• আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার বিষয়ে আপাতত একমত হলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস রয়ে গেছে।
  • মঙ্গলবার কাতারে হরমুজ প্রণালী নিয়ে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা।
  • ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ নিয়ে বিদ্যমান সমঝোতার বাইরে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে উত্তেজনা আরও বাড়বে।
  • উপসাগরীয় দেশগুলিকে নিয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তেহরান।
  • বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় পুরোপুরি সচল করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যে গত কয়েক দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর আপাতত যুদ্ধবিরতির আবহ তৈরি হলেও পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক। আমেরিকা ও ইরান উভয়েই অস্ত্রবিরতি বজায় রাখার কথা বলছে, কিন্তু একই সঙ্গে পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগও তুলছে। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই মঙ্গলবার কাতারে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিকভাবে চালু করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের নজর এখন সেই বৈঠকের দিকেই।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি রবিবার ইরাক সফরে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালী পরিচালনা নিয়ে আগে যে সমঝোতা হয়েছে, তার বাইরে গিয়ে কোনও নতুন বা বিকল্প ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। তাঁর কথায়, গত দুই রাতের ঘটনাই প্রমাণ করেছে যে ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলকে আবারও সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আরাঘচির বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও নৌচলাচল নিয়ন্ত্রণে ইরান নিজের ভূমিকাকে কোনওভাবেই খর্ব হতে দেবে না। তেহরানের মতে, এই জলপথের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ইরানকে পাশ কাটিয়ে কোনও আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব নয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলিকে নিয়ে একটি যৌথ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার সময় এসেছে। তাঁর যুক্তি, বাইরের শক্তির সামরিক উপস্থিতি বরাবরই উত্তেজনা বাড়িয়েছে। তাই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত উপসাগরীয় দেশগুলিরই নেওয়া উচিত।

এই প্রস্তাবের রাজনৈতিক তাৎপর্যও যথেষ্ট। বহু বছর ধরেই ইরান দাবি করে আসছে, আমেরিকার সামরিক উপস্থিতিই মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার অন্যতম কারণ। অন্যদিকে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, বাহরিন ও কুয়েতের মতো দেশগুলি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিরাপত্তা সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। ফলে ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়ন সহজ হবে না।

হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু একটাই—বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই সরু জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, জাহাজ চলাচল এবং বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

গত কয়েক দিনের সংঘর্ষে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, মার্কিন সামরিক অভিযান এবং তার পাল্টা ইরানের প্রতিক্রিয়া গোটা অঞ্চলকে আবারও যুদ্ধের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। যদিও পরে উভয় পক্ষ সংঘর্ষ সীমিত রাখার ইঙ্গিত দেয় এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, কিন্তু বাস্তবে সেই যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে এখনও যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

মঙ্গলবার কাতারের বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য হল হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কীভাবে নিরাপদভাবে পুনরায় শুরু করা যায়, তার একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা তৈরি করা। তবে এই বৈঠকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে—প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার হাতে থাকবে এবং সেই ব্যবস্থায় ইরানের ভূমিকা কতটা হবে।

ইরান ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে, নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ও নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে আপস করবে না। অন্যদিকে আমেরিকাও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিয়েছে। ফলে কাতারের বৈঠক সফল করতে হলে দুই পক্ষকেই কিছুটা নমনীয় হতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনও পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চায় না। কারণ দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষ শুধু সামরিক ক্ষয়ক্ষতিই ডেকে আনবে না, বিশ্ব অর্থনীতিকেও বড় ধাক্কা দেবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে তার প্রভাব বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের উপর পড়বে।

কাতার দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। হামাস-ইজরায়েল সংঘাত থেকে শুরু করে আফগানিস্তান প্রশ্ন—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় দোহার কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যেও আলোচনার জন্য কাতারকে বেছে নেওয়া তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।

তবে আলোচনার টেবিলে বসলেই যে সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উভয় পক্ষের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এখনও বিদ্যমান। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার পর সেই অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। ফলে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে হলে শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপও প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা না হলে এই অঞ্চলে অস্থিরতা বারবার ফিরে আসবে। কারণ এই জলপথ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। এখানকার প্রতিটি উত্তেজনা আন্তর্জাতিক বাজারে তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

এখন তাই সবার চোখ কাতারের বৈঠকের দিকে। যদি আলোচনায় বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ বেরিয়ে আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালীও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে অথবা কোনও পক্ষ একতরফাভাবে নতুন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে, ইরানের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, পরিস্থিতি আবারও দ্রুত সংঘর্ষের দিকে গড়াতে পারে। বিশ্বের জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই বৈঠকের ফলাফলের উপর।