হাইলাইটস:

  • ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির কাঠামোগত চুক্তি হলেও আমেরিকার অর্থনীতিতে যুদ্ধের অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
  • পেট্রোলের দাম কমতে শুরু করলেও যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে ফিরতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।
  • হরমুজ প্রণালী খুলতে শুরু করলেও জাহাজ চলাচলের জট ও সরবরাহ সংকট রাতারাতি কাটছে না।
  • সার, খাদ্য ও জ্বালানির দাম আগামী কয়েক মাস উচ্চ অবস্থায় থাকার আশঙ্কা।
  • মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাস্ফিয়ার: ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটছে আমেরিকা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় সাফল্য হিসেবে এই চুক্তিকে তুলে ধরছেন। তাঁর দাবি, এই সমঝোতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনবে না, আমেরিকার অর্থনীতিকেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বড় অংশ এতটা আশাবাদী নন। তাঁদের মতে, যুদ্ধ থামলেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষত এত দ্রুত শুকোবে না।

প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে চলা সংঘাত আমেরিকার অর্থনীতিতে এমন কিছু অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, যার প্রভাব আগামী বছর পর্যন্ত গড়াতে পারে। তেলের বাজারে অস্থিরতা, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও স্বাভাবিক নয়।

যুদ্ধের শুরু থেকেই ট্রাম্প বলেছিলেন, সামরিক অভিযান হবে সংক্ষিপ্ত এবং তার অর্থনৈতিক প্রভাবও হবে সীমিত। তিনি বারবার আশ্বাস দিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ হলেই পেট্রোল ও তেলের দাম “পাথরের মতো নিচে নেমে যাবে”। কিন্তু বাস্তব চিত্র সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দেশজুড়ে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৪ ডলারেরও বেশি ছিল। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে যে শিখরে পৌঁছেছিল, তার তুলনায় কিছুটা কম হলেও এক বছর আগের তুলনায় এখনও প্রায় ১ ডলার বেশি।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করলেও সাধারণ মানুষের পকেটে তার প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে। তেল উত্তোলন, পরিশোধন, পরিবহণ এবং খুচরো বাজারে সরবরাহ—এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে।

বিশেষ উদ্বেগের কারণ হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় শুধু জ্বালানি নয়, নানা শিল্পপণ্য ও কাঁচামালের সরবরাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যদিও এখন প্রণালী ধীরে ধীরে খুলছে, কিন্তু কয়েক মাসের জট একদিনে কাটবে না। বন্দরগুলোতে অপেক্ষমাণ জাহাজ, বিলম্বিত চালান এবং বীমা ব্যয়ের বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এখনও চাপ তৈরি করছে।

এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যদ্রব্যের বাজারে। কারণ কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত সারের বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল। সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ে, আর শেষ পর্যন্ত সেই চাপ এসে পড়ে ভোক্তার থালায়।

অক্সফোর্ড ইকনমিক্সের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, যুদ্ধ শেষ হলেও খাদ্যদ্রব্যের দাম কিছুটা সময়ের ব্যবধানে আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই বাজারে স্বস্তি নেমে আসবে—এমনটা ভাবার কারণ নেই।

এর মধ্যেই আমেরিকার মূল্যস্ফীতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মে মাসে মুদ্রাস্ফীতির হার তিন বছরের মধ্যে দ্রুততম গতিতে বেড়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হল, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

এই পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কারণ আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। যুদ্ধ শুরুর আগে হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনা ছিল করছাড়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শেয়ারবাজারের উত্থানকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রচার চালানো।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক খবরও রয়েছে। গত মাসে আমেরিকায় ১ লক্ষ ৭২ হাজার নতুন চাকরি সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনায় শেয়ারবাজারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কিন্তু ভোটাররা সাধারণত শেয়ারবাজারের সূচক নয়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম দেখে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার মূল্যায়ন করেন।

এই কারণেই পেট্রোল, খাদ্য এবং বিদ্যুতের বিল এখনও ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। বহু সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি পরিচালনায় তাঁর প্রতি জনসমর্থন কমছে। ভোক্তা আস্থার সূচকও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুর্বল হয়েছে।

ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে আক্রমণ শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, যে যুদ্ধ আমেরিকানরা চায়নি, সেই যুদ্ধের বোঝা এখন সাধারণ পরিবারগুলিকে বহন করতে হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি খরচ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার জন্য তারা সরাসরি ট্রাম্পকেই দায়ী করছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প শিবিরের যুক্তি, যুদ্ধ না হলে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও বড় বিপদ ডেকে আনত। তারা দাবি করছে, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ সাময়িক এবং শান্তিচুক্তির ফলে আগামী মাসগুলিতে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হবে।

তবে বাজারের ভাষা আরও সতর্ক। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, পেট্রোলের দাম যুদ্ধ-পূর্ব স্তরে নামতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। একইভাবে মূল্যস্ফীতিকে আবার ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার কাছে ফিরিয়ে আনাও সহজ হবে না।

ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় কূটনৈতিক ও সামরিক ঘটনা হলেও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সেটি কেবল প্রথম ধাপ। যুদ্ধবিরতি মানেই অর্থনৈতিক স্বস্তি নয়। বরং আগামী কয়েক মাসে বোঝা যাবে, এই সংঘাতের আর্থিক ক্ষত কতটা গভীর ছিল।

ট্রাম্পের জন্য চ্যালেঞ্জ তাই এখন যুদ্ধ জেতা নয়, শান্তির অর্থনৈতিক সুফল দ্রুত মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়া। যদি তা না হয়, তাহলে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যও ভোটবাক্সে কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লাভ এনে দিতে নাও পারে।