হাইলাইটস
- রাষ্ট্রসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের দাবি, গাজায় নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।
- কমিশনের মতে, ইজরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।
- শিশুদের হত্যা ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিকে গণহত্যার অভিপ্রায়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
- গাজায় খাদ্য, ওষুধ ও ত্রাণ অবরোধের ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
- পশ্চিম তীরেও ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা ও অমানবিক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।
- ইজরায়েল রিপোর্টকে “মানহানিকর প্রহসন” বলে খারিজ করেছে।
রাষ্ট্রসংঘের একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, গাজায় ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্য করে হত্যা করার মাধ্যমে ইজরায়েল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার প্রকাশিত কমিশনের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা গণহত্যার অভিপ্রায়ের দিকে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ইজরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত মানুষের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরলিধর এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রমাণ দেখাচ্ছে যে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং হত্যা করা হয়েছে।” গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে একই কমিশন তাদের আরেকটি প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছিল যে, ইজরায়েল গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu-সহ দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা সেই কর্মকাণ্ডে উসকানি দিয়েছেন। নেটানিয়াহুর বিরুদ্ধে পৃথকভাবে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে International Criminal Court-এর গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।
ইজরায়েলের জেনেভা মিশন অবশ্য নতুন রিপোর্টকে “মানহানিকর ও ভিত্তিহীন” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইজরায়েল গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। একই সঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র রাষ্ট্রগুলির কূটনৈতিক সমর্থনও পেয়ে চলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কমিশনের মতে, এটি দেখায় যে গাজায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য থেকেই এই হামলাগুলি চালানো হয়েছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ইজরায়েলি বাহিনী ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় বারবার ভারী ও উচ্চ-বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যদিও তারা জানত যে এতে বিপুল সংখ্যক শিশু নিহত হচ্ছে। কমিশনের ভাষ্য, এত বিপুল শিশু হতাহতের পরও একই ধরনের হামলা অব্যাহত রাখা থেকে বোঝা যায় যে এই আক্রমণগুলি অনিচ্ছাকৃত ছিল না। মুরলিধর বলেন, “শিশুদের লক্ষ্য করে আঘাত হানার অর্থ হলো ফিলিস্তিনি জনগণের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া।”
প্রতিবেদনে গাজার মানবিক পরিস্থিতিরও কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অব্যাহত বোমাবর্ষণ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহে বাধা এবং ত্রাণ অবরোধের কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে বহু প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে এবং লক্ষ লক্ষ শিশু গভীর মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছে।
তদন্ত কমিশন আরও জানিয়েছে, হাসপাতাল ও প্রজনন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির ওপর হামলার কারণে নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে গেছে এবং গর্ভপাতের ঘটনাও বেড়েছে। গাজার প্রায় সব শিশুরই এখন মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইজরায়েল পাল্টা অভিযোগ করেছে যে হামাস নিয়মিতভাবে ত্রাণসামগ্রী ও হাসপাতালের জ্বালানি নিজেদের কাজে ব্যবহার করেছে। হামাস এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ত্রাণ ও জ্বালানি প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণগ্রেপ্তার ও আটক অভিযানের সময় শিশুদের ওপর নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে কিশোর ছেলেদের আটকাবস্থায় জোর করে পোশাক খুলিয়ে দেওয়া, মারধর করা এবং খাদ্য থেকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনাকে কমিশন নথিবদ্ধ করেছে। তাদের মতে, এই আচরণ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, নির্যাতন এবং গুরুতর অমানবিক কর্মকাণ্ডের শামিল।
এই প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গাজা যুদ্ধ নিয়ে বিতর্ককে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। কারণ, গণহত্যা আন্তর্জাতিক আইনে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধগুলির একটি, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের পর বিশেষভাবে সংজ্ঞায়িত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।