এমবাপে-দেম্বেলে-অলিজেকে সামনে রেখে দিদিয়ে দেশঁর আক্রমণাত্মক বিপ্লব, বিশ্বকাপে নতুন রূপে ফ্রান্স

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা দলগুলির একটি ফ্রান্স।
- কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের চারটি করে গোল, মাইকেল অলিজের তিনটি গোলের পাস।
- দীর্ঘদিনের রক্ষণভিত্তিক কৌশল ছেড়ে চার ফরোয়ার্ডের আক্রমণাত্মক ছকে খেলাচ্ছেন দিদিয়ে দেশঁ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস
- বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা দলগুলির একটি ফ্রান্স।
- কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলের চারটি করে গোল, মাইকেল অলিজের তিনটি গোলের পাস।
- দীর্ঘদিনের রক্ষণভিত্তিক কৌশল ছেড়ে চার ফরোয়ার্ডের আক্রমণাত্মক ছকে খেলাচ্ছেন দিদিয়ে দেশঁ।
- রক্ষণে কিছু দুর্বলতা থাকলেও আক্রমণের ধারেই টানা তিন জয়ে শেষ ষোলোয় উঠেছে ফরাসিরা।
- শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আবার তিন মিডফিল্ডারের ছকে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশঁ।
ফ্রান্স বিশ্বকাপে নামার আগেই ধারণা ছিল, কিলিয়ান এমবাপে, ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে এবং উদীয়মান তারকা মাইকেল অলিজেকে নিয়ে এবারের আসরের সবচেয়ে ভয়ংকর আক্রমণভাগ তাদেরই। গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পর সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে। ফরাসি দলের আক্রমণভাগই এখন তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর শেষ ষোলোয় সুইডেনের বিরুদ্ধেও সেই অস্ত্রেই ভরসা রাখছেন কোচ দিদিয়ে দেশঁ।
গ্রুপ পর্বে সেনেগালকে ৩-১, ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স। তিন ম্যাচে দুটি গোল হজম করায় রক্ষণ নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও, দুরন্ত আক্রমণভাগ সেই দুর্বলতাকে ঢেকে দিয়েছে। টানা তিন জয়ে গ্রুপের শীর্ষে থেকে নকআউট পর্বে পৌঁছেছে ‘লে ব্লু’রা।
গ্রুপ পর্বে ফ্রান্স করেছে ১০ গোল। এই সংখ্যায় তারা জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের সমকক্ষ। এমবাপে ও দেম্বেলে চারটি করে গোল করেছেন। অলিজে করেছেন তিনটি গোলের পাস, যা তাঁকে প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা সৃষ্টিশীল ফুটবলার হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই তিন তারকাকে ইতিমধ্যেই অনেকে ডাকছেন ‘তিন মাস্কেটিয়ার’নামে। তাঁদের পাশাপাশি পালা করে খেলেছেন ব্র্যাডলি বারকোলা ও দেজিরে দুয়ে। দু’জনেই একটি করে গোল করেছেন। বেঞ্চেও রয়েছে রায়ান শেরকি, মার্কুস তুরাম, ম্যাগনেস আকলিউশে ও জ্যাঁ-ফিলিপ মাতেতার মতো আক্রমণভাগের বিকল্প।
ফ্রান্সের এই আক্রমণভাগের গভীরতা প্রতিপক্ষের জন্য বড় দুশ্চিন্তা। নরওয়ের বিরুদ্ধে জয়ের পর রক্ষণের খেলোয়াড় ম্যাকসাঁস লাখ্রোয়া বলেন, “আমাদের সামনে এত ভালো আক্রমণভাগ রয়েছে যে যেকোনও মুহূর্তে গোল করতে পারি।”
ফরাসি টেলিভিশন ধারাভাষ্যকার ও প্রাক্তন ফুটবলার বেনোয়া শেইরুও মনে করেন, “বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগ এখন ফ্রান্সের। একজন যদি সেদিন খুব উজ্জ্বল না-ও থাকেন, অন্যজন একাই ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। কখনও অলিজে, কখনও দেম্বেলে, আবার কখনও এমবাপে। এই সমৃদ্ধি অবিশ্বাস্য।”
নরওয়ের বিরুদ্ধে দেম্বেলে মাত্র ৩৫ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচ প্রায় একাই জিতিয়ে দেন। আবার সেনেগালের বিরুদ্ধে এমবাপে ও অলিজের বোঝাপড়াই পার্থক্য গড়ে দেয়। অধিনায়ক এমবাপে বলেছেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল সামনে অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলারদের উপস্থিতি।”
এই তারকারা একে অপরের সঙ্গে দ্রুত পাস আদান-প্রদান এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে আক্রমণ গড়ে তুলছেন। দেশঁর সহকারী গি স্তেফাঁর ভাষায়, “উসমান, মাইকেল আর কিলিয়ান একই ফুটবলের ভাষায় কথা বলে।”
এই আক্রমণশক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতেই নিজের দীর্ঘদিনের দর্শন বদলে ফেলেছেন দেশঁ। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের ভিত্তি ছিল শক্ত রক্ষণ। কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চ থেকে তিনি চার ফরোয়ার্ড, চার রক্ষণভাগের খেলোয়াড় এবং মাত্র দুই মিডফিল্ডার নিয়ে নতুন ছকে দল সাজাতে শুরু করেন।
দেশঁর মতে, এখন ফ্রান্সের প্রধান শক্তি আর রক্ষণ নয়, আক্রমণ। বিশ্বকাপের দল ঘোষণার সময় তিনি বলেছিলেন, “প্রথম লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে সমস্যায় ফেলা, আঘাত করা এবং ম্যাচের ফল নির্ধারণ করা।” অর্থাৎ গোল না খাওয়ার চেয়ে বেশি গোল করাকেই তিনি এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই নতুন দর্শন আপাতত দেশঁর সমালোচকদেরও চুপ করিয়ে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ইউরোতে ফ্রান্সের রক্ষণাত্মক ফুটবল তীব্র সমালোচিত হয়েছিল। পুরো প্রতিযোগিতায় তারা ওপেন প্লে থেকে মাত্র একটি গোল করেছিল। পরে এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৮৩ শতাংশ সমর্থক দলের আক্রমণাত্মক মানসিকতার অভাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
তবে দেশঁ এখনও ভারসাম্যের কথা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর মতে, চার ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলতে হলে বল হারানোর পর আক্রমণভাগের ফুটবলারদেরও রক্ষণে নেমে আসতে হবে। মিডফিল্ডার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনি মজা করে বলেছেন, “সেনেগালের বিরুদ্ধে একবার সামনে উঠে গিয়েছিলাম। পরে নিজেকেই মনে করিয়ে দিলাম, ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে আবার পিছিয়ে আসতে হবে।”
যদিও এখনও পর্যন্ত চার ফরোয়ার্ডের ছকই সফল হয়েছে, দেশঁ জানিয়ে দিয়েছেন, আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তিন মিডফিল্ডার ও তিন ফরোয়ার্ডের পুরনো কাঠামোয় ফিরতেও তিনি দ্বিধা করবেন না। তাঁর কথায়, “এত আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় নিয়েছি ব্যবহার করার জন্যই। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালে অতিরিক্ত একজন মিডফিল্ডার খেলানোর সিদ্ধান্তও নিতে পারি।”
এখন দেখার বিষয়, নকআউট পর্বে দেশঁ শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক দর্শনেই অটল থাকেন, নাকি বড় প্রতিপক্ষের সামনে আবার রক্ষণাত্মক ভারসাম্যের পথ বেছে নেন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



