হাইলাইটস
- রামমন্দিরে ভক্তদের অনুদান তছরুপের অভিযোগে তদন্তে বড় অগ্রগতি।
- পদত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যেই পুলিশের জেরার মুখে প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই ও ট্রাস্টি অনিল মিশ্র।
- মন্দির প্রশাসক গোপাল রাওয়েরও বয়ান রেকর্ড করেছে তদন্তকারী দল।
- অভিযুক্তদের ব্যাংক লেনদেন খতিয়ে দেখতে অযোধ্যার স্টেট ব্যাঙ্ক শাখায় পুলিশের তল্লাশি।
- ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অনুদানের অর্থ গিয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- তদন্তের স্বার্থে স্টেট ব্যাঙ্কের দুই কর্মীকেও নোটিস পাঠানো হয়েছে।
অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের অনুদান আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত ক্রমশ আরও গভীরে প্রবেশ করছে। সোমবার এই মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করল শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্র ট্রাস্টের সদ্য পদত্যাগী সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই, ট্রাস্টি অনিল মিশ্র এবং মন্দিরের প্রশাসক গোপাল রাওকে। একই সঙ্গে তদন্তকারীরা আর্থিক লেনদেনের দিকটিও আরও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা শুরু করেছেন। তদন্তকারী সংস্থার এক শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক জানান, চলমান তদন্তের অংশ হিসেবেই তিনজনের বক্তব্য নথিবদ্ধ করা হয়েছে। আপাতত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও নতুন অভিযোগ আনা হয়নি। তবে তদন্তে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য ও নথির সঙ্গে তাঁদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হবে। জিজ্ঞাসাবাদের পরেই চম্পত রাই দিল্লির উদ্দেশে রওনা দেন, যা নিয়েও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে।
এই তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভক্তদের দান করা অর্থের সম্ভাব্য তছরুপ। ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হওয়া আট অভিযুক্তের আর্থিক লেনদেন খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে পুলিশ। তদন্তকারীদের সন্দেহ, অনুদানের কিছু অর্থ ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হয়ে থাকতে পারে। সেই সম্ভাবনা যাচাই করতেই অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এই উদ্দেশ্যে সোমবার পুলিশের একটি বিশেষ দল অযোধ্যার নয়া ঘাট এলাকায় অবস্থিত স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার শাখায় যায়। জানা গিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া আটজনের মধ্যে সাতজনের অ্যাকাউন্ট এই শাখায় রয়েছে। তদন্তকারীরা তাঁদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করেছেন এবং তাঁরা রামমন্দিরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সমস্ত জমা ও উত্তোলনের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষ করে বড় অঙ্কের নগদ জমা, সন্দেহজনক লেনদেন কিংবা অস্বাভাবিক আর্থিক গতিবিধির উপর নজর দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, কেবল অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাব নয়, সেই লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অর্থের উৎস, গন্তব্য এবং সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীদের চিহ্নিত করতে আর্থিক অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও তথ্য চাওয়া হতে পারে। তদন্তের অংশ হিসেবে স্টেট ব্যাঙ্কের দুই কর্মীকেও নোটিস পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলিতে কোনও অস্বাভাবিক লেনদেন নজরে এসেছিল কি না, কিংবা ব্যাংকের নিয়মবিধি মেনে সমস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না। যদিও এই দুই কর্মীকে এখনও অভিযুক্ত করা হয়নি, তাঁদের বক্তব্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
এই মামলায় ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া নথি, ডিজিটাল তথ্য ও আর্থিক রেকর্ডের ভিত্তিতেই তদন্ত এগোচ্ছে। পুলিশ চেষ্টা করছে, অভিযোগিত অর্থ আত্মসাতের পদ্ধতি, কত টাকা গায়েব হয়েছে এবং সেই অর্থ শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছেছে—এই তিনটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর খুঁজে বের করতে। চম্পত রাই ও অনিল মিশ্র সম্প্রতি ট্রাস্ট থেকে পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের পদত্যাগের পরপরই পুলিশের জেরার মুখে পড়া ঘটনাটিকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা এখনও পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক অভিযোগ আনেনি, তবুও ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অনুদান ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই ঘটনায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কোটি কোটি ভক্তের অনুদানে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানে অর্থ ব্যবস্থাপনার উপর নজরদারি, নিরীক্ষা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় আকারের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মাত্রার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং ডিজিটাল নথি পরীক্ষা—সব দিকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এলে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হতে পারে। প্রয়োজনে তদন্তের পরিধিও আরও বাড়ানো হবে।
অযোধ্যার রামমন্দিরকে ঘিরে এই অভিযোগ ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তবে পুলিশ যে আর্থিক লেনদেনের প্রতিটি স্তর খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে, তা স্পষ্ট। সেই কারণেই এই তদন্ত আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিতে পারে বলে প্রশাসনিক মহলের একাংশের ধারণা।