উষাদের দেখানো পথে নতুন প্রজন্ম, এশিয়ার ট্র্যাকে ফের ভারতীয় মেয়েদের রাজত্ব

যা জানা জরুরি
- নাগোয়ার ট্র্যাকে সোনার হাসি হাসলেন ভারতীয় মেয়েরাই।
- কিরণ পাহাল, এম আর পুভাম্মা, প্রাচী চৌধরি ও ভিথ্যা রামরাজের দল মহিলাদের ৪×৪০০ মিটার রিলেতে প্রথম হয়ে ফিরিয়ে আনল এশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট।
- বাহরিন রুপো পেল ৩ মিনিট ৩০.২১ সেকেন্ডে, চিন ব্রোঞ্জ জিতল ৩ মিনিট ৩১.০২ সেকেন্ডে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নাগোয়ার ট্র্যাকে সোনার হাসি হাসলেন ভারতীয় মেয়েরাই। কিরণ পাহাল, এম আর পুভাম্মা, প্রাচী চৌধরি ও ভিথ্যা রামরাজের দল মহিলাদের ৪×৪০০ মিটার রিলেতে প্রথম হয়ে ফিরিয়ে আনল এশীয় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। সময় ৩ মিনিট ২৯.৬৯ সেকেন্ড। বাহরিন রুপো পেল ৩ মিনিট ৩০.২১ সেকেন্ডে, চিন ব্রোঞ্জ জিতল ৩ মিনিট ৩১.০২ সেকেন্ডে। চার দৌড়বিদের এই সাফল্যে মিশে রয়েছে ভারতের নারী অ্যাথলেটিক্সের দীর্ঘ ইতিহাস এবং নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।
হিন্দুস্তান টাইমসকে শাইনি আব্রাহাম উইলসন জানিয়েছেন, ভিথ্যার শেষ দৌড় দেখতে দেখতে তাঁর মনে হচ্ছিল, পুরনো দিনের মতো তিনিও আবার দৌড়চ্ছেন।
সেই পুরনো দিনের উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৮৬ সালের সোল এশিয়ান গেমস। পি টি উষা, শাইনি আব্রাহাম, বন্দনা রাও এবং এম ডি ভালসাম্মা মহিলাদের ৪×৪০০ মিটার রিলেতে সোনা জিতেছিলেন। তাঁদের সময় ছিল ৩ মিনিট ৩৪.৫৮ সেকেন্ড। উষা সেবার ব্যক্তিগতভাবেও ২০০ মিটার, ৪০০ মিটার এবং ৪০০ মিটার হার্ডলসে সোনা পান। একই আসরে তাঁর চারটি সোনা ভারতীয় নারী অ্যাথলেটিক্সকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। ট্র্যাকে ভারতীয় মেয়েদের সম্ভাবনার এক বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছিল সেই সাফল্য।
পরবর্তী সময়েও রিলের সাফল্য বারবার ফিরে এসেছে। ২০০২ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচটি এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টে সোনা জেতে ভারত। ২০১৮ সালের জয়ী দলে ছিলেন হিমা দাস, পুভাম্মা, সরিতাবেন গায়কোয়াড় ও ভিস্ময়া। তাঁরা দৌড় শেষ করেছিলেন ৩ মিনিট ২৮.৭২ সেকেন্ডে। অর্থাৎ দলের মুখ বদলেছে, কিন্তু সম্মিলিত সাফল্যের ধারাটি দীর্ঘদিন বজায় থেকেছে। সেই ইতিহাসের সঙ্গে নাগোয়ার দলের সরাসরি যোগসূত্র পুভাম্মা। পুরনো জয়ী দলের অভিজ্ঞতা নিয়েই এবারও তিনি সোনার অভিযানে অংশ নিলেন।
এই প্রজন্মের উত্থানের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভিথ্যার ব্যক্তিগত কীর্তি। রিলের আগে ৪০০ মিটার হার্ডলসে ৫৪.৭৫ সেকেন্ড সময় করে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি। ভেঙে দেন ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে উষার গড়া ৫৫.৪২ সেকেন্ডের জাতীয় রেকর্ড। বিয়াল্লিশ বছর ধরে টিকে থাকা সীমা পেরিয়ে প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই ইভেন্টে ৫৫ সেকেন্ডের নীচে নামেন ভিথ্যা। দৌড় শেষে ফলের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন তিনি; পর্দায় সময় ফুটে উঠতেই শুরু হয় উচ্ছ্বাস। একটি ব্রোঞ্জের ভিতরেও তাই লুকিয়ে ছিল ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের বড় জয়।
পরিসংখ্যানের বাইরেও এই রেকর্ডের মূল্য আছে। যে সময় এক প্রজন্মের কাছে প্রায় অতিক্রমের অসাধ্য হয়ে উঠেছিল, পরের প্রজন্ম সেটিই পেরিয়ে গেল। উষার কৃতিত্ব তাতে ম্লান হয় না; বরং বোঝা যায়, তাঁর রেখে যাওয়া মানদণ্ড কত কঠিন ছিল। বড় পূর্বসূরির সার্থক উত্তরাধিকার এভাবেই তৈরি হয়—তাঁকে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর সীমাও অতিক্রম করে।
নাগোয়ার চার সোনাজয়ীর পথ অবশ্য একরকম ছিল না। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটক ও তামিলনাড়ু থেকে উঠে এসেছেন তাঁরা। কিরণের ছোটবেলায় গ্রামের অনেকে মেয়েদের খেলাধুলার বিরোধী ছিলেন। মেয়ের দৌড় চালিয়ে যেতে বাবা সেই বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, মাও পাশে ছিলেন। সাফল্যের পরে সেই গ্রামের মানুষই তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। অন্যদিকে, ছত্রিশ বছরের পুভাম্মা অভিজ্ঞতার জোরে এখনও দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বয়সের ব্যবধান এখানে দলকে ভাগ করেনি; ভিন্ন অভিজ্ঞতা এক লক্ষ্যে এসে মিলেছে। ভিথ্যা এবার মহিলাদের রিলেতে সোনার পাশাপাশি মিক্সড রিলেতে রুপো এবং হার্ডলসে ব্রোঞ্জও পেলেন।
এই জয়কে তাই শুধু পদকতালিকার একটি সংযোজন হিসেবে দেখলে তার ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। এখানে রয়েছে মেয়েদের খেলার অধিকার নিয়ে পরিবারের লড়াই, দীর্ঘ অনুশীলনের ধৈর্য এবং একসঙ্গে সফল হওয়ার শিক্ষা। চারশো মিটারের প্রত্যেক দৌড় ব্যক্তিগত পরীক্ষা, অথচ রিলের ফল নির্ভর করে চারজনের উপর। একজন যেখানে শেষ করেন, সেখান থেকেই অন্যজনের দায়িত্ব শুরু হয়। ভারতীয় নারী অ্যাথলেটিক্সের ইতিহাসেও যেন সেই ব্যাটনই হাতবদল হচ্ছে—উষা, শাইনিদের সাফল্য থেকে আজকের নতুন স্বপ্নের দিকে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



