হাইলাইটস:

  • রাশিয়ায় পড়তে গিয়ে যুদ্ধের আবর্তে আটকে পড়েন গুজরাটের ছাত্র সাহিল মাজোধি।
  • বর্তমানে তিনি ইউক্রেনের একটি যুদ্ধবন্দি (পিওডব্লিউ) শিবিরে রয়েছেন।
  • ক্যানসারে আক্রান্ত ও হৃদ্‌রোগে ভোগা মা মানবিক কারণে ছেলেকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনার আবেদন জানিয়েছেন।
  • দিল্লি হাইকোর্টে মামলার শুনানি চলছে, কেন্দ্র ও ভারতীয় দূতাবাসের কাছে অগ্রগতি রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন গুজরাটের মোরবির তরুণ সাহিল মাজোধি। কিন্তু সেই স্বপ্ন অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যে নানা প্রলোভনে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে বাধ্য হওয়ার পর তিনি এখন ইউক্রেনের একটি যুদ্ধবন্দি শিবিরে আটক। এদিকে ভারতে তাঁর একমাত্র অভিভাবক, ক্যানসারে আক্রান্ত মা হাসিনা বানু, ছেলেকে একবার ফিরে পাওয়ার আশায় আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

সাহিলের ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আসে এ বছরের শুরুতে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি নিজেকে ভারতের নাগরিক বলে পরিচয় দেন এবং জানান, তিনি যুদ্ধ করতে চাননি। তিনি ভারত সরকারের কাছে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদনও জানান। এরপর থেকেই তাঁর পরিবার বিভিন্ন স্তরে যোগাযোগ শুরু করে।

পরিবারের দাবি, ২০২৩ সালের শেষ দিকে রাশিয়ায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাওয়া সাহিলকে চাকরি, ভালো বেতন এবং ভবিষ্যতের নানা প্রতিশ্রুতি দেখিয়ে এমন পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়া হয়, যার পরিণতিতে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যান। পরে তিনি আত্মসমর্পণ করেন এবং বারবার দাবি করেন যে, তাঁর যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনও ইচ্ছাই ছিল না।

সাহিলের হয়ে লড়ছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী দীপা জোসেফ। তিনি ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনারের কাছে চিঠি লিখে মানবিক কারণে সাহিলের মুক্তি ও ভারতে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, সাহিলের যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছনো তাঁর স্বেচ্ছায় বা পূর্ণ জ্ঞাতসারে হয়নি। পরিস্থিতির চাপে তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন এবং পরে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।

আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সাহিলের মা হাসিনা বানু ক্যানসারের চিকিৎসাধীন। তাঁর হৃদ্‌যন্ত্রের জটিলতাও ধরা পড়েছে। একমাত্র ছেলের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। পরিবারের দাবি, মানবিক বিবেচনায় সাহিলকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া উচিত।

এই ঘটনাকে ঘিরে দিল্লি হাইকোর্টেও মামলা চলছে। আদালত কেন্দ্রীয় বিদেশ মন্ত্রক এবং রাশিয়ায় ভারতীয় দূতাবাসের কাছে অগ্রগতি রিপোর্ট চেয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে আদালতকে জানানো হয়েছে, ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলাফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে। মামলার পরবর্তী শুনানি ১৩ জুলাই হওয়ার কথা।

ভারতীয় নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগের বিষয়টি গত কয়েক বছরে নয়াদিল্লি ও মস্কোর সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে, উচ্চ বেতন, নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি কিংবা অন্য চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বহু ভারতীয়কে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। কেউ পরিচ্ছন্নতাকর্মী, কেউ নির্মাণশ্রমিক বা অন্য পেশার কাজের আশায় গিয়েও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট ২১৪ জন ভারতীয় রুশ সেনাবাহিনীতে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে ১৩৫ জনকে ইতিমধ্যেই অব্যাহতি দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখনও বেশ কয়েকটি সক্রিয় মামলা নিয়ে ভারত সরকার কাজ করছে। গত এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ জন ভারতীয়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছিল এবং ১২ জন নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছিল।

সাহিল মাজোধির ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বিদেশে কাজ বা পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া তরুণদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটকে থাকা এক ভারতীয় যুবক, অন্যদিকে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা এক মায়ের অসহায় অপেক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে এখন ভরসা কেবল কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবিক সিদ্ধান্ত।