হাইলাইটস
- রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ নকশা, উন্নয়ন ও উৎপাদনের পথে এগোতে চায় ভারত।
- বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
- ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার সম্ভাব্য চুক্তিতে ভারতের মাটিতেই তৈরি হতে পারে ৯৪টি বিমান।
- প্রথমবারের মতো ফ্রান্সের বাইরে রাফাল উৎপাদনের সুযোগ পেতে পারে ভারত।
- ভারতীয় অস্ত্র ও প্রযুক্তির সংযোজনের মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা।
ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলল ফ্রান্সের সঙ্গে রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে চলা আলোচনায়। বিদেশ মন্ত্রক (MEA) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, শুধু বিদেশ থেকে যুদ্ধবিমান কেনাই নয়, বরং যৌথভাবে নকশা তৈরি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করাই এখন ভারতের লক্ষ্য। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিদেশ সচিব Vikram Misri সম্প্রতি বলেছেন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্থানীয় উৎপাদনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কেবল অস্ত্র আমদানিকারক দেশ হিসেবে থাকা নয়, বরং উন্নত সামরিক প্রযুক্তির উৎপাদক ও রপ্তানিকারক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা।
বর্তমানে ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে ৩৬টি Dassault Rafale যুদ্ধবিমান রয়েছে। ২০১৬ সালে ফ্রান্সের সঙ্গে হওয়া সেই চুক্তি ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছিল। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, দুই সীমান্তে সম্ভাব্য সংঘাত এবং বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন ঘাটতির কারণে আরও যুদ্ধবিমানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার প্রায় ৩.২৫ লক্ষ কোটি টাকার একটি সরকার-থেকে-সরকার চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী ১১৪টি নতুন রাফাল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৪টি বিমান ভারতের মাটিতে তৈরি হতে পারে। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়, তাহলে রাফালের ইতিহাসে প্রথমবার ফ্রান্সের বাইরে অন্য কোনও দেশে এই যুদ্ধবিমান উৎপাদিত হবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রযুক্তি হস্তান্তর। অতীতে বহু প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বিদেশি সংস্থাগুলি কেবলমাত্র যন্ত্রাংশ সংযোজনের সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু এবার ভারত চাইছে আরও গভীর অংশীদারিত্ব, যেখানে নকশা উন্নয়ন, প্রকৌশল দক্ষতা, উৎপাদন প্রযুক্তি এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার উপর দেশীয় সংস্থাগুলির সরাসরি দক্ষতা তৈরি হবে।
এর ফলে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প উভয়ই লাভবান হতে পারে। হাজার হাজার দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলও শক্তিশালী হবে। বিমান নির্মাণ, ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা, রাডার, সেন্সর এবং অস্ত্র সংযোজনের মতো ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ বাড়বে।
শুধু বায়ুসেনাই নয়, ভারতীয় নৌবাহিনীও অতিরিক্ত ৩১টি রাফাল সংগ্রহে আগ্রহী। সেই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ভারতের হাতে মোট রাফালের সংখ্যা ২০০-র কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। এর ফলে স্থল ও সমুদ্র—দুই ক্ষেত্রেই ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগের আরেকটি বড় তাৎপর্য ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রেও রয়েছে। ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিরক্ষা অংশীদার। দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক গত এক দশকে আরও গভীর হয়েছে। যৌথ উৎপাদনের মাধ্যমে সেই সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।
একই সঙ্গে ভারতীয় প্রযুক্তি ও অস্ত্র ব্যবস্থাকে রাফালের সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য যুদ্ধ সরঞ্জাম রাফালে সংযোজিত হলে বিদেশি নির্ভরতা কমবে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীন সক্ষমতা বাড়বে।
সব মিলিয়ে রাফাল নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে চলা আলোচনা শুধুমাত্র নতুন যুদ্ধবিমান কেনার বিষয় নয়। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে নতুন স্তরে নিয়ে যাওয়ার একটি কৌশলগত উদ্যোগ। সফল হলে এটি দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে বৈশ্বিক অবস্থান—তিন ক্ষেত্রেই একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।