Table of Contents
অয়ন মুখোপাধ্যায়: আজ ২২ জুন। বাজারে আর পাঁচটা সস্তা উৎসবের মতোই বিপ্লবী গণেশ ঘোষের জন্মদিন। আজকের দিনে এই নামটা বাঙালি মধ্যবিত্তের ড্রইংরুমে ছুড়ে দিলে যেমন একটা অদ্ভুত নীরবতা তৈরি করবে তেমনি আমাদের লজ্জাও লাগবে। কারণ, আজকের এই মেরুদণ্ডহীন, সেলফি-সর্বস্ব জমানায় গণেশ ঘোষের মতো চরিত্ররা আসলে এক-একটা জীবন্ত অপরাধবোধ।
১৯০০ সালের আজকের দিনে বাংলাদেশে জন্মেছিলেন ভদ্রলোক। পরে কলকাতায় পড়তে আসা। আজকের দিনে হলে উনি হয়তো কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির এসি কেবিনে বসে উইকএ্যান্ডে ল্যাপটপ খুলে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিপ্লবের সিরিজ দেখতেন। কিন্তু তখন যুগটা অন্য ছিল। ওঁর রক্তে একটা মারাত্মক ক্রনিক রোগ ছিল, যার নাম—দেশপ্রেম। তাই ক্লাস ফেলে উনি সোজা গিয়ে ঢুকলেন ‘যুগান্তর’ দলে।
কলকাতা থেকে সোজা চলে গেলেন চট্টগ্রাম। সেখানে ওঁর দেখা হলো ধুতি পরা এক রোগা মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে। সূর্য সেন, আমাদের সেই চেনা মাস্টারদা। গণেশ ঘোষ কিন্তু শুধু আবেগে ভেসে বন্দুক চালানো ছেলে ছিলেন না। উনি ছিলেন অসম্ভব মগজঅলা মানুষ। টেকনিক্যাল পড়াশোনা জানা লোক। বোমা তৈরি করা থেকে শুরু করে যুদ্ধের নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট বানানো—সবকিছুতেই ওঁর হাত ছিল পাকা। উনি ছিলেন মাস্টারদার আসল ‘থিংক ট্যাংক’।
১৮ এপ্রিল, ১৯৩০: ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সেই লড়াই
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল। গুড ফ্রাইডের রাত। আজকের প্রজন্ম হলে ওই রাতে হয়তো কোনো নামী পাব-এ গিয়ে সস্তার লিকুইড গিলত। কিন্তু গণেশ ঘোষেরা সেদিন রাতে অন্য একটা থ্রিলারের জন্ম দিয়েছিলেন। নাম—চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।উনি একদল কমবয়সী ছেলেকে নিয় অস্ত্রাগার দখল করলেন। ব্রিটিশদের টেলিফোন আর টেলিগ্রাফের লাইন কেটে দিলেন। রেললাইন উপড়ে ফেলে চট্টগ্রামকে পুরো ভারত থেকে কেটে আলাদা করে দিলেন। ভাবুন একবার, মাত্র কয়েকটা রিভলভার আর দেদার সাহস নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গালে সপাটে একটা চড় মারলেন।সেদিন রাতে চট্টগ্রামে স্বাধীন ভারতের পতাকা উড়েছিল। সেদিন গনেশ ঘোষরা শুধু অস্ত্র লুট করেননি। ওনারা প্রমাণ করে
ছিলেন, কালা আদমিরা ও চাইলে সাহেবদের প্যান্ট ভিজিয়ে দিতে পারে। ওনারা ব্রিটিশদের সেই অহংকার টাকে মাঝখান থেকে ভেঙে দু-টুকরো করে দিয়েছিলেন।
চন্দননগরের এনকাউন্টার এবং ১৪ বছরের ‘প্যাকেজ’
বিপ্লব তো আর ফেসবুকে লাইক পাওয়ার খেলা নয়। জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের পর গণেশ ঘোষ হুগলির চন্দননগরে এসে লুকিয়ে ছিলেন। ফরাসি এলাকা, তাই ভেবেছিলেন সেফ। কিন্তুবাঙালি দের মধ্যে ঘরের শত্রু বিভী ষণের অভাব তখনও ছিল না, এখনও নেই। খবর চলে গেল পুলিশকর্তা চার্লস টেগার্টের কাছে।পুলিশ গিয়ে চন্দনন গরের সেই আস্তানা ঘিরে ফেলল। চলল দেদার গুলি। শহীদ হলেন জীবন ঘোষাল। আর গ্রেফতার হলেন গণেশ ঘোষ।এর পরের পুরস্কার?আন্দামানের সেলুলার জেলে দীর্ঘ ১৪ বছরের এক দুর্দান্ত ‘প্যাকেজ’। যে আন্দামানে এখন বাঙালিরা সস্তায় হানিমুন করতে যায় বা সেলফি তোলে, সেখানে গণেশ ঘোষ ১৪টা বছর ঘানি টেনেছেন, চাবুকের বাড়ি খেয়েছেন। কিন্তু ব্রিটিশদের চাবুক ওঁর কোমরটাকে এক ইঞ্চিও বাঁকাতে পারেনি। ১৯৪৬ সালে যখন জেল থেকে বেরোলেন, ওঁর যৌবনের সোনালী দিনগুলো জেলের দেওয়াল খেয়ে সাবাড় করে দিয়েছে। কিন্তু ওঁর ভেতরের আগুনটাকে নেভাতে পারেনি।
বন্দুক ফেলে ব্যালট: ক্ষমতার বাজারে এক অদ্ভুত বোকা
জেল থেকে বেরিয়ে গণেশ ঘোষ কিন্তু কোনো রিটায়ার্ড লাইফের ব্লু-প্রিন্ট বানাননি। উনি যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে। ১৯৬৭ আর ১৯৬৯ সালে বালিগঞ্জ থেকে বিধায়ক হলেন।আজকের জমানার কোনো এমএলএ-র পাশে গণেশ ঘোষকে দাঁড় করালে আজকের বিধায়কেরা হয়তো লজ্জায় আত্মহত্যা করবেন। একজন মানুষ, যিনি একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন, উনি কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাধারণ মানুষের চাল আর কাপড়ের অধিকারের জন্য চিল চিৎকার করছেন! ক্ষমতার এত কাছে থেকেও নিজের জন্য একটা ফ্ল্যাট বা ব্যাংক ব্যালেন্স বানাতে পারলেন না। আজকের সায়েন্সে একেই বলে—চরম বোকামি। উনি ক্ষমতার জন্য পলিটিক্স করেননি, বরং মানুষের জন্য নিজেকে শেষ করে ছিলেন।
আমাদের এই দেউলিয়া জমানার ওপর কিছু কথা
এবার আসল ভণ্ডামিটার চামড়া ছাড়ানো যাক। ধরুন আজ আমরা গণেশ ঘোষের জন্মদিন পালন করছি। কিন্তু কীভাবে করছি? হয়তো ফেসবুকে একটা লম্বা পোস্ট লিখে, কিংবা হোয়াটসগ্রুপে একটা কোটেশন ফরোয়ার্ড করে। ব্যস, আমাদের বিপ্লব ওখানেই খতম।আমরা এখন ভীষণ ‘সেফ’ এবং ভীষণ ‘স্মার্ট’ জেনারেশন। আমাদের বিপ্লব এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের সোফায় বসে কীবোর্ড ঠোকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আজকের রাজনীতিতে ‘আদর্শ’ শব্দটা একটা মিউজিয়ামের কঙ্কাল। দলবদল, কোটি কোটি টাকার স্ক্যাম আর ক্ষমতার নগ্ন নাচ দেখতে দেখতে আমাদের চোখের চামড়া পুরু হয়ে গেছে।
আজকের যুবসমাজ ইতিহাস পড়ে না। তারা চেনে কোন পলিটিশিয়ান কত কোটি টাকা রিলস বানিয়ে কামালো, আর কোন সেলিব্রিটি কার বিছানায় গেল। ইতিহাসকে আমরা ছিবড়ে বানিয়ে ফেলেছি। আর সেই সুযোগে একদল লোক ইতিহাসের পাতা ছিঁড়ে নিজেদের মতো করে রামায়ণ-মহাভারত লিখছে। আমরা আমাদের মেরুদণ্ডটা বন্ধক দিয়ে দিয়েছি সস্তার ইএমআই আর কর্পোরেট সুবিধার কাছে। আমাদের এখন একটাই নীতি—‘যেখানেই দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ খাবে কী নাই’।
শেষ কথা: একটি জ্বলন্ত প্রশ্ন
১৯৯৪ সালের অক্টোবরে গণেশ ঘোষ কলকাতায় মারা যান। কোনো জাঁকজমক ছিল না, মিডিয়ার ক্যামেরা ছিল না। উনি প্রচারের আলো চানওনি কোনোদিন।আজ ওঁর জন্মদিনে ওঁর ছবিতে একটা সস্তা মালা ঝুলিয়ে দিলে ওঁর আত্মা হয়তো ওপর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে থুতু ফেলতে পারবে না। কিন্তু মনে রাখবেন আসল স্মরণ তখনই হবে, যখন আমরা আমাদের চারপাশের এই চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তত একটা লাইন সত্যি কথা বলার সাহস দেখাব।
ইতিহাসের পাতা থেকে গণেশ ঘোষ আজ আমাদের দিকে তাকিয়ে ওঁর সেই চেনা তেরছা হাসিতে প্রশ্ন করতেই পারেন—“আমরা তো আমাদের জীবনটা দিয়ে গেলাম, তোমরা নিজেদের মেরুদণ্ডটা কত টাকায় বিক্রি করলে?”
উত্তরটা আমাদের কাছে নেই। কারণ আমরা এখন লাইক আর কমেন্টের সংখ্যা গুনতে ব্যস্ত। বিপ্লবী গণেশ ঘোষ, আপনার জন্মদিনে এই দেউলিয়া, মেরুদণ্ডহীন প্রজন্মের তরফ থেকে কোনো ভেকধারী শ্রদ্ধা নয়, শুধু একটাই কথা—আপনি সত্যিই এক আশ্চর্য অ্যানাক্রোনিজম ছিলেন!