হাইলাইটস:

  • ফলতার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির ওরফে ‘পুষ্পা’ খানের স্ত্রী সরিকা বিবি গ্রেপ্তার।
  • অভিযোগ, ১৭ জুন ফলতা থানায় বিক্ষোভ ও স্বামীকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি।
  • তৃণমূলের একাংশের দাবি, জাহাঙ্গিরকে প্রকাশ্যে অপমান ও দড়ি বেঁধে ঘোরানোর ঘটনাই সরিকাকে পথে নামতে বাধ্য করে।
  • পুলিশের অভিযোগ, প্রায় ৪০০ জনের ভিড় থানা ঘেরাও করে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
  • ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা তীব্র; মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও পৌঁছেছে আদালতে।

বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতায় একসময় যাঁর নামেই প্রশাসন ও রাজনীতি সমানভাবে আলোড়িত হতো, সেই জাহাঙ্গির ওরফে ‘পুষ্পা’ খানের রাজনৈতিক পতনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁর স্ত্রী সরিকা বিবির গ্রেপ্তার। এলাকায় যিনি দীর্ঘদিন প্রায় সম্পূর্ণ অন্তরালেই ছিলেন, সেই সরিকাই এখন পুলিশের অভিযোগপত্রে থানায় হামলা, ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা, সরকারি কর্মীর উপর আক্রমণ এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনের মামলার অন্যতম অভিযুক্ত।

পুলিশের দাবি, গত ১৭ জুন জাহাঙ্গির খানকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ফলতা থানার সামনে কয়েকশো সমর্থক জড়ো হয়। বিক্ষোভ ক্রমে উত্তেজনায় রূপ নেয় এবং একাংশ থানায় ঢুকে অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য থাকায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন ছিল। সংঘর্ষের পর একাধিক জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে সরিকা বিবিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ, গোটা কর্মসূচির অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনিই।

কিন্তু ঘটনাটির রাজনৈতিক ও মানবিক দিকটি ভিন্ন ছবি তুলে ধরছে। তৃণমূলের একাধিক সূত্রের দাবি, জাহাঙ্গির খানকে গ্রেপ্তারের পর যেভাবে কোমরে দড়ি বেঁধে, হাফপ্যান্ট পরিয়ে, হাত জোড় করিয়ে এলাকায় ঘোরানো হয়েছিল, সেটিই ছিল পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় আঘাত। তাঁদের মতে, এই প্রকাশ্য অপমানই সরিকাকে প্রথমবার প্রকাশ্যে প্রতিবাদে নামতে বাধ্য করে। সেই কারণেই তিনি স্বামীর গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ফলতার বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী সরিকা বিবি এতদিন রাজনীতির প্রথম সারিতে ছিলেন না। তিনি প্রচারে যেতেন না, দলীয় বৈঠকেও তাঁকে খুব কমই দেখা যেত। প্রতিবেশীদের অনেকে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তাঁকে প্রায় বাড়ির বাইরেই দেখা যেত না। ফলে হঠাৎ তাঁকে এত বড় বিক্ষোভের নেতৃত্বে দেখা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

জাহাঙ্গির খানের রাজনৈতিক উত্থানও ছিল নাটকীয়। ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ফলতায় তিনি দীর্ঘদিন তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। নির্বাচনের সময় নিজেকে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চরিত্র ‘পুষ্পা’র সঙ্গে তুলনা করে জাতীয় স্তরেও শিরোনামে আসেন। কিন্তু পুনর্নির্বাচনের আগে তাঁর হঠাৎ প্রার্থিতা প্রত্যাহার, পরবর্তী গ্রেপ্তার এবং একের পর এক মামলায় জড়িয়ে পড়া তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

জাহাঙ্গির গ্রেপ্তারের পর সরিকা বিবি প্রথমে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাঁর অভিযোগ ছিল, স্বামীকে যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোরানো হয়েছে তা মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত মর্যাদার পরিপন্থী। এই আবেদনের শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্টও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পুলিশের কাছে রিপোর্ট তলব করে এবং অভিযুক্তের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার নির্দেশ দেয়। যদিও আদালতের এই পর্যবেক্ষণ চলমান ফৌজদারি মামলার তদন্তে কোনও প্রভাব ফেলে না, তবু ঘটনাটি রাজনৈতিক বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়।

অন্যদিকে, পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট। তদন্তকারীদের বক্তব্য, এটি কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; পরিকল্পিতভাবে কয়েকশো মানুষকে জড়ো করে থানায় হামলার চেষ্টা হয়েছিল। প্রশাসনের দাবি, অভিযুক্তকে আইনসম্মত হেফাজত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই বিক্ষোভ সংগঠিত হয় এবং সেই কারণেই সরিকা বিবির বিরুদ্ধে কঠোর ধারায় মামলা করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় দুই ডজনেরও বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং আরও কয়েকজনের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় রাজনীতিতেও এই ঘটনার তাৎপর্য কম নয়। একসময়ের তৃণমূল ঘাঁটি বলে পরিচিত ফলতায় এখন ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গিয়েছে। জাহাঙ্গির খানের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক কার্যত ভেঙে পড়েছে। তাঁর বাড়ি ও দলীয় কার্যালয় এখন প্রায় জনশূন্য, বহু জায়গায় দলীয় পতাকাও ছিঁড়ে পড়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। এই পরিবর্তনই দেখাচ্ছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংগঠন যখন আইনি ও রাজনৈতিক চাপে পড়ে, তখন তার প্রভাব গোটা এলাকাজুড়েই পড়ে।

সব মিলিয়ে, সরিকা বিবির গ্রেপ্তার কেবল একটি ফৌজদারি মামলার ঘটনা নয়; এটি ফলতার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পুলিশের কাছে তিনি থানায় হামলার অন্যতম অভিযুক্ত। আবার তৃণমূলের একাংশের কাছে তিনি এমন এক স্ত্রী, যিনি স্বামীর প্রকাশ্য অপমানের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন। কোন ব্যাখ্যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা পাবে, তা নির্ভর করবে আদালতে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার উপর। তবে এটুকু স্পষ্ট, জাহাঙ্গির ‘পুষ্পা’ খানের পতনের কাহিনিতে তাঁর স্ত্রীর গ্রেপ্তার একটি নতুন এবং তাৎপর্যপূর্ণ মোড় এনে দিয়েছে।