টরন্টোর বিকেলটা যেন আবারও পুরনো এক ফুটবল সত্যকে মনে করিয়ে দিল—জার্মানিকে কখনও শেষ বাঁশি বাজার আগে হারানো যায় না। অনেকেই বলেন, সেই নির্দয়, যন্ত্রের মতো জার্মানি আর নেই; কিন্তু ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয় ছিনিয়ে আনার পুরনো অভ্যাস যে এখনও অটুট, তা প্রমাণ করল জুলিয়ান নাগেলসমানের দল।
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ পর্বের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে ১২ বছর পর আবার নকআউট পর্বে উঠল জার্মানি। ম্যাচের নায়ক ডেনিজ উন্ডাভ। বদলি হিসেবে নেমে তিনি ৬৮ মিনিটে সমতা ফেরান এবং যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে জয়সূচক গোল করে জার্মান সমর্থকদের উল্লাসে ভাসান।
প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া জার্মানি এদিন অনেক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল আইভরি কোস্ট শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলেছিল। ৩০ মিনিটে ফ্রাঙ্ক কেসিয়ে গোল করে তাদের এগিয়েও দেন।
গোলটির সূচনা করেন ১৯ বছর বয়সি তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দে। বাঁ দিক দিয়ে এগিয়ে তাঁর নিচু ক্রস থেকে আমাদ দিয়ালো প্রথম শট নেন। সেই প্রচেষ্টা ব্লক হলেও ফিরতি বল পেয়ে কেসিয়ে নির্ভুল শটে ম্যানুয়েল নয়ারকে পরাস্ত করেন।
গোল খাওয়ার পর কিছুটা হতভম্ব দেখাচ্ছিল জার্মানিকে। এর আগে কাই হাভার্টজের একটি গোল বাতিল হয়ে যাওয়াও তাদের হতাশ করেছিল। জামাল মুসিয়ালার ফাউলের কারণে সেই গোল গণ্য হয়নি।
তবে ম্যাচের শুরুটা ছিল জার্মানিরই। মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মাথায় হাভার্টজ গোলের চেষ্টা করেন। পরে যোশুয়া কিমিখের ক্রস থেকে তাঁর হেডার অসাধারণ দক্ষতায় বাঁচান আইভরি কোস্টের গোলরক্ষক ইয়াহিয়া ফোফানা। মুসিয়ালাও কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করেছিলেন, কিন্তু গোল আসেনি।
প্রথমার্ধে আইভরি কোস্টের কৌশল ছিল স্পষ্ট। তারা নিজেদের অর্ধে রক্ষণ শক্ত করে জার্মানিকে সামনে টেনে আনছিল এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পাস ও ফিনিশিংয়ে ঘাটতি থাকায় তারা ব্যবধান বাড়াতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে নাগেলসমান পরিস্থিতি বদলাতে একসঙ্গে তিনটি পরিবর্তন করেন। সেই সিদ্ধান্তই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
৬৮ মিনিটে নাদিয়েম আমিরির পাস থেকে উন্ডাভ কাছ থেকে ভলি মেরে সমতা ফেরান। গোলের পর জার্মানি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণে আইভরি কোস্টের রক্ষণ চাপে পড়তে থাকে।
ফোফানা দুর্দান্ত কয়েকটি সেভ করে দলকে বাঁচিয়ে রাখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি আর কিছু করতে পারেননি।
যোগ করা সময়ে ফেলিক্স এনমেচার পাস পেয়ে উন্ডাভ বক্সের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়ে জোরালো শট নেন। বল জালে জড়িয়ে যেতেই টরন্টো স্টেডিয়ামে জার্মান সমর্থকদের উল্লাস ফেটে পড়ে। ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
ম্যাচ শেষে নাগেলসমান বলেন, “আমরা প্রাপ্য জয় পেয়েছি। ছেলেরা অসাধারণ পরিশ্রম করেছে। বদলি হিসেবে যারা নেমেছে, প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দ্বিতীয়ার্ধে আমরা অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়েছিলাম, কারণ আমরা জিততেই চেয়েছিলাম।”
অন্যদিকে আইভরি কোস্টের কোচ এমেরসে ফায়ে পরাজয়ে হতাশ হলেও দলের পারফরম্যান্সে গর্বিত। তাঁর কথায়, “হারটা কষ্টের, কিন্তু বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে আমরা যেভাবে খেলেছি, তাতে গর্ব করার অনেক কারণ আছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের পরের ম্যাচে সাহায্য করবে।”
পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে জার্মানির আধিপত্য। বল দখলে তারা ছিল ৫৮ শতাংশ সময়। গোলমুখে ১৬টি প্রচেষ্টা চালায়, যার মধ্যে ৭টি ছিল লক্ষ্যে। বিপরীতে আইভরি কোস্ট মাত্র দুটি শট লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে।
২০১৮ সালের আগে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে কখনও বিদায় নেয়নি জার্মানি। কিন্তু রাশিয়া ও কাতার—পরপর দুটি বিশ্বকাপে প্রথম পর্বেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের। সেই ব্যর্থতার পর এবার নকআউট পর্বে পৌঁছানো জার্মান ফুটবলের জন্য বড় স্বস্তি।
তবে এই জয় সহজে আসেনি। মুসিয়ালা ও ফ্লোরিয়ান ভির্টজের ফর্ম নিয়ে প্রশ্ন ছিল, নির্ভরযোগ্য স্ট্রাইকারের অভাব ছিল, ৪০ বছর বয়সি ম্যানুয়েল নয়ারকে অবসর ভেঙে ফিরিয়ে আনতে হয়েছে। কোচ নাগেলসমানও সমালোচনার মুখে ছিলেন।
কিন্তু টরন্টোর রাত শেষে জার্মানরা আবার মনে করিয়ে দিল, টুর্নামেন্ট ফুটবলে তারা এখনও বিশেষ এক জাতের দল। নিজেদের ভাষায়—‘টার্নিয়ারম্যানশাফট’, অর্থাৎ টুর্নামেন্টের দল।
আর সেই পরিচয়ের জোরেই ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রথমবারের মতো আবার নকআউট পর্বে পৌঁছে গেল জার্মানি। উন্ডাভের দুই গোল হয়তো শুধু একটি ম্যাচ জেতায়নি, জার্মান ফুটবলের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিয়েছে।