিধা করে দেয়। ফাঁকা জায়গা পেয়ে পেদ্রি, দানি অলমো ও ইয়ামাল দ্রুত পাসে আক্রমণ গড়ে তুলতে থাকেন। প্রথম দিকে লাপোর্তের হেড বাইরে যায়, অলমোর শট আটকে যায়, অন্যদিকে মার্সেল সাবিৎসারের দারুণ ক্রসে মাইকেল গ্রেগরিশের সুযোগ অল্পের জন্য নষ্ট হয়।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি কর্নার থেকে কুকুরেয়ার গোল বাতিল হওয়ায় কিছুটা হতাশ হয় স্পেন। গোলরক্ষকের সামনে পাও কুবার্সির অবস্থানকে বাধা হিসেবে দেখেন রেফারি। সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও স্পেন থেমে থাকেনি। ৩৬ মিনিটে পেদ্রির নিখুঁত পাস থেকে কুকুরেয়ার নিচু ক্রস এক ছোঁয়ায় জালে পাঠিয়ে দেন মিকেল ওইয়ারজাবাল। এই গোলই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
বিরতির আগে ও পরে স্পেনের দাপট আরও বাড়ে। লামিনে ইয়ামালের দৌড়, পোরোর ওভারল্যাপ, অলমোর সৃজনশীলতা এবং বায়েনার সেটপিস বারবার অস্ট্রিয়ার রক্ষণকে বিপাকে ফেলে। গোলরক্ষক আলেক্স শ্লাগার একাধিক দুর্দান্ত সেভ না করলে ব্যবধান আরও বাড়তে পারত। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার একমাত্র উল্লেখযোগ্য সুযোগ আসে সাসা কালাইজিচের হেড থেকে, কিন্তু সেটিও লক্ষ্যে থাকেনি।
দ্বিতীয় গোলটি আসে অসাধারণ দলগত আক্রমণ থেকে। অলমোর প্রচেষ্টা আটকে যাওয়ার পর বল পুনরুদ্ধার করে স্পেন আবার আক্রমণ সাজায়। বায়েনার পাসে বক্সে ঢুকে পেদ্রো পোরো শক্তিশালী হেডে ব্যবধান ২-০ করেন। সেই গোলের পর কার্যত ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়।
শেষ মুহূর্তে স্পেন তাদের ফুটবল দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণটি তুলে ধরে। গোলরক্ষক উনাই সিমোনের পা থেকে শুরু হওয়া আক্রমণ একের পর এক নিখুঁত পাসে এগিয়ে যায় প্রতিপক্ষের বক্স পর্যন্ত। শেষ পাসটি পেয়ে ওইয়ারজাবাল অনায়াসে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। পুরো আক্রমণটি ছিল স্পেনের বহু বছরের পরিচিত “টিকি-টাকা” দর্শনের আধুনিক সংস্করণ—দ্রুত, সরাসরি এবং কার্যকর।
এই জয়ের আরেকটি বড় দিক স্পেনের রক্ষণ। টানা চার ম্যাচে একটি গোলও হজম করেনি তারা। গোলরক্ষক উনাই সিমোন বিশ্বকাপে টানা গোলশূন্য ম্যাচের ক্ষেত্রে ইকার কাসিয়াসের ২০১০ সালের রেকর্ড ভেঙে নতুন নজির গড়েছেন। কেন্দ্রীয় রক্ষণে পাও কুবার্সি ও আইমেরিক লাপোর্তের জুটি এখনও পর্যন্ত প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা বলে প্রমাণিত হয়েছে। মাঝমাঠে রদ্রি প্রতিবারই বিপজ্জনক পরিস্থিতি সামলে দিয়েছেন, আর প্রয়োজনে অলমো ও পোরো রক্ষণে নেমে এসে দলের ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।
ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেন, “বড় দলগুলিকে যখন প্রয়োজন হয়, তখনই তারা নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে পারে। আজকের পারফরম্যান্স প্রায় নিখুঁত।” অন্যদিকে রালফ রাংনিকও প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে বলেন, “দ্বিতীয় গোল পর্যন্ত আমরা লড়াইয়ে ছিলাম। কিন্তু স্পেন বিশেষ মানের দল। নব্বই মিনিট ধরে তাদের থামিয়ে রাখা খুব কঠিন।”
এই জয়ের ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানও ঘটল। ২০১০ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেল স্পেন। এখন তাদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কঠিন পরীক্ষা—পর্তুগাল বা ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে শেষ ষোলো। তবে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যে ছন্দ, আত্মবিশ্বাস এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল স্পেন দেখিয়েছে, তাতে তারা যে আবার শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে, তা নিয়ে আর খুব বেশি সংশয় থাকার কথা নয়।