Table of Contents
হাইলাইটস:
- ১১০ দিনের যুদ্ধ থামাতে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (MOU) সই করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মাসুদ পেজেশকিয়ান।
- যুদ্ধবিরতি শুধু ইরান-আমেরিকার মধ্যে নয়, লেবানন ফ্রন্টেও কার্যকর হবে।
- ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা (ডাউন-ব্লেন্ড) করতে রাজি হয়েছে।
- চূড়ান্ত পরমাণু চুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
- তেল রপ্তানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তাৎক্ষণিক ছাড় পাবে তেহরান।
- ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি।
- ইরানের আটকে থাকা সম্পদ শর্ত পূরণ করলেই মুক্ত হবে।
- চূড়ান্ত চুক্তির জন্য দুই পক্ষের হাতে ৬০ দিন সময়।
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১১০ দিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (মেমোরান্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা MOU) প্রকাশ্যে এসেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি এই নথিতে যুদ্ধবিরতি থেকে শুরু করে পরমাণু কর্মসূচি, তেল রপ্তানি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
চূড়ান্ত চুক্তি এখনও হয়নি। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে বিস্তারিত আলোচনা করে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছতে হবে। তবু এই নথি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলে মনে করা হচ্ছে।
১. সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি, লেবাননও অন্তর্ভুক্ত
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি।
নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের মিত্ররা চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে সব যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই বন্ধ করবে। এর মধ্যে লেবাননও রয়েছে।
এই ধারা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর অর্থ ইরানকে কার্যত হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তবে ইজরায়েল এই আলোচনার পক্ষ ছিল না। ফলে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে কোনও হামলা হলে ইজরায়েল পাল্টা আঘাত হানার অধিকার সংরক্ষণ করছে।
২. সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পাতলা করতে রাজি ইরান
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমপক্ষে পাতলা করতে রাজি হয়েছে।
বর্তমানে ইরানের কাছে প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) তত্ত্বাবধানে ইরানের মাটিতেই তা ডাউন-ব্লেন্ড করা হবে।
তবে এটি পুরোপুরি মার্কিন সাফল্য নয়। কারণ যুদ্ধ শুরুর আগেই ফেব্রুয়ারিতে ইরান একই প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন বিরোধ ছিল ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠানো হবে কি না, তা নিয়ে।
চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের প্রশ্নে আগামী ৬০ দিনে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
৩. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নির্ভর করবে পরমাণু চুক্তির উপর
একটি বড় ভুল ধারণা হচ্ছে, চুক্তি সই হলেই ইরানের ওপর সব নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। বাস্তবে তা নয়।
নথি অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে এবং তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে তেহরান পরমাণু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি কতটা পালন করছে তার উপর।
অর্থাৎ, পারমাণবিক প্রশ্নে অগ্রগতি না হলে অর্থনৈতিক সুবিধাও মিলবে না।
৪. তেল রপ্তানিতে তাৎক্ষণিক ছাড়
তবে একটি বড় ব্যতিক্রম রয়েছে।
চুক্তি সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং পরিষেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এ জন্য বিশেষ ছাড়পত্র দেবে।
ওয়াশিংটনের যুক্তি, ইরানের তেল এমনিতেই চীনে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখে শুধু বেজিংকে কম দামে তেল কেনার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছিল।
সমালোচকদের অভিযোগ, এতে পরমাণু আলোচনার আগেই ইরান বিপুল অর্থ আয় করার সুযোগ পাবে এবং যুক্তরাষ্ট্র একটি গুরুত্বপূর্ণ চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হারাবে।
৫. ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালী স্বাভাবিক করতে হবে
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী।
চুক্তি অনুযায়ী, ইরানকে ৩০ দিনের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করতে হবে। প্রথম ৬০ দিন সব বাণিজ্যিক জাহাজকে বিনা টোলে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে।
তবে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পরে জানিয়েছেন, ৬০ দিনের পর প্রণালী ব্যবহারকারী জাহাজগুলির কাছ থেকে ফি আদায় করা হবে।
তাঁর ভাষায়, “হরমুজ আর যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরবে না। প্রণালীর উপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে এবং আমরা পরিষেবার জন্য মূল্য নেব।”
৬. জব্দ- সম্পদ তাৎক্ষণিকভাবে মুক্ত হচ্ছে না
ইরানের বহু বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত সম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে।
তেহরান চাইছিল চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই এই অর্থ ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অর্থ ছাড় হবে শুধুমাত্র তখনই, যখন ইরান চুক্তির শর্ত বাস্তবে কার্যকর করবে।
অর্থাৎ, প্রতিশ্রুতির বদলে বাস্তব পদক্ষেপই হবে অর্থ পাওয়ার পূর্বশর্ত।
৭. চূড়ান্ত চুক্তির জন্য ৬০ দিনের সময়
এই সমঝোতা কেবল একটি প্রাথমিক কাঠামো।
দুই দেশকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছতে হবে। প্রয়োজনে উভয়ের সম্মতিতে সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে। চূড়ান্ত চুক্তি কার্যকর করতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবও প্রয়োজন হবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই সমঝোতা অত্যন্ত ভঙ্গুর। যে কোনও পক্ষ যে কোনও সময় আলোচনা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র আবারও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিতে পারে।
উপসংহার
এই সমঝোতা একদিকে যুদ্ধ থামানোর পথ খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, হরমুজ প্রণালীতে নতুন শুল্ক ব্যবস্থা, হিজবুল্লাহর ভূমিকা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের গতি—সবই আগামী ৬০ দিনের আলোচনার উপর নির্ভর করছে।
তবু আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন নিভতে শুরু করেছে, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা তৈরি হয়েছে এবং ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক নতুন এক পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়েছে।