হাইলাইটস
- দেশে মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি এখন প্রায় ৪৩ শতাংশ।
- ধান, ডাল, তৈলবীজ-সহ খরিফ ফসলের বপন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা।
- জলাধারগুলিতে পানির মজুত কমে যাওয়ায় সেচ নিয়েও উদ্বেগ।
- কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি পরিস্থিতির উপর নজরদারি বাড়িয়েছে।
- আবহাওয়ার উন্নতি না হলে খাদ্যশস্য উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার: দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বর্ষার অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেকটাই ধীর হওয়ায় কৃষিক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি মরশুমে এখনও পর্যন্ত বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কম। এই ঘাটতির ফলে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে খরিফ ফসল, যার উপর ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বড় অংশ নির্ভরশীল।
ভারতে খরিফ মরশুম সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সময়ে ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, তুলো, বাজরা, ডাল এবং বিভিন্ন তৈলবীজের চাষ হয়। এই ফসলগুলির অধিকাংশই সরাসরি বর্ষার জলের উপর নির্ভরশীল। ফলে মৌসুমি বৃষ্টি সময়মতো না এলে বপন বিলম্বিত হয়, চাষের পরিমাণ কমে যায় এবং উৎপাদনেও ধাক্কা লাগে।
কৃষি মন্ত্রকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বহু রাজ্যে এখনও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় জমি প্রস্তুত করা এবং বীজ বপনের কাজ স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে না। বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি অঞ্চলে পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক। মধ্য ভারত, পশ্চিম ভারতের কিছু অংশ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় বৃষ্টির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।
ধান চাষ নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের মেরুদণ্ড হিসেবে ধানকে ধরা হয়। সময়মতো চারা রোপণ না হলে ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বৃষ্টির ঘাটতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে জলাধারগুলির উপর। দেশের বহু প্রধান বাঁধ এবং জলাধারে স্বাভাবিকের তুলনায় কম পানি জমেছে। এর ফলে সেচের জন্য পর্যাপ্ত জল পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেসব এলাকায় নলকূপ বা ভূগর্ভস্থ জলের উপর নির্ভরতা বেশি, সেখানেও অতিরিক্ত জল তোলার ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত চাপ বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুন মাসে বর্ষার দুর্বলতা সবসময় চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করে না। জুলাই এবং অগস্টে যদি ভালো বৃষ্টি হয়, তাহলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি সম্ভব। ভারতের কৃষি ব্যবস্থা বহু ক্ষেত্রেই বর্ষার দ্বিতীয়ার্ধের উপর নির্ভরশীল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বৃষ্টির ঘাটতি বজায় থাকলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়বে।
কেন্দ্রীয় সরকার ইতিমধ্যেই রাজ্যগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। কৃষি ও আবহাওয়া দপ্তর যৌথভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। কোথাও প্রয়োজন হলে বিকল্প ফসলের পরামর্শ, খরা মোকাবিলা পরিকল্পনা এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলে তার প্রভাব শুধু গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না। খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, গ্রামীণ আয় হ্রাস এবং সামগ্রিক ভোগব্যয়ের উপরও এর প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।
তবে আপাতত সরকার পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক কিন্তু নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়’ বলেই দেখছে। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে বর্ষা সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই পূর্বাভাস সত্যি হলে কৃষকরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন এবং বিলম্বিত বপনের ক্ষতিও আংশিকভাবে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবু বাস্তবতা হল, বর্ষার উপর নির্ভরশীল ভারতের কৃষি অর্থনীতি আবারও প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার সামনে দাঁড়িয়ে। আগামী কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টিই নির্ধারণ করবে খরিফ মরশুম কতটা সফল হবে এবং দেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের চিত্র শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।