দুই দশক কেটে গিয়েছে। তবু কভি আলবিদা না কেহনা নিয়ে বিতর্কের আঁচ পুরোপুরি নেভেনি। ২০০৬ সালে মুক্তির সময় যে ছবিকে অনেকে ‘পরকীয়ার সাফাই’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন, ২০ বছর পর সেই অভিযোগের জবাব দিলেন পরিচালক করণ জোহর। তাঁর দাবি স্পষ্ট—ছবিটি কখনও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে সমর্থন করেনি। বরং ভালবাসা, বিবাহ, অসুখী সম্পর্ক এবং ভুল সিদ্ধান্তের জটিলতাই ছিল গল্পের কেন্দ্রে।
ছবির ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইনস্টাগ্রামে একাধিক পোস্টে পুরনো দিনের স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছেন করণ। আর সেই স্মৃতির মধ্যেই উঠে এসেছে এমন এক ঘটনা, যা কভি আলবিদা না কেহনা-কে ঘিরে তৎকালীন দর্শক প্রতিক্রিয়ার একটা ছবি যেন চোখের সামনে এনে দেয়।
ছবির একটি প্রিভিউ দেখতে প্রেক্ষাগৃহে গিয়েছিলেন করণ। তাঁর ঠিক সামনে বসেছিলেন এক মধ্যবয়সি দম্পতি। পোশাক-আশাক ও আচরণ দেখে করণের মনে হয়েছিল, তাঁরা বেশ রক্ষণশীল। কিন্তু ছবি যত এগোচ্ছিল, তাঁদের বিরক্তিও তত বাড়ছিল। এমনকি সেই বিরক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল হাতে থাকা পপকর্নেও!
এর পর আসে সেই বিতর্কিত দৃশ্য। শাহরুখ খানের দেব এবং রানি মুখোপাধ্যায়ের মায়ার মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। সমস্যা হল—দু’জনেই তখন বিবাহিত। দেবের স্ত্রী রিয়া, মায়ার স্বামী ঋষি। ফলে দৃশ্যটি যে নিছক স্বপ্ন নয়, তা বুঝতে পেরেই করণের সামনে বসা ওই দর্শক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
করণের স্মৃতিতে, ওই ব্যক্তি প্রথমে সম্ভবত ভেবেছিলেন ঘটনাটি স্বপ্নদৃশ্য। কিন্তু সত্যিটা বুঝতে পেরে স্ত্রীর দিকে রাগের দৃষ্টিতে তাকান এবং প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত করেন। শেষ পর্যন্ত দু’জনেই উঠে চলে যান। আর তাঁদের বেরিয়ে যেতে দেখে পরিচালকের মন ভেঙে যায়।
এই ছোট্ট ঘটনাটিই যেন কভি আলবিদা না কেহনা-কে ঘিরে সেই সময়ের বড় বিতর্কের প্রতিচ্ছবি।
কারণ, করণ জোহরের আগের ছবিগুলিতে পরিবার, প্রেম আর বিবাহ ছিল প্রায় স্বপ্নের মতো। কুছ কুছ হোতা হ্যায় কিংবা কভি খুশি কভি গম-এর পর একই পরিচালক যখন বিবাহের বাইরে তৈরি হওয়া সম্পর্ককে গল্পের কেন্দ্রে আনলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই দর্শকের একাংশ চমকে উঠেছিল।
কিন্তু কভি আলবিদা না কেহনা আসলে কোনও ‘হ্যাপি লাভ স্টোরি’ ছিল না। বরং ছবিটি অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল—বিবাহিত হলেই কি দু’জন মানুষ একে অপরকে ভালবাসবেন? কোনও সম্পর্ক যখন ভিতর থেকে ভেঙে যায়, তখন শুধুমাত্র সামাজিক স্বীকৃতির জন্য সেটিকে টেনে নিয়ে যাওয়া কি সত্যিই সমাধান?
দেব ও মায়া দু’জনেই নিজেদের দাম্পত্যে অসুখী। সেই অসন্তোষ থেকেই তাঁরা পরস্পরের কাছে আসেন। কিন্তু তাঁদের সম্পর্ককে ছবিতে কোনও আদর্শ প্রেমের মডেল হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তাঁদের সিদ্ধান্তের অভিঘাত পড়ে চারটি মানুষের জীবনেই। ভাঙে সম্পর্ক, নষ্ট হয় বিশ্বাস, আর প্রত্যেক চরিত্রকেই শেষ পর্যন্ত নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।
সেখানেই করণের বক্তব্যের মূল জায়গা। তাঁর মতে, ছবিটি পরকীয়াকে মহিমান্বিত করেনি; বরং এমন একটি বাস্তবতাকে পর্দায় এনেছিল, যেটি সমাজে রয়েছে, কিন্তু মূলধারার হিন্দি সিনেমা তখনও খুব একটা স্বীকার করতে চাইত না।
তারকাখচিত ছবিটির চরিত্রগুলিও সেই জটিলতাকে আরও গভীর করেছিল। শাহরুখ খান, রানি মুখোপাধ্যায়, অভিষেক বচ্চন ও প্রীতি জিন্টার পাশাপাশি অমিতাভ বচ্চন এবং কিরণ খেরের উপস্থিতি ছবিকে দিয়েছিল বড় পরিসর। শুধু দেব-মায়ার সম্পর্ক নয়, রিয়া ও ঋষির মানসিক আঘাতও গল্পে যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল। ফলে ছবিটি নিছক ‘পরকীয়ার গল্প’ হয়ে থাকেনি; বরং বিশ্বাস, অসন্তোষ, আকাঙ্ক্ষা এবং বিচ্ছেদের গল্প হয়ে উঠেছিল।
মুক্তির সময় ছবিটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেলেও বাণিজ্যিক সাফল্য পেয়েছিল, বিশেষ করে ভারতের বাইরের বাজারে। আর সময়ের সঙ্গে ছবিটিকে দেখার চোখও বদলেছে। নতুন প্রজন্মের অনেক দর্শকের কাছে এখন এটি বিবাহ ও সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করা সাহসী ছবি। অবশ্য সমালোচনাও রয়েছে—বিশেষ করে দেবের চরিত্র, তাঁর সিদ্ধান্ত এবং সম্পর্কের জটিলতা কী ভাবে ছবিতে সামলানো হয়েছিল, তা নিয়ে।
২০ বছর পর করণের স্মৃতিচারণ তাই শুধুই পুরনো ছবির নস্টালজিয়া নয়। বরং এটি দেখিয়ে দেয়, একটি ছবির অর্থ মুক্তির দিনেই চিরতরে স্থির হয়ে যায় না। সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, দর্শকের চোখও বদলায়। আর সেই সঙ্গে বদলে যায় ছবির পাঠও।
কভি আলবিদা না কেহনা আজও সেই পুরনো প্রশ্নটাই সামনে আনে—অসুখী বিবাহ থেকে বেরিয়ে আসা আর বিবাহিত অবস্থায় অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কি এক জিনিস?
করণের ২০ বছর পরের বক্তব্য অন্তত একটি জায়গায় পরিষ্কার—ছবিটি পরকীয়ার পক্ষে সওয়াল করেনি, বরং সেই সম্পর্কের জটিলতা, ভুল এবং তার মূল্যটাই দেখাতে চেয়েছিল।