হাইলাইটস:
- পরপর মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প।
- উপকূলীয় মোরোন অঞ্চলের কাছে উৎপত্তি, রাজধানী কারাকাসে বহু ভবন ধসে পড়েছে।
- মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বড় ধরনের প্রাণহানি ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
- জরুরি অবস্থা ঘোষণা, উদ্ধারকাজে সেনা ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী নামানো হয়েছে।
- বিমানবন্দর, গণপরিবহন ও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত; আফটারশকের সতর্কতা জারি।
ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। বুধবার সন্ধ্যায় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আঘাত হানা দুটি প্রবল কম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কেঁপে ওঠে। বহুতল ভবন ধসে পড়ে, রাস্তায় আতঙ্কে ছুটে বেরিয়ে আসেন হাজার হাজার মানুষ। এখনও পর্যন্ত হতাহতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হলেও, উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছে, এই বিপর্যয়ে প্রাণহানি অত্যন্ত বেশি হতে পারে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও হবে বিপুল।
ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২। এর কেন্দ্রস্থল ছিল ক্যারিবীয় উপকূলের মোরোন শহরের পশ্চিমে, রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার দূরে। প্রথম কম্পনের মাত্র ৪০ সেকেন্ড পর একই অঞ্চলে আরও শক্তিশালী ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্প আঘাত হানে। দ্বিতীয় ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মোরোনের দক্ষিণ-পশ্চিমে। দুটি ভূমিকম্পই ছিল অগভীর, ফলে ভূপৃষ্ঠে কম্পনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাজধানী কারাকাস। শহরের বিভিন্ন এলাকায় বহুতল আবাসন, হোটেল ও সরকারি ভবনের অংশ ভেঙে পড়েছে। ধুলোর বিশাল মেঘে ঢেকে যায় বহু এলাকা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কিত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে রাস্তায় ছুটছেন, কেউ কেউ ধসে পড়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ করছেন। উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জাতির উদ্দেশে ভাষণে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি নাগরিকদের ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে দূরে থাকার এবং গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে হাসপাতাল, দমকল, সেনাবাহিনী এবং দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদনও জানানো হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।
অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেলো জানান, মূল ভূমিকম্পের পর একাধিক আফটারশক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর সতর্কবার্তা, প্রথম কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলি পরবর্তী কম্পনে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। তাই সাধারণ মানুষকে আপাতত খোলা জায়গায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে।
বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মেট্রো ও রেল পরিষেবাও স্থগিত রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার একাধিক অংশে বিঘ্ন ঘটেছে, ফলে উদ্ধারকাজেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে। উপকূলবর্তী কয়েকটি এলাকায় প্রথমে সুনামির সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ। তবে এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ৭-এর বেশি মাত্রার দুটি ভূমিকম্পের ঘটনা অত্যন্ত বিরল। ভূকম্পবিদদের ভাষায় একে “ডাবলেট আর্থকোয়েক” বলা হয়, যেখানে প্রথম কম্পনের পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আরও বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে জানানো হয়েছে, এই মাত্রার ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সরকারি ভাবে এখনও চূড়ান্ত হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করা হয়নি, উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হবে না। রাতভর সেনাবাহিনী, দমকল ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই ভূমিকম্পকে ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯৬৭ সালের কারাকাস ভূমিকম্পের পর এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেশটি দেখেনি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। আফটারশকের আশঙ্কা এখনও কাটেনি, ফলে বিপর্যস্ত এলাকাগুলিতে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ আগামী কয়েক দিন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।