হাইলাইটস:

  • জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক অধিকার বহাল রাখল মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট।
  • ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাহী নির্দেশকে অসাংবিধানিক ঘোষণা প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চের।
  • আদালত বলেছে, মার্কিন মাটিতে জন্ম নেওয়া প্রায় সকল শিশুই জন্মের মুহূর্ত থেকে মার্কিন নাগরিক।
  • ট্রাম্প রায়ে হতাশা প্রকাশ করে কংগ্রেসকে আইন করে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসানের আহ্বান জানিয়েছেন।
  • নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলির মতে, এটি আধুনিক আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক রায়।

বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা বহাল রেখে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, আমেরিকার ভূখণ্ডে জন্ম নেওয়া প্রায় সকল মানুষই জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করবেন। একই সঙ্গে আদালত ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী কর্মসূচির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত নির্বাহী নির্দেশকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে।

দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প একটি নির্বাহী নির্দেশ জারি করেছিলেন। সেই নির্দেশে বলা হয়েছিল, যেসব শিশুর বাবা-মা অবৈধভাবে আমেরিকায় বসবাস করছেন অথবা অস্থায়ী ভিসায় রয়েছেন, তাদের মার্কিন মাটিতে জন্ম হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না।

সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, এই নির্দেশ মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর পরিপন্থী।

রবার্টস লিখেছেন, “অতীতে যেমন, এখনও তেমনই—নাগরিকত্ব মানে অধিকার লাভের অধিকার। এর অর্থ আমাদের রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষের কাছে সম্প্রসারিত করেছিলেন। আজও আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।”

এই রায়ে রবার্টসের সঙ্গে একমত হন উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়রএলেনা কাগানকেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন এবং রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেট

রক্ষণশীল বিচারপতি ব্রেট ক্যাভানফ রায়ের ফলাফলের সঙ্গে একমত হলেও আংশিক ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী নির্দেশ ফেডারেল আইনের বিরোধী হলেও সংবিধানবিরোধী নয়।

অন্যদিকে রক্ষণশীল বিচারপতি ক্লারেন্স থমাসস্যামুয়েল আলিটো এবং নিল গোরসাচ ভিন্নমত পোষণ করেন। ১৯৪ পৃষ্ঠার এই রায়ের মধ্যে প্রায় ৯০ পৃষ্ঠাই থমাসের ভিন্নমত, যা তাঁর বিচারপতি জীবনের দীর্ঘতম ভিন্নমত হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।

রায় প্রকাশের পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল-এ লিখেছেন, “এটি আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক।” তবে তিনি বলেন, বিষয়টি এখন কংগ্রেসের আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।

তিনি লেখেন, “এই ব্যয়বহুল এবং দেশের প্রতি অন্যায্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অবসান ঘটাতে দীর্ঘ ও জটিল সাংবিধানিক সংশোধনের প্রয়োজন নেই। কংগ্রেসের উচিত আজ থেকেই আইন প্রণয়নের কাজ শুরু করা। তারা আমার পূর্ণ সমর্থন পাবে।”

নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং ডেমোক্র্যাট নেতারা এই রায়কে আধুনিক মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, এই রায় আমেরিকার মৌলিক প্রতিশ্রুতিকেই পুনর্ব্যক্ত করেছে।

আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)-এর জাতীয় আইনি বিভাগের পরিচালক সিসিলিয়া ওয়াং, যিনি এই মামলায় বাদীপক্ষের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছিলেন, রায়কে “একটি বড় বিজয়” বলে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, “আদালতের সিদ্ধান্ত আবারও প্রমাণ করল—আপনি যদি এই দেশে জন্মগ্রহণ করেন, তবে আপনি মার্কিন নাগরিক। কোনও প্রেসিডেন্ট নির্বাহী নির্দেশ দিয়ে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন না। আমাদের সাহসী মামলাকারী এবং আইনি দল সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, যারা আমাদের অন্যতম মূল্যবান সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অটুট রয়েছে।”

ট্রাম্প বহুদিন ধরেই জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতির বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভিত্তিহীনভাবে দাবি করে এসেছেন যে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কেনিয়ায় জন্মেছিলেন এবং তাই প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য ছিলেন না। একইভাবে তিনি কমলা হ্যারিস-এর বাবা-মায়ের অভিবাসন-স্থিতির প্রশ্ন তুলে তাঁর উপরাষ্ট্রপতি ও পরে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসনের সামগ্রিক অভিবাসন নীতির লক্ষ্যই ছিল কে মার্কিন নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন, সেই ধারণাকে আমূল বদলে দেওয়া। এই মামলার মৌখিক শুনানিতে ট্রাম্প নিজে আদালতে উপস্থিত ছিলেন, যা কোনও দায়িত্বে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।

ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল, সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীতে ব্যবহৃত “যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন” কথাটির অর্থ হলো—যেসব শিশুর বাবা-মা বৈধভাবে আমেরিকায় অবস্থান করছেন না, তারা জন্মসূত্রে নাগরিক নন।

নির্বাহী নির্দেশে বলা হয়েছিল, যদি কোনও শিশুর বাবা-মায়ের কেউই মার্কিন নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা না হন, অথবা তাঁদের মধ্যে একজনের কেবল অস্থায়ী বৈধ মর্যাদা থাকে, তাহলে সেই শিশুও নাগরিকত্ব পাবে না। এই নীতি ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে কার্যকর করার পরিকল্পনা ছিল, যা প্রতিবছর জন্ম নেওয়া কয়েক লক্ষ শিশুকে প্রভাবিত করত।

মামলাগুলি আদালতে বিচারাধীন থাকায় এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী আইনি মর্যাদা না থাকা বাবা-মায়ের ঘরে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।

ক্যাপিটল হিলে এই রায়কে ঘিরে প্রতিক্রিয়া দলীয় বিভাজন অনুযায়ী স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের নেতা হাকিম জেফ্রিজ বলেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর সবচেয়ে অন্ধ ও বিদেশিবিদ্বেষী সমর্থকদের অসাংবিধানিক আক্রমণ চতুর্দশ সংশোধনী প্রতিহত করেছে।”

তিনি আরও বলেন, “আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে চরম দক্ষিণপন্থী ‘মাগা’ রাজনীতির আমেরিকাকে নতুনভাবে গড়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে আমেরিকার মৌলিক মূল্যবোধের।”

অন্যদিকে বহু রিপাবলিকান এই রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান স্পিকার মাইক জনসন বলেন, “আমার বিশ্বাস, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই ব্যবস্থার ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে। মানুষ শুধু এই দেশে এসে সন্তান জন্ম দিচ্ছে, তারপর সেই সন্তানের মাধ্যমে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নানা সুবিধা ভোগ করছে।”

সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টস ইংরেজ প্রচলিত আইন, দাসপ্রথা, মুক্তি-আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে নাগরিকত্ব খর্ব করার নানা প্রচেষ্টার ইতিহাস বিশদভাবে তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে চীনা বর্জন আইন-এর প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।

রবার্টস লেখেন, ১৮৫৭ সালের কুখ্যাত ড্রেড স্কট মামলায় বলা হয়েছিল, নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে রক্তের সম্পর্ক, জন্মস্থান নয়। সেই “ঘৃণ্য” সিদ্ধান্তই কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করেছিল। পরে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই রায় কার্যত বাতিল করা হয় এবং ঘোষণা করা হয় যে, আমেরিকায় জন্মগ্রহণ বা নাগরিকত্ব গ্রহণকারী এবং দেশের এখতিয়ারের অধীন সব মানুষই মার্কিন নাগরিক।

সংখ্যাগরিষ্ঠ বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, “যেসব শিশু যুক্তরাষ্ট্রে জন্মেছে এবং যাদের বাবা-মা অবৈধভাবে অথবা অস্থায়ীভাবে সেখানে অবস্থান করছেন, তারাও আমেরিকার এখতিয়ারের অধীন। ফলে চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারার অধীনে তারা জন্মের মুহূর্ত থেকেই মার্কিন নাগরিক।”

সমর্থনসূচক পৃথক মতামতে বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন লিখেছেন, চতুর্দশ সংশোধনীর সার্বজনীন আদর্শই এমন সব দাবির চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত করে, যেখানে জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে রক্তের সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়।