Home খবর ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ঘিরে উচ্ছ্বাস, ইউক্রেনে ফের মনোযোগ: জি-৭ সম্মেলনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

ট্রাম্পের ‘ইরান চুক্তি’ ঘিরে উচ্ছ্বাস, ইউক্রেনে ফের মনোযোগ: জি-৭ সম্মেলনে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

Authored By Diptyajit Roy Chowdhury
6 views 5 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

• ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তিকে “অসাধারণ সাফল্য” বলে প্রচার করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

• চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ এখনও প্রকাশিত হয়নি; মূল কাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।

• হরমুজ প্রণালী খুলে গেলে তেলবাজার স্থিতিশীল হবে বলে দাবি ট্রাম্পের।

• ইউরোপীয় দেশগুলি ট্রাম্পের ইরান-সফলতাকে সমর্থন করে ইউক্রেন ইস্যুতে মার্কিন প্রতিশ্রুতি আদায়ের চেষ্টা করছে।

• জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের পর ইউক্রেন সম্পর্কে ট্রাম্পের মনোভাব কিছুটা নরম হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।

• রাশিয়ার বিরুদ্ধে তেল-নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ফ্রান্সের আল্পস পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এভিয়ান-লে-ব্যাঁ শহরে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনের প্রায় প্রতিটি বৈঠকেই একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত ‘চুক্তি’। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যেন কাউকেই ভুলতে দিতে চাননি যে তিনি একটি “ঐতিহাসিক সাফল্য” অর্জন করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমরা যে চুক্তি চেয়েছিলাম, তা পেয়ে গেছি।”

কিন্তু বাস্তবতা হল, এই চুক্তির প্রকৃত বিষয়বস্তু এখনও রহস্যে মোড়া। ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগী ছাড়া আর কেউ পুরো নথি দেখেননি। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য ফাঁস হয়েছে, তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে তেহরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।

তবে এটিকে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বলা যাচ্ছে না। এটি মূলত একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট’ বা কাঠামোগত সমঝোতা। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর ৬০ দিনের আলোচনাপর্ব শুরু হওয়ার কথা, যেখানে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—নিয়ে আলোচনা হবে। অনেকেরই মনে আছে, ২০১৫ সালের ভিয়েনা পারমাণবিক চুক্তি সম্পন্ন করতে বছরের পর বছর লেগেছিল।

‘ইরান ব্যবসায় ফিরতে চায়’

ট্রাম্প অবশ্য আশাবাদী। তাঁর ভাষায়, “এটি খুব দ্রুত এগোবে। ইরান চুক্তি করতে চায়, কারণ তারা আবার ব্যবসা শুরু করতে চায়।”

তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটাই—ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না। তারা স্পষ্টভাবে বলেছে, তারা অস্ত্র তৈরি করবে না, কিনবেও না।”

এই বক্তব্যে ট্রাম্প একদিকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আপসের যৌক্তিকতাও তুলে ধরেছেন।

হরমুজ খুলবে, তেল বইবে

ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দাবি হলো, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে বন্ধ থাকা হরমুজ প্রণালী আবার খুলে যাবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর এই প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেলের দাম বেড়েছিল এবং বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল।

ট্রাম্পের মতে, চুক্তি কার্যকর হলে তেল অবাধে প্রবাহিত হবে, জ্বালানির দাম কমবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন স্থিতিশীলতার যুগ শুরু হবে।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরান যে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছিল, সেই উত্তেজনাও প্রশমিত হবে বলে তাঁর বিশ্বাস।
তিনি আরও দাবি করেন, শিগগিরই আরও কয়েকটি আরব দেশ তথাকথিত ‘আব্রাহাম চুক্তি’-তে যোগ দেবে এবং ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

“সবাই আসবে,” আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলেন ট্রাম্প।

লেবানন নিয়ে বিতর্কিত প্রস্তাব

তবে ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে।

ট্রাম্পের বক্তব্য, “তিনি স্কাউটবয় নন, কিন্তু হিজবুল্লাহকে তিনি মোটেই পছন্দ করেন না।” এই মন্তব্যে অনেক কূটনীতিক বিস্মিত হয়েছেন। জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক ইউরোপীয় কূটনীতিক মন্তব্য করেন, “দক্ষিণ বা উত্তর লেবাননের খ্রিস্টান, সুন্নি, শিয়া কিংবা মারোনাইট—কেউই সহজে মেনে নেবে না যে সিরিয়া আবার লেবাননের বিষয়ে সামরিক ভূমিকা নেবে।”

অন্যদিকে সিরিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আহমেদ জিদান দ্রুত এই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের যুগ শেষ হয়েছে। আসাদ আমলের নীতিতে ফেরার প্রশ্নই নেই।”

ইউরোপের কৌশল: ইরানের বদলে ইউক্রেন

জি-৭ নেতারা জানেন, ইরান চুক্তি এখনও কেবল একটি সূচনা। সামনে বহু কঠিন আলোচনা বাকি। তবু কেউ ট্রাম্পের উচ্ছ্বাসে পানি ঢালতে চাননি।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট Emmanuel Macron প্রকাশ্যে বলেছেন, “এই চুক্তি ভালো একটি বিষয়।”

ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে প্রায় ৩০টি দেশের একটি সামুদ্রিক উদ্যোগের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার করা। ফলে চুক্তি সফল হলে ইউরোপেরও লাভ।
কিন্তু এর পেছনে আরও একটি হিসাব রয়েছে।

ইউরোপীয় দেশগুলি আশা করছে, ইরান ইস্যুতে সাফল্যের স্বীকৃতি দিয়ে তারা ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারবে। এক কূটনীতিকের কথায়, “আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হলো, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনের পাশে থাকবে এবং রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়াবে। ইউরোপের কাছে এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।”

জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক

এই লক্ষ্যেই প্রেসিডেন্ট Volodymyr Zelenskyy-কে এভিয়ানে আমন্ত্রণ জানান ম্যাক্রোঁ। তিনি ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে সরাসরি বৈঠকেরও ব্যবস্থা করেন। দু’জনের প্রায় ২০ মিনিটের আলোচনা হয়। পরে রাষ্ট্রনেতাদের নৈশভোজেও তাদের আবার দেখা হওয়ার কথা ছিল।

জেলেনস্কি সাংবাদিকদের জানান, তিনি ট্রাম্পকে রুশ হামলার ভয়াবহতার ছবি দেখিয়েছেন। বিশেষ করে কিয়েভের ঐতিহাসিক ডরমিশন ক্যাথেড্রালে ড্রোন হামলার পর আগুন লাগার দৃশ্য।

কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, এই ছবিগুলি ট্রাম্পকে প্রভাবিত করেছে। তিনি ইউক্রেনকে আর ‘হেরে যাওয়া দেশ’ হিসেবে দেখছেন না, বরং বুঝতে শুরু করেছেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়াও ক্রমশ চাপে পড়ছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন চাপ?

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত এসেছে ট্রাম্পের বক্তব্যে।
তিনি বলেন, “রাশিয়ার একটি চুক্তি করা উচিত।”

মে মাসে রাশিয়ার প্রায় ৩৫ হাজার সেনা নিহত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র জি-৭ নেতাদের যৌথ ঘোষণায় সম্মতি দিয়েছে, যেখানে ইউক্রেনকে আরও উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক এবং দূরপাল্লার সক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এর পাশাপাশি ট্রাম্প জানিয়েছেন, রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করা যেতে পারে। ইরান যুদ্ধের সময় তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই নিষেধাজ্ঞাগুলি শিথিল করা হয়েছিল।
এখন তাঁর যুক্তি, “তেল আবার প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে খুব শিগগিরই আমরা সেই নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনতে পারব।”

সামনে কী?

এভিয়ানের জি-৭ সম্মেলন তাই কেবল ইরানকে ঘিরে নয়, বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের সূচনাও হতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষিত ইরান সমঝোতা এখনও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। এর সফলতা নির্ভর করবে আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ইরান নিয়ে আপাত সাফল্য ট্রাম্পকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ইউরোপ চাইছে তাঁকে আবার ইউক্রেনের দিকে ফিরিয়ে আনতে। যদি সেই প্রচেষ্টা সফল হয়, তাহলে এভিয়ান সম্মেলন ভবিষ্যতে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এমন এক মুহূর্ত হিসেবে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিরতির ছায়া থেকে ইউক্রেন যুদ্ধ আবার আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রে ফিরে এসেছিল।


Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles