Table of Contents
হাইলাইটস:
- দিল্লি যাওয়া নিয়ে নতুন করে বিতর্কে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চার্টার্ড বিমান ব্যবহার।
- কুণাল ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন, দলের এই বিপর্যয়ের সময়ে বিলাসী রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতটা গ্রহণযোগ্য।
- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, “জনতার নেতা না কর্পোরেট সিইও?”
- চার্টার্ড জেট ও হেলিকপ্টার ব্যবহারে বছরে কয়েক কোটি টাকা খরচ হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
- তৃণমূলের ভেতরেই এখন প্রশ্ন, এই ব্যয়ের উৎস কী এবং রাজনৈতিক লাভ কতটা।
- বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিষেকের ভ্রমণশৈলীকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
বাংলাস্ফিয়ার: একটা সময় ছিল যখন বাংলার নেতারা ট্রেনে চেপে দিল্লি যেতেন। পরে বিমানের যুগ এল। তারপর বিজনেস ক্লাস। আর এখন রাজনীতির নতুন অভিধানে এসেছে চার্টার্ড জেট ও ব্যক্তিগত হেলিকপ্টার।
তৃণমূল কংগ্রেসে এই সংস্কৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক নিঃসন্দেহে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি কোথাও গেলে সাধারণ যাত্রীবাহী বিমানের চেয়ে চার্টার্ড বিমানই যেন বেশি স্বাভাবিক। জেলার সভা হলে হেলিকপ্টার। দিল্লিতে জরুরি বৈঠক হলে চার্টার্ড জেট। নির্বাচনী প্রচার হলে তো কথাই নেই।
কিন্তু এতদিন যা প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, হঠাৎ সেটাই বিতর্কের কেন্দ্রে। কারণ পরিস্থিতি বদলেছে। ক্ষমতা হারানো দলের নেতার বিলাসিতা সাধারণত ক্ষমতাসীন দলের নেতার বিলাসিতার চেয়ে অনেক বেশি চোখে লাগে।
দিল্লি সফর ও নতুন বিতর্ক
গতকাল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি গিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলে সেটা খুব বড় খবর হওয়ার কথা ছিল না। তিনি অতীতেও বহুবার এভাবেই গিয়েছেন।
কিন্তু এবার কুণাল ঘোষ প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। প্রশ্নটা শুধু যাতায়াতের নয়। প্রশ্নটা প্রতীকের।
দলের কর্মীরা যখন পরাজয়ের ধাক্কা সামলাচ্ছেন, একের পর এক সাংসদ ও বিধায়ক যখন বিদ্রোহের পথে, তখন নেতৃত্বের জীবনযাত্রা কেমন হওয়া উচিত?
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কটাক্ষ আরও তীব্র। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, যে নেতা নিজেকে সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি বলেন, তাঁর চলাফেরা কি বহুজাতিক সংস্থার কর্তার মতো হওয়া উচিত?
অর্থাৎ সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু বিমান নয়, বার্তা।
খরচটা আসলে কত?
এখানে একটু হিসাব করা যাক।
ভারতে মাঝারি আকারের একটি চার্টার্ড জেট ভাড়া করতে ঘণ্টাপ্রতি প্রায় ২.৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
কলকাতা থেকে দিল্লি যাওয়া-আসা, বিমানবন্দরের চার্জ, ক্রু খরচ, পার্কিং ও অন্যান্য ব্যয় ধরলে একবারের সফরের মোট খরচ ১৫ থেকে ৩০ লক্ষ টাকার মধ্যে হওয়া বিচিত্র নয়। হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রেও ঘণ্টাপ্রতি ১.৫ থেকে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
একটি নির্বাচনী মরসুমে যদি কয়েক ডজন হেলিকপ্টার সফর এবং একাধিক চার্টার্ড জেট যাত্রা ধরা হয়, তাহলে মোট ব্যয় সহজেই কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে।
অবশ্য তৃণমূল কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভ্রমণ ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করেনি। ফলে রাজনৈতিক মহলে সংখ্যাগুলি নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে।
কেন চার্টার্ড বিমান?
অভিষেকের অনুগামীরা অবশ্য এই সমালোচনাকে সম্পূর্ণ অন্যভাবে দেখেন।
তাঁদের যুক্তি, একজন শীর্ষ নেতার সময়ের মূল্য আছে। সকালে কলকাতা, দুপুরে দিল্লি, বিকেলে আবার অন্য রাজ্যে বৈঠক—এই সূচি সাধারণ বিমান পরিষেবার উপর নির্ভর করে করা কঠিন।
তার উপর নিরাপত্তার বিষয়ও রয়েছে। যদি একজন নেতা দিনে চারটি সভা করেন, তাহলে চার্টার্ড বিমান অনেক সময় বাস্তবিক প্রয়োজন হয়ে ওঠে।
এই যুক্তি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সমস্যা হচ্ছে, রাজনীতিতে বাস্তবতা আর প্রতীকের মধ্যে সবসময় মিল থাকে না।
মমতার রাজনীতি বনাম অভিষেকের রাজনীতি
তৃণমূলের পুরনো নেতাদের অনেকেই ব্যক্তিগত আলোচনায় একটা তুলনা টানেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক ব্র্যান্ড তৈরি করেছিলেন সরল জীবনযাত্রার উপর। সাদা শাড়ি, হাওয়াই চটি, ইকনমি ক্লাসে যাত্রা—এসব ছিল তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ।
বাস্তবে নিরাপত্তা ও সরকারি সুবিধা থাকলেও জনমানসে তাঁর ভাবমূর্তি ছিল একজন সংযমী নেত্রীর।
অভিষেকের ক্ষেত্রে ছবিটা আলাদা। তিনি নতুন প্রজন্মের নেতা। তাঁর রাজনীতি অনেক বেশি কর্পোরেট ধাঁচের, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সংগঠিত। কিন্তু সেই আধুনিকতার সঙ্গেই জুড়ে গেছে চার্টার্ড জেটের ছবিও।
এবং রাজনীতিতে ছবি অনেক সময় বক্তব্যের চেয়েও শক্তিশালী।
বিরোধীদের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র
বিজেপি বহুদিন ধরেই এই বিষয়টি নিয়ে তৃণমূলকে আক্রমণ করে এসেছে।
তাদের বক্তব্য, যে দল নিজেকে গরিব মানুষের প্রতিনিধি বলে দাবি করে, তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার জীবনযাত্রা সেই দাবির সঙ্গে খাপ খায় না।
এখন মজার বিষয় হল, সেই প্রশ্ন শুধু বিরোধীদের কাছ থেকে নয়, দলের ভেতর থেকেও উঠছে। কুণাল ঘোষ বা ঋতব্রতের মন্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব সেখানেই। কারণ শত্রুর সমালোচনা প্রত্যাশিত। বন্ধুর প্রশ্নই বেশি অস্বস্তিকর।
অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
আরও একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে।
এই বিপুল ব্যয় বহন করে কে?
দল?
সমর্থক ব্যবসায়ীরা?
নাকি অন্য কোনও উৎস?
ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে চার্টার্ড বিমান নতুন নয়। প্রায় সব বড় দলই ব্যবহার করে। কিন্তু যখন কোনও দলের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন বিমান ভ্রমণের বিলও রাজনৈতিক ইস্যা হয়ে যায়। কারণ সাধারণ মানুষের কাছে চার্টার্ড জেট শুধু পরিবহণ নয়, ক্ষমতার প্রতীক।
সময়টা খারাপ
রাজনীতিতে একই কাজ একসময় প্রশংসা পায়, অন্যসময় সমালোচনা।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেটাই ঘটছে। ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় চার্টার্ড জেট ছিল দক্ষতার প্রতীক। আজ বিরোধী আসনে বসে সেটাই অনেকের কাছে বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।
দলের সাংসদরা বিদ্রোহ করছেন, বিধায়কদের একাংশ আলাদা শিবিরে, সংগঠন সংকটে—এই প্রেক্ষাপটে আকাশে উড়ে যাওয়া নেতার ছবি মাটির কর্মীদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটাই এখন প্রশ্ন।
শেষ কথা
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চার্টার্ড জেটে দিল্লি গিয়েছেন—ঘটনাটা নতুন নয়। নতুন হল রাজনৈতিক আবহাওয়া।
যে ব্যয় নিয়ে এতদিন কেউ উচ্চস্বরে প্রশ্ন করেনি, আজ সেটাই আলোচনার বিষয়।
সম্ভবত বিমান বদলায়নি, বদলেছে রানওয়ে। আর রাজনীতিতে রানওয়ে বদলে গেলে একই উড়ান কখনও সাফল্যের প্রতীক হয়, কখনও অহংকারের।
অভিষেকের সাম্প্রতিক দিল্লি সফরকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মূল প্রশ্ন তাই বিমান নয়, বার্তা।
জনতার নেতা কি জনতার মতোই দেখাবেন, নাকি তিনি আকাশে উড়বেন আর কর্মীরা মাটিতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাবেন?বাংলার রাজনীতিতে আপাতত সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি উচ্চতায় উড়ছে।