তৃণমূল ভাঙনের লাভ মিললেও সাংবিধানিক সংশোধনী পাসে আরও সমর্থন দরকার এনডিএর
হাইলাইটস:
- তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের সমর্থনে লোকসভায় এনডিএর শক্তি বেড়েছে।
- সাধারণ বিল পাস করানো এখন অনেক সহজ হবে মোদী সরকারের জন্য।
- কিন্তু সাংবিধানিক সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসে এখনও দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন নেই।
- সীমা পুনর্নির্ধারণ (ডিলিমিটেশন) ও মহিলা সংরক্ষণ কার্যকরের মতো বিলের জন্য বাড়তি সমর্থন জোগাড় করতে হবে বিজেপিকে।
তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙনের ফলে দিল্লির ক্ষমতার অঙ্কে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। বিদ্রোহী সাংসদদের একটি বড় অংশ বিজেপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) প্রতি সমর্থন জানানোয় লোকসভায় শাসক শিবিরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সাধারণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-র সরকার আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বস্তিতে। কিন্তু সংখ্যার এই বাড়তি জোর সত্ত্বেও বিজেপি এখনও এমন অবস্থায় পৌঁছয়নি, যেখানে এককভাবে বা শুধুমাত্র জোটসঙ্গীদের ভরসায় সব গুরুত্বপূর্ণ আইন সহজে পাস করিয়ে নেওয়া সম্ভব। বিশেষ করে সাংবিধানিক সংশোধনের মতো ক্ষেত্রে এখনও তাদের সামনে বড় বাধা রয়ে গেছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদদের সমর্থন পাওয়ার পর লোকসভায় এনডিএর শক্তি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯৩-এ। ৫৪৩ সদস্যের লোকসভায় এটি অবশ্যই একটি আরামদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সাধারণ বিল পাস করার জন্য উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সরল সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। সেই কারণে অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রশাসনিক পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন নীতিগত বিল পাস করাতে এখন সরকারের সমস্যা হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু সমস্যার জায়গা অন্যত্র। ভারতের সংবিধান সংশোধন করতে হলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন এবং একই সঙ্গে লোকসভার মোট সদস্যসংখ্যার অর্ধেকের বেশি সমর্থন। এই কারণেই গত এপ্রিলে ডিলিমিটেশন ও মহিলা সংরক্ষণ বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সাংবিধানিক সংশোধনী বিল লোকসভায় পরাজিত হয়েছিল। বিলটির পক্ষে ২৯৮ ভোট পড়লেও দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের বাধা অতিক্রম করা যায়নি।
এই অভিজ্ঞতা বিজেপি নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর সাংবিধানিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এক জিনিস নয়। বিরোধীরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা এখনও সরকারের পক্ষে কঠিন। বিশেষত ডিলিমিটেশন প্রশ্নে দক্ষিণ ভারতের বহু রাজ্য এবং বিরোধী দলগুলির আপত্তি প্রবল। তাদের অভিযোগ, জনসংখ্যার ভিত্তিতে নতুন আসন বণ্টন হলে দক্ষিণের রাজ্যগুলির রাজনৈতিক প্রভাব কমে যেতে পারে। সেই কারণেই বিষয়টি শুধুমাত্র সংখ্যার নয়, রাজনৈতিক ঐকমত্যেরও।
তৃণমূলের ভাঙন বিজেপির জন্য আরেকটি রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বিরোধী জোটের ঐক্যে ফাটল ধরলে সংসদে সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি অনেক সহজ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদলের পর যে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস শুরু হয়েছে, তার প্রভাব এখন জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে। তৃণমূলের একাংশ যদি স্থায়ীভাবে এনডিএর পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও কিছু আঞ্চলিক দল নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে পারে।
তবে বিজেপির কৌশলবিদরা জানেন, শুধুমাত্র তৃণমূলের ভাঙন যথেষ্ট নয়। ডিলিমিটেশন, মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কার্যকর প্রয়োগ, কিংবা অন্য কোনও বড় সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য তাদের আরও সমর্থন দরকার হবে। সেই সমর্থন আসতে পারে আঞ্চলিক দলগুলির কাছ থেকে, অথবা বিষয়ভিত্তিক সমঝোতার মাধ্যমে। কারণ সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের অঙ্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বলা যায়, তৃণমূলের ভাঙন বিজেপির জন্য বড় রাজনৈতিক সাফল্য হলেও তা এখনও চূড়ান্ত জয় নয়। লোকসভায় সরকার এখন অনেক শক্তিশালী, রাজ্যসভাতেও এনডিএর অবস্থান স্বস্তিদায়ক। কিন্তু ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনতে গেলে বিজেপিকে এখনও সংখ্যার গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। সেই পরীক্ষাই আগামী সংসদ অধিবেশনগুলিতে মোদী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে চলেছে।