Table of Contents
জোনাথন উইলসন, এস্তাদিও মনতেরে থেকে হয়তো সমস্যাটা কোচ ছিলেন না। গত সপ্তাহে সুইডেনের কাছে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর টিউনিসিয়া বরখাস্ত করেছিল সাবরি লামুশিকে। তাঁর জায়গায় আনা হয় আফ্রিকার অন্যতম সফল কোচ হার্ভে রেনার্ডকে। কিন্তু মাত্র তিন দিনের মধ্যে অলৌকিক কিছু ঘটানো সম্ভব হয়নি। রক্ষণে আত্মবিশ্বাসহীন, আক্রমণে নিষ্প্রভ টিউনিসিয়া একই রকম দুর্বলই থেকে গেল।
ফলাফলও তাই। ফেয়েনুর্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার অনবদ্য নৈপুণ্যে জাপান ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিল টিউনিসিয়াকে। দুটি গোল করলেন উয়েদা, আর পুরো ম্যাচজুড়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও কল্পনাপ্রবণ ফুটবলে নেতৃত্ব দিলেন জাপানের আক্রমণভাগকে।
রেনার্ডের হাতে সময় ছিল মাত্র তিন দিন। ২০১২ সালে জাম্বিয়াকে এবং ২০১৫ সালে আইভরি কোস্টকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জেতানো এই ফরাসি কোচ নিজেই আগেই বলেছিলেন, “আমি জাদুকর নই।”ম্যাচ শেষে তাঁর কণ্ঠেও ছিল হতাশার সুর।“আমরা আরও ভালো প্রতিক্রিয়া ও ভালো পারফরম্যান্স আশা করেছিলাম। কিন্তু স্কোরলাইন দুই দলের পার্থক্যই তুলে ধরেছে। বিশেষ করে রক্ষণে আমরা অত্যন্ত দুর্বল ছিলাম,” বলেন রেনার্ড।
বিশ্বকাপ ইতিহাসের মাইলফলক
এই ম্যাচ ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১,০০০তম ম্যাচ।১৯৩০ সালে উরুগুয়ের মন্টেভিডিওতে ফ্রান্স-মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র-বেলজিয়ামের ম্যাচ দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৯৬ বছর পরে তা এসে পৌঁছেছে মেক্সিকোর গরম ও আর্দ্র মনতেরেতে।আর এই মাইলফলক ম্যাচেই গড়ে উঠল নতুন ইতিহাস। বিশ্বকাপে কোনো এশীয় দলের সবচেয়ে বড় জয়ের রেকর্ড গড়ল জাপান।ম্যাচের আগের দিন প্রবল বজ্রঝড়ে স্টেডিয়াম চত্বর প্লাবিত হয়ে গিয়েছিল। প্রধান সড়ক পরিণত হয়েছিল উন্মত্ত জলস্রোতে। কিন্তু ম্যাচের দিন সেই দুর্যোগের খুব বেশি চিহ্ন দেখা যায়নি।টিউনিসিয়ার সমস্যাগুলো অবশ্য এত সহজে আড়াল করা সম্ভব ছিল না।
শুরু থেকেই জাপানের আধিপত্য
রেনার্ড আগের কৌশলই প্রায় ধরে রাখেন। গোলপোস্টে শুধু আইমেন দাহমেনকে নামানো হয়। কিন্তু দল একই থাকলে ফলও একই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।ম্যাচের মাত্র ৭০ সেকেন্ডের মাথায় জাপানের পেনাল্টি পাওয়ার কথা ছিল। উয়েদাকে ফেলে দেন এলিয়েস স্কিরি। কিন্তু রেফারি ইস্তভান কোভাচস ফাউল দেননি, আর ভিডিও সহকারী রেফারিও হস্তক্ষেপ করেননি।তবে জাপানকে বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি।চতুর্থ মিনিটেই গোল। বাম প্রান্ত থেকে কেইতো নাকামুরার নিচু ক্রস ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো ডাইচি কামাদার গোড়ালিতে লেগে জালে জড়ায়।সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে রেনার্ডের মুখে তখন বিস্ময় ও আতঙ্কের মিশ্র অভিব্যক্তি।নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র করা দল থেকে জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসু চারটি পরিবর্তন করেছিলেন। আহত তাকেফুসা কুবোর অনুপস্থিতি ছাড়াও ছিল কয়েকটি কৌশলগত বদল।সেগুলো পুরোপুরি সফল হয়।নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে বল ছাড়া বেশি সময় কাটালেও এদিন জাপান আক্রমণের ঢেউ তুলেছিল। ম্যাচের প্রথম দশ মিনিটেই ব্যবধান আরও বাড়তে পারত।
উয়েদার জাদু
৩১তম মিনিটে এল দ্বিতীয় গোল।উয়েদা অবিশ্বাস্য পরিমাণ ফাঁকা জায়গা পেয়ে বল গ্রহণ করেন। জুনিয়া ইতোর দৌড় উপেক্ষা করে তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে শট নেন। মনতাসার তালবির দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বল গড়িয়ে যায় জালের নিচের কোণে।রেনার্ডের মুখে তখন তিক্ত হাসি।বিরতির পর টিউনিসিয়া কিছুটা সংগঠিত ফুটবল খেললেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।জাপান দ্বিতীয়ার্ধে শক্তি সঞ্চয় করেই খেলছিল। তারপরও ৬৯ মিনিটে তৃতীয় গোল আসে। উয়েদার হেডের ফ্লিক থেকে জুনিয়া ইতো গোল করেন। টিউনিসিয়ার ডিফেন্ডার মোহামেদ আমিন বেন হামিদা বাকি রক্ষণভাগের চেয়ে কয়েক গজ পিছিয়ে থাকায় ইতো অনসাইড ছিলেন।রেনার্ড সঙ্গে সঙ্গে আইপ্যাডে রিপ্লে দেখতে শুরু করেন। পরবর্তী জলবিরতির সময় তাঁকে দেখা যায় ঠোঁট চেপে দূরে শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে।এরপর আসে চতুর্থ গোল। উয়েদার চতুর লুপিং হেডার দাহমেনকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়।সেই মুহূর্তে রেনার্ডকে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া মানুষ বলে মনে হচ্ছিল।
জাপানের আত্মবিশ্বাস, টিউনিসিয়ার বিদায়
জাপানের কোচ মোরিয়াসু ম্যাচ শেষে উচ্ছ্বসিত।“আমাদের খেলোয়াড়রা প্রতিপক্ষ নিয়ে অতিরিক্ত ভাবেনি। আমরা যা করতে চেয়েছিলাম, সেটাই পুরোপুরি করতে পেরেছি,” বলেন তিনি।পরিসংখ্যানও জাপানের আধিপত্যের সাক্ষী। বলের দখলে তারা এগিয়ে ছিল ৫৭ শতাংশ বনাম ৪৩ শতাংশ। টিউনিসিয়া পুরো ম্যাচে লক্ষ্যে একটি শটও রাখতে পারেনি।দুই ম্যাচে দুটি বড় হার। প্রথমে সুইডেনের কাছে ৫-১, এবার জাপানের কাছে ৪-০। ফলে গ্রুপপর্ব থেকেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিত হয়ে গেল টিউনিসিয়ার।অন্যদিকে জাপান শুধু তিন পয়েন্টই পেল না, বিশ্বকাপের ১,০০০তম ম্যাচকে নিজেদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় সন্ধ্যায় পরিণত করল। আয়াসে উয়েদার নেতৃত্বে তারা দেখিয়ে দিল, আধুনিক বিশ্বফুটবলে এশিয়ার শক্তিকে আর অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।