বিশ্বকাপের রাজা ক্লোসে: কাঠমিস্ত্রির শিক্ষানবিশ থেকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস আট বছর বয়সে জার্মানিতে এসে জার্মান ভাষায় মাত্র দু’টি শব্দ জানতেন মিরোস্লাভ ক্লোসে।
- পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে তিনি কাঠমিস্ত্রির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
- ২০ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার ফুটবলে সুযোগ পান, যা বিশ্বমানের স্ট্রাইকারদের তুলনায় অনেক দেরি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস
- আট বছর বয়সে জার্মানিতে এসে জার্মান ভাষায় মাত্র দু’টি শব্দ জানতেন মিরোস্লাভ ক্লোসে।
- পেশাদার ফুটবলার হওয়ার আগে তিনি কাঠমিস্ত্রির প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
- ২০ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার ফুটবলে সুযোগ পান, যা বিশ্বমানের স্ট্রাইকারদের তুলনায় অনেক দেরি।
- ২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে পাঁচটি করে গোল করে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেন।
- ২০১৪ সালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
- সততা ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য ফুটবলজগতে আলাদা সম্মান পেয়েছেন।
- আজ তাঁর ১৬ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড ভাঙার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন Lionel Messi।
মিরোস্লাভ ক্লোসে ১৯৮৬ সালে জার্মানির কুসেল শহরে পৌঁছেছিলেন মাত্র আট বছর বয়সে। তখন তিনি জার্মান ভাষার মাত্র দু’টি শব্দ জানতেন। পোল্যান্ডের ওপোলে শহরে জন্ম নেওয়া ছেলেটির বাবা ফ্রান্সে পেশাদার ফুটবল খেলতেন। পরিবারটি শেষ পর্যন্ত জার্মানিতেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ভবিষ্যতে যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করবেন, সেই ছেলেটি তখনও স্কুলের রাস্তা জিজ্ঞাসা করতে পারতেন না।
ক্লোসে ভাষা শিখেছিলেন ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে। ঠিক যেমন শিখেছিলেন জীবনের অন্য সবকিছু। তিনি খেলতেন স্থানীয় ক্লাব এসজি ব্লাউবাখ-ডিডেলকপফের হয়ে। সেটি ছিল পশ্চিম জার্মানির সপ্তম ডিভিশনের দল, যেখানে প্রতিভা খুঁজতে কোনও স্কাউট যেত না। দিনের বেলায় তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখতেন। হাতে, চুলে লেগে থাকত কাঠের গুঁড়ো। সেই সময় ফুটবল ছিল তাঁর শখ, পেশা নয়।
বিশ্বমানের অধিকাংশ স্ট্রাইকার কৈশোরেই আলোচনায় চলে আসেন। কিন্তু ক্লোসের ক্ষেত্রে তা হয়নি। তিনি ২০ বছর বয়সে এফসি হোমবুর্গের রিজার্ভ দলে সুযোগ পান। তারপর কাইজারস্লাউটার্ন। ২০০১-০২ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় একের পর এক গোল করে নজর কাড়েন। জার্মান কোচ Rudi Völler তাঁকে ২০০২ বিশ্বকাপের দলে জায়গা দেন।
এরপরই বদলে যায় সবকিছু।
২০০২ বিশ্বকাপে ক্লোসে পাঁচটি গোল করেন, সবকটিই হেড থেকে। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ৮-০ জয়ের ম্যাচে করেন হ্যাটট্রিক। গোল করার পর তাঁর বিখ্যাত সামনের দিকে ডিগবাজি বা ‘ফ্রন্ট-ফ্লিপ’ দর্শকদের মুগ্ধ করে। সেই থেকেই জার্মানিতে তাঁর নাম হয়ে যায় ‘সাল্টো-ক্লোসে’।
২০০৬ সালে নিজের দেশের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপেও তিনি পাঁচটি গোল করেন এবং জেতেন গোল্ডেন বুট। তখন আর তিনি শুধু এক কাঠমিস্ত্রির শিক্ষানবিশ নন; তিনি জার্মানির সেরা ফুটবলারদের একজন। ২০০৭ সালে যোগ দেন Bayern Munich-এ। সেখানে দুটি লিগ শিরোপা জয়ের পর ২০১১ সালে পাড়ি জমান Lazio-তে। ইতালিতে এক ম্যাচে পাঁচ গোল করে তিনি নতুন ইতিহাসও গড়েন।
তবে ক্লোসেকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে শুধু গোল নয়, তাঁর সততা।
২০০৫ সালে এক ম্যাচে পেনাল্টি পান তিনি। গোলরক্ষককে হলুদ কার্ডও দেখানো হয়। কিন্তু ক্লোসে নিজেই রেফারিকে গিয়ে বলেন সিদ্ধান্তটি ভুল। পেনাল্টি বাতিল হয়। পরে তিনি ফেয়ার প্লে পুরস্কার পান। ২০১২ সালে নাপোলির বিরুদ্ধে হাত দিয়ে গোল করার পরও তিনি নিজেই রেফারিকে সত্যিটা জানান। গোল বাতিল হয়। কার্ড নয়, বরং করমর্দন পান তিনি।
লাৎসিওতে খেলাকালীন আরেকটি ঘটনা তাঁর চরিত্রকে তুলে ধরে। প্রতিদিন অনুশীলনের পর তিনি বরফজলে ডুব দিতেন শরীর ঠিক রাখতে। তরুণ ফুটবলাররা তা করত না। অনুশীলন শেষে ক্লোসেকে বল কুড়িয়ে আনতেও দেখা যেত। সতীর্থরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বুঝতেই পারতেন না, এতে অবাক হওয়ার কী আছে।
২০১২ সালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন আর ডিগবাজি খাবেন না। বয়স তখন ৩৪। হাঁটু আর আগের মতো সাড়া দিচ্ছিল না। কিন্তু ২০১৪ বিশ্বকাপে ঘানার বিরুদ্ধে গোল করে যখন ব্রাজিলের মাঠে বিশ্বকাপে নিজের ১৫তম গোল করেন এবং ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি Ronaldo-র রেকর্ড স্পর্শ করেন, তখন আবেগে আর নিজেকে সামলাতে পারেননি। শেষবারের মতো দেখা যায় সেই বিখ্যাত ডিগবাজি।
তিন দিন পর আসে ইতিহাসের মুহূর্ত। স্বাগতিক ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ৭-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে তিনি করেন বিশ্বকাপে নিজের ১৬তম গোল। সেটিই তাঁকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা বানায়। আঘাতের কারণে সেদিন ডিগবাজি নয়, হাঁটু গেড়ে স্লাইড করেই উদযাপন করেছিলেন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলটি।
সেই বিশ্বকাপেই জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়। ক্লোসে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান ১৩৭ ম্যাচে ৭১ গোল করে। তাঁর নাম উঠে যায় বিশ্বফুটবলের শীর্ষে।
এখন তিনি জার্মানির দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব 1. FC Nürnberg-এর কোচ।
আজ ডালাসে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছেন Lionel Messi। মাত্র একটি গোল করলেই ক্লোসের ১৬ গোলের রেকর্ড ভেঙে যাবে।
এই সম্ভাবনা নিয়ে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে ক্লোসেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাঁর উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত—রেকর্ড একদিন না একদিন ভাঙবেই। আর যদি কেউ ভাঙেন, তবে মেসির মতো একজন ভাঙুক, তাতেই তিনি খুশি।
সেই উত্তরেই যেন লুকিয়ে আছে সেই ছোট্ট ছেলেটির চরিত্র, যে একদিন নিজের গোল নিজেই বাতিল করিয়ে দিয়েছিল। ফুটবলের ইতিহাসে ক্লোসে শুধু সর্বোচ্চ গোলদাতা নন, তিনি সততা, পরিশ্রম ও বিনয়েরও এক বিরল প্রতীক।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



