হাইলাইটস:

  • ভেনেজুয়েলার ভয়াবহ ভূমিকম্পে সরকারি মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০।
  • আহত প্রায় ৩,০০০, নিখোঁজ ৫০ হাজারেরও বেশি বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রসংঘ।
  • অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, “যত বেশি সম্ভব মানুষকে বাঁচাতে লড়াই চলবে।”
  • ধ্বংসস্তূপে খালি হাতে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন সাধারণ মানুষ; সরকারি সাড়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ।
  • একাধিক দেশ উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক ও ত্রাণ পাঠাতে শুরু করেছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ভেনেজুয়েলার এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর সরকারি মৃতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯২০-তে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি ডেলসি রদ্রিগেজ ঘোষণা করেছেন, যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। কিন্তু এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে সরকারি তৎপরতা অত্যন্ত ধীর বলে অভিযোগ উঠেছে এবং ক্ষোভও দ্রুত বাড়ছে।

শুক্রবার জাতীয় পরিষদের সভাপতি হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, সরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯২০ হয়েছে। এর আগে ডেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছিলেন, অন্তত ৩,০০০ মানুষ আহত হয়েছেন। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় অঞ্চল লা গুয়াইরা সফরকালে তিনি জানান, বিদেশি অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।

বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭.২ এবং ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প উত্তর ভেনেজুয়েলাকে কাঁপিয়ে দেয়। অসংখ্য বহুতল ভবন মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে। রাষ্ট্রসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ এখনও নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনও হাজার হাজার মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত বহু এলাকায় সরকারি উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে অসংখ্য মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেরাই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কারও হাতে ছিল শুধু শাবল, কারও হাতে হাতুড়ি, আর অনেকেই একেবারে খালি হাতেই কংক্রিট সরিয়ে জীবিতদের খুঁজতে থাকেন।

৩৩ বছর বয়সি প্যারামেডিক রটনি বম্বার্ট জানান, লা গুয়াইরার ১৫ তলা ‘ওপিপি ৩৩’ আবাসনে নিজের মা মারিয়া ইউজেনিয়াকে খুঁজতে তিনি টানা পাঁচ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপে কাটিয়েছেন। পরে আহত অবস্থায় রাজধানী কারাকাসের একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয় তাঁকে।

বম্বার্টের কথায়, “ভবনটি আগে ১৫ তলা ছিল। এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। প্রথম দিকে কোনও সরকারি উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছায়নি। তাই সাধারণ মানুষই উদ্ধারকাজ শুরু করেন। জরুরি পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রশিক্ষিত থাকি, কিন্তু এমন বিপর্যয়ের জন্য কেউ প্রস্তুত থাকতে পারে না। ধ্বংসস্তূপে ছিন্নভিন্ন দেহ, মৃত মানুষ আর শিশুদের দেখতে হয়েছে।”

আরও এক স্বেচ্ছাসেবী উদ্ধারকারী দিয়েগো গনসালেস জানান, কাটিয়া লা মার শহরের একটি বহুতল আবাসন ভেঙে পড়ার পর নিজের ৩৪ বছর বয়সি খুড়তুতো বোন হেলারি রদ্রিগেসকে বন্ধুদের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করতে তাঁদের চার ঘণ্টা লেগেছে।

তিনি বলেন, “মানুষ খালি হাতে কাজ করছে। উদ্ধার সরঞ্জাম অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কাটিয়া লা মার প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। খুব কম ভবনই অক্ষত রয়েছে।”

ভূমিকম্পে বিদেশি নাগরিকেরও মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে পর্তুগিজ বা পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত ১৫ জন, সাত জন চীনা, দুই জন ব্রাজিলীয়, পাঁচ জন স্প্যানিশ এবং এক ইতালীয়-ভেনেজুয়েলীয় নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তাও দ্রুত বাড়ছে। ব্রিটেন ৬৮ সদস্যের একটি বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। তাঁদের সঙ্গে রয়েছে ছয়টি বিশেষ প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং মানবিক সহায়তা কর্মীরা। পাশাপাশি অতিরিক্ত চিকিৎসক দল পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং জরুরি ত্রাণের জন্য ২০ লক্ষ পাউন্ড অর্থ বরাদ্দ করেছে ব্রিটিশ সরকার।

ভেনেজুয়েলার পাশে আন্তর্জাতিক মহল, তবু ত্রাণ পৌঁছতে দেরি

ভেনেজুয়েলার এই বিপর্যয়ে বিশ্বের একাধিক দেশ দ্রুত সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস ও রানি ক্যামিলা এক যৌথ বার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। ব্যক্তিগত বার্তায় রাজা চার্লস লিখেছেন, “ভেনেজুয়েলার মানুষের এই অপূরণীয় ক্ষতিতে আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। যাঁরা প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও জীবিকা হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা রইল। আহতদের দ্রুত আরোগ্য এবং উদ্ধারকর্মীদের সাফল্য কামনা করছি। এই কঠিন সময়ে ভেনেজুয়েলার মানুষের সাহস ও ধৈর্যের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।”

অন্যদিকে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন সেনাবাহিনী মানবিক সহায়তা অভিযানে অংশ নিচ্ছে। তাঁর কথায়, “আমাদের লক্ষ্য একটাই— যত দ্রুত সম্ভব প্রাণ বাঁচানো এবং যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া।”

আমেরিকা ২৫০ জনেরও বেশি সদস্যের একটি দুর্যোগ মোকাবিলা দল পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনটি বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী ইউনিট, যাদের সঙ্গে রয়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষকে শনাক্ত করার জন্য প্রশিক্ষিত কুকুর। মার্কিন দক্ষিণাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, মেজর জেনারেল কেভিন জে. জ্যারার্ড ইতিমধ্যেই কারাকাসে পৌঁছে উদ্ধার অভিযানের সমন্বয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন।

এ ছাড়াও ব্রাজিল, কলম্বিয়া, এল সালভাদর, মেক্সিকো, স্পেন, ফ্রান্স, তুরস্ক এবং সুইজারল্যান্ড উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা-সহায়তা ও ত্রাণ পাঠানোর ঘোষণা করেছে।

সরকারি ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন

তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা পৌঁছাতে শুরু করলেও দেশের বহু এলাকায় সরকারি তৎপরতার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভূমিকম্পের ৩৬ ঘণ্টা পরও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে কার্যত কোনও সরকারি সহায়তা পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে আবারও সামনে এসেছে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি এবং জনপরিষেবার অবনতির চিত্র।

লা গুয়াইরার হোসে মারিয়া ভার্গাস হাসপাতালে তোলা ভিডিওতে দেখা যায়, ভবনের ক্ষতির কারণে বহু রোগীকে হাসপাতালের বাইরে খোলা আকাশের নিচে শুইয়ে স্যালাইন ও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

আমেরিকার নর্থ টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ অরল্যান্ডো পেরেজের মতে, “সরকার এই বিপর্যয়ের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগই একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সক্ষমতার পরীক্ষা নেয়। এখানে দ্রুত উদ্ধার, চিকিৎসা এবং জরুরি পরিষেবা দেওয়ার ক্ষমতার ভয়াবহ ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”

তিনি আরও বলেন, “বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলভাণ্ডারের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা বছরের পর বছর সেই সম্পদের সদ্ব্যবহার করতে পারেনি। হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতি নেই, ওষুধ নেই, আর দুর্বল নির্মাণমানের কারণে অসংখ্য ভবন সহজেই ধসে পড়েছে। এর মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।”

আমরা প্রস্তুত ছিলাম না’— বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ

ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা হেসুস আরমাস অভিযোগ করেছেন, একের পর এক শাসক প্রশাসন জরুরি পরিষেবা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে অবহেলা করেছে। তাঁর মতে, দেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে এমন বড় ভূমিকম্প একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল না।

তিনি বলেন, “প্রতি ৫০ থেকে ৭০ বছর অন্তর এই অঞ্চলে বড় ভূমিকম্প হয়। আমরা জানতাম এই বিপদ একদিন আসবেই। কিন্তু সেই অনুযায়ী কোনও প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। গতকাল আমরা দেখেছি, নাগরিক সুরক্ষা বাহিনী, পুলিশ ও জাতীয় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরাও গ্লাভস, হেলমেট কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছাড়াই ধ্বংসস্তূপে কাজ করছেন। তাই এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উপায় নেই।”

জনশক্তির সংকটও বাড়িয়েছে বিপর্যয়

পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের অভিবাসন সংকট। অর্থনৈতিক দুর্দশা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গত এক দশকে প্রায় ৮০ লক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

হেসুস আরমাসের কথায়, “যাঁদের আজ সবচেয়ে বেশি দরকার— চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উদ্ধার বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সুরক্ষা কর্মী— তাঁদের অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। এই মানবসম্পদের ঘাটতি আজ আমাদের সামনে এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন

বিরোধী রাজনীতিক হুয়ান পাবলো গুয়ানিপা সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন, এত বড় বিপর্যয়ের পরও দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে কার্যকরভাবে উদ্ধারকাজে দেখা যাচ্ছে না কেন।

তিনি লেখেন, “এখনও পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রকৃত ও ব্যাপক উপস্থিতি আমরা দেখতে পাইনি। সাধারণ মানুষ, প্রতিবেশী এবং স্বেচ্ছাসেবীরাই নিজেদের হাতে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। এই সংকটে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে, সশস্ত্র বাহিনীকেও।”

একই প্রশ্ন তুলেছেন অধ্যাপক অরল্যান্ডো পেরেজও। তাঁর মতে, বহু মানুষের বক্তব্যে একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে— সেনাবাহিনীর বড় আকারের উদ্ধার অভিযান চোখে পড়ছে না।

তিনি বলেন, “বছরের পর বছর ধরে ভেনেজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে। বাহিনীকে মূলত অভ্যুত্থান ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হয়েছিল। ফলে নেতৃত্বের স্তর ভারী হলেও মাঠপর্যায়ে সক্ষমতা অনেকটাই কমে গেছে। নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। তাই এই বিপর্যয়ে তাদের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।”

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে হাজার হাজার মানুষ আটকে থাকতে পারেন। ফলে আগামী কয়েক দিনই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ধারকাজ যত দ্রুত এগোবে, তত বেশি প্রাণ বাঁচানোর সম্ভাবনা থাকবে। কিন্তু সময় যত গড়াবে, ততই সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে। ভেনেজুয়েলার সামনে এখন শুধু পুনর্গঠনের নয়, রাষ্ট্রের দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতাকে নতুন করে গড়ে তোলারও কঠিন চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে গেছে।