বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৭২ সালের পশ্চিমবঙ্গ জনশৃঙ্খলা রক্ষা আইন-এ বড় ধরনের সংশোধন আনতে চলেছে। এই সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য একটাই—যে ব্যক্তি বা সংগঠন বিক্ষোভ, দাঙ্গা, অবরোধ, ভাঙচুর বা জনঅশান্তির সময় সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি নষ্ট করবে, তাদের কাছ থেকেই ক্ষতিপূরণের টাকা আদায় করা হবে।

অর্থাৎ আগে ভাঙচুর হলে সরকার বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতি মেনে নিতেন, পরে ফৌজদারি মামলা চলত। এবার সেই অপরাধীর কাছ থেকে আইনিভাবে ক্ষতিপূরণও আদায় করা যাবে।

কেন এই আইন?

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখ্যায় সরকার বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অসামাজিক ব্যক্তি অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর এবং সম্পত্তি নষ্ট করে রাজ্যের শান্তি ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করেছে। তাই এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন যাতে ক্ষতিগ্রস্তরা দ্রুত ক্ষতিপূরণ পান, অপরাধীরা আর্থিকভাবে দায়বদ্ধ হন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর আগে মানুষ দু’বার ভাবতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ শুধু জেলের ভয় নয়, ক্ষতিপূরণও দিতে হবে।

কী নতুন ব্যবস্থা হচ্ছে?

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল ক্লেমস কমিশন নামে একটি বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করা। এটি সাধারণ আদালত নয়। এর একমাত্র কাজ হবে—

  • কত টাকার ক্ষতি হয়েছে,
  • কে সেই ক্ষতি করেছে,
  • কে উস্কানি দিয়েছে,
  • কে পরিকল্পনা করেছে,
  • কার কাছ থেকে কত টাকা আদায় হবে,

তা নির্ধারণ করা। অর্থাৎ ফৌজদারি মামলা আদালতে চলবে, আর ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দেখবে এই কমিশন।

সরকারি সম্পত্তি বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

বিলে সরকারি সম্পত্তির সংজ্ঞা অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে—

  • কেন্দ্র সরকারের সম্পত্তি
  • রাজ্য সরকারের সম্পত্তি
  • পুরসভা
  • পঞ্চায়েত
  • সরকারি দফতর
  • সরকারি সংস্থা
  • সরকারি কোম্পানি
  • সরকারি পরিবহণ
  • সরকারি হাসপাতাল
  • সরকারি স্কুল ও কলেজ
  • সরকারি দপ্তরের যন্ত্রপাতি

এছাড়া সরকার বিজ্ঞপ্তি জারি করে সরকারি অর্থে পরিচালিত অন্য কোনও সংস্থাকেও সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে।

বেসরকারি সম্পত্তিও সুরক্ষা পাবে

এই আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি শুধু সরকারি সম্পত্তির জন্য নয়। একই ঘটনায় যদি কোনও ব্যক্তির বাড়ি, দোকান, গাড়ি, কারখানা, অফিস, ব্যবসা, গুদাম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ট্রাস্ট বা কোম্পানির সম্পত্তি নষ্ট হয়, তাহলেও তিনি ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবেন। আগের আইনে এমন স্পষ্ট ব্যবস্থা ছিল না।

কোন কোন ক্ষেত্রে এই আইন কার্যকর হবে?

শুধু দাঙ্গা নয়, নিচের ঘটনাগুলির সময় সম্পত্তির ক্ষতি হলে এই আইন প্রযোজ্য হবে—

  • বিক্ষোভ
  • অবরোধ
  • মিছিল
  • জনঅশান্তি
  • দাঙ্গা
  • হিংসাত্মক জমায়েত
  • ভাঙচুর
  • অগ্নিসংযোগ
  • নাশকতা

কে মামলা শুরু করবে?

সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট দফতর ক্ষতির রিপোর্ট দেবে। তারপর জেলাশাসক অথবা পুলিশ কমিশনার ক্লেমস কমিশনের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করবেন। অর্থাৎ কোনও দফতর বিষয়টি চাপা দিয়ে রাখতে পারবে না।

তিন মাসের মধ্যে ব্যবস্থা

ঘটনার পরে সাধারণভাবে তিন মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে হবে। বছরের পর বছর অপেক্ষা করার কথা আইনে বলা হয়নি।

জেলাশাসকের নতুন দায়িত্ব

জেলাশাসক বা পুলিশ কমিশনারকে শুধু আবেদন করলেই চলবে না। তাঁকে ভাঙচুরের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে হবে, কতগুলি মামলা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ আদায় হচ্ছে কি না তা দেখতে হবে। প্রতি তিন মাসে সরকারকে রিপোর্টও পাঠাতে হবে। ফলে প্রশাসনের জবাবদিহি বাড়বে।

সাধারণ মানুষও সরাসরি আবেদন করতে পারবেন

এটি একটি বড় পরিবর্তন। ধরা যাক, রাজনৈতিক সংঘর্ষে আপনার দোকান ভেঙে দেওয়া হল। আগে মূলত ফৌজদারি মামলার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হত। এখন আপনি নিজেই ক্লেমস কমিশনের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করতে পারবেন।

ক্লেমস কমিশন আসলে কী?

এটি সাধারণ দেওয়ানি আদালত নয়, তবে আদালতের মতোই একটি বিশেষ বিচারব্যবস্থা। এর একমাত্র কাজ হবে জনঅশান্তি, দাঙ্গা, অবরোধ বা ভাঙচুরে সম্পত্তির ক্ষতির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করা।

কমিশন গঠন করবে কে?

রাজ্য সরকার সরকারি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এক বা একাধিক ক্লেমস কমিশন গঠন করতে পারবে। প্রয়োজনে অঞ্চলভিত্তিক বা জেলা ভিত্তিক কমিশনও গড়া যেতে পারে।

কমিশনের প্রধান কে হবেন?

চেয়ারম্যান হতে পারবেন শুধুমাত্র এমন ব্যক্তি, যিনি আগে জেলা বিচারক ছিলেন। অর্থাৎ কমিশনের নেতৃত্বে থাকবেন একজন অভিজ্ঞ বিচারক।

অন্য সদস্য কারা?

অন্যান্য সদস্য হবেন রাজ্য সরকারের উপসচিব বা তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার আধিকারিক। ফলে বিচার বিভাগ ও প্রশাসন—দুই পক্ষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে।

কমিশনের কাজ কী?

কমিশন নির্ধারণ করবে—

  • সত্যিই ক্ষতি হয়েছে কি না,
  • কত টাকার ক্ষতি হয়েছে,
  • কারা দায়ী,
  • কত টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে,
  • কার কাছ থেকে সেই টাকা আদায় হবে।

প্রয়োজনে কমিশন নিজেই তদন্তও করতে পারবে।

ক্লেমস কমিশনারের ভূমিকা

কমিশন চাইলে একজন ক্লেমস কমিশনার নিয়োগ করতে পারবে। তাঁর কাজ হবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ, সম্ভাব্য দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেওয়া।

বিশেষজ্ঞদেরও ডাকা যাবে

সেতু, বহুতল, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা দামি যন্ত্রপাতির মতো জটিল ক্ষতির ক্ষেত্রে কমিশন প্রকৌশলী, স্থপতি, মূল্য নির্ধারণকারী বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে পারবে।

ডিজিটাল প্রমাণের গুরুত্ব

এই আইনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, কমিশন সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ভিডিও, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও, ড্রোন ফুটেজ, ছবি, ইলেকট্রনিক তথ্য ও অন্যান্য ডিজিটাল নথিকে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করতে পারবে। ফলে শুধু প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের উপর নির্ভর করতে হবে না।

৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট

ক্লেমস কমিশনার সাধারণভাবে ৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবেন। বিশেষ প্রয়োজনে কমিশন সময় বাড়াতে পারবে।

দুই পক্ষকেই বক্তব্য রাখার সুযোগ

কমিশন রিপোর্ট পেলেই কাউকে দোষী ঘোষণা করবে না। অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত—উভয় পক্ষকেই নিজেদের বক্তব্য রাখার সুযোগ দিতে হবে। এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের অন্যতম মৌলিক নীতি।

দ্রুত বিচার

কমিশন সংক্ষিপ্ত বা সারসংক্ষেপ পদ্ধতিতে মামলা চালাতে পারবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রিতা কমে এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়।

আদালতের মতো ক্ষমতা

যদিও এটি সাধারণ আদালত নয়, তবু কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের বহু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যেমন—

  • সাক্ষী তলব করা,
  • শপথ করিয়ে জবানবন্দি নেওয়া,
  • নথি হাজির করতে বলা,
  • প্রমাণ সংগ্রহ,
  • তদন্তে সহযোগিতা বাধ্যতামূলক করা,
  • কমিশন জারি করা।

দেওয়ানি আদালতের মর্যাদা

নির্দিষ্ট আইনি উদ্দেশ্যে ক্লেমস কমিশনকে দেওয়ানি আদালত হিসেবে গণ্য করা হবে। ফলে কমিশনের নির্দেশ অমান্য করলে বা তদন্তে বাধা দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

কীভাবে আবেদন করতে হবে?

ক্ষতিপূরণের আবেদন নির্দিষ্ট ফর্মে করতে হবে। আবেদনপত্রের ধরন, প্রয়োজনীয় নথি এবং প্রযোজ্য ফি সম্পর্কে পরে সরকার আলাদা নিয়ম জারি করবে। আবেদনকারী নিজে অথবা লিখিতভাবে অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন।