Home খবর ভয়াবহ ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর ফের প্রবল আফটারশক, আতঙ্কে রাস্তায় ভেনেজুয়েলার মানুষ

ভয়াবহ ভূমিকম্পের পাঁচ দিন পর ফের প্রবল আফটারশক, আতঙ্কে রাস্তায় ভেনেজুয়েলার মানুষ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
6 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • রাজধানী কারাকাস ও বন্দরনগরী লা গুয়াইরায় ৪.৬ মাত্রার শক্তিশালী আফটারশক।
  • মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১,৭১৯, এখনও নিখোঁজ কয়েক লক্ষের আশঙ্কা; হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন।
  • উদ্ধারকাজ চললেও জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা দ্রুত কমছে।
  • লুটপাট, আশ্রয় ও খাদ্যসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
  • ২৭টি দেশ উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে; আন্তর্জাতিক সাহায্য বাড়ছে।

ভেনেজুয়েলায় বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্পের মাত্র পাঁচ দিন পর ফের একটি শক্তিশালী আফটারশক আঘাত হানল। সোমবার ভোরে হওয়া এই কম্পনে রাজধানী কারাকাস এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন্দরনগরী লা গুয়াইরার মানুষ আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। এর মধ্যেই সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৭১৯ জনে। হাজার হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ, আর ক্রমেই গভীর হচ্ছে মানবিক বিপর্যয়।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) আফটারশকের মাত্রা ৪.৬ বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থা এর মাত্রা ৫.১ বলে দাবি করেছে। ভূমিকম্পের পরপরই বহু এলাকায় সাইরেন বেজে ওঠে এবং মানুষ প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় ছুটে আসেন। ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের প্রধান হোর্হে রদ্রিগেস জানান, নতুন করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর এখনও মেলেনি। তবু বুধবারের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের স্মৃতি এতটাই তাজা যে সামান্য কম্পনও মানুষের মধ্যে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।

কারাকাসের এল হাতিয়ো এলাকার বাসিন্দা আমারেলিস মেন্ডোজা বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় কম্পনে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তাঁর কথায়, “মনে হচ্ছিল বুধবারের ভূমিকম্পটাই যেন আবার ফিরে এসেছে।” রাজধানীর আলতামিরা ও সান বের্নার্দিনোর মতো ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বহু মানুষ এখনও বাড়িতে ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না। অনেকেই বহুতলের সামনে ফুটপাথে বা অস্থায়ী তাঁবুতে রাত কাটাচ্ছেন। আশঙ্কা, আবারও কম্পন হলে দুর্বল ভবনগুলি ভেঙে পড়তে পারে।

আফটারশকের পর নিরাপত্তার স্বার্থে কারাকাস মেট্রোর একাধিক পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সান বের্নার্দিনো এলাকায় সম্পূর্ণ ধসে পড়া ২২টি ফ্ল্যাটের রিটা অ্যাপার্টমেন্টে চলা উদ্ধারকাজও প্রায় দেড় ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হয়। রাজধানীর কিছু দোকানপাট খুলতে শুরু করলেও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পার্ক ও খোলা জায়গায় মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণে তারা ভেনেজুয়েলাকে ১০ হাজার মরদেহ সংরক্ষণের ব্যাগ সরবরাহ করবে। যদিও সংস্থার কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছেন, শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা যেন এতটা না বাড়ে। ভেনেজুয়েলায় জাতিসংঘের সমন্বয়কারী জিয়ানলুকা রাম্পোলা দেল তিন্দারো বলেন, সরকারি হিসাবের চেয়েও মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দ্রুত বাড়ছে এবং তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ২৭টি দেশ দুই হাজারেরও বেশি উদ্ধারকর্মী, ১৬০টিরও বেশি অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিপুল সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনী লা গুয়াইরা বন্দরের মেরামতির কাজ শেষ করেছে, ফলে সেখানে আবার ত্রাণ ও ভারী যন্ত্রপাতি পৌঁছতে শুরু করেছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল সেই বন্দর ব্যবহার করে জরুরি ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছে। কারাকাসের পার্কে শত শত পরিবার তাঁবু খাটিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। চার সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা কাটিউস্কা আসুয়াহে বলেন, “জীবনের দাম সবকিছুর চেয়ে বেশি। ছাদ ভেঙে মাথায় পড়ার অপেক্ষায় আমরা বসে থাকতে পারতাম না।”

আবার পশ্চিম কারাকাসের বাসিন্দা মারিউরি পেরেজ জানান, তাঁদের ঘর পুরোপুরি ধসে পড়েছে। এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি তাঁবু কিংবা অন্তত একটি গদি, যাতে মাথা গোঁজার জায়গা হয়। গত বুধবার ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়। উদ্ধারকারী দল এখনও ধ্বংসস্তূপে জীবিত মানুষের খোঁজ চালাচ্ছে। রবিবার লা গুয়াইরা থেকে এক ব্যক্তি ও তাঁর কিশোর পুত্রকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এমন ঘটনা এখন ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে।

অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেস জানিয়েছেন, যতক্ষণ জীবিত কাউকে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, ততক্ষণ উদ্ধার অভিযান চলবে। তবে আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মীদের অনেকেই মনে করছেন, এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত ৫,০৩৪ জন আহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮০০টি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৭২ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ মানুষ বিশুদ্ধ জল, স্বাস্থ্যবিধি, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

এরই মধ্যে লা গুয়াইরায় লুটপাটের ঘটনাও বেড়েছে। ওষুধের দোকান, সুপারমার্কেটসহ বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ অত্যন্ত ধীরগতিতে পৌঁছচ্ছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ধসে পড়া এলাকায় ৪৮ ঘণ্টার জন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রবেশও নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন। এতে ক্ষুব্ধ অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করছেন, প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন করার চেষ্টা চলছে।

ক্ষোভ এতটাই তীব্র যে, তানাগুয়ারেনা এলাকায় এক ব্যক্তি সেনাদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, “দেশের এখন অস্ত্র নয়, কোদাল আর বেলচা দরকার।” এ পর্যন্ত ২৪টি দেশ ৫২১ টন ত্রাণসামগ্রী, ৮৬টি অনুসন্ধানী কুকুরের দল এবং ২,৭০০-এরও বেশি উদ্ধারকর্মী পাঠিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার আশঙ্কা, এই দুর্যোগে প্রায় ৬৭ লক্ষ ৬০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অর্থনৈতিক সংকটে ভেঙে পড়া ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জনপরিষেবার ওপর এই ভূমিকম্প নতুন করে বিশাল চাপ সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে প্রায় ৬৭০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা ১৫ কোটি ডলার থেকে বাড়িয়ে ৩০ কোটি ডলার করার ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থ চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ জল, স্যানিটেশন, আশ্রয় এবং ত্রাণ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতিতে ব্যয় করা হবে।

নির্বাসিত বিরোধী নেত্রী María Corina Machado জানিয়েছেন, তিনি খুব শিগগিরই দেশে ফিরবেন। তাঁর কথায়, “এখন ভেনেজুয়েলার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময়। শোক ভাগ করে নিতে হবে, আবার একে অপরকে শক্তিও জোগাতে হবে।”


Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles