
হাইলাইটস
• ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্ম ও বিকাশের জটিল ইতিহাস তুলে ধরেছে বইটি।
• ১৯৭৯ সালের বিপ্লব কীভাবে ধীরে ধীরে একটি ধর্মীয় অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ল, তার বিশদ বিবরণ রয়েছে।
• মেহেদি কাররুবির জীবনকাহিনির মাধ্যমে বিপ্লবের আশা ও হতাশার গল্প বলা হয়েছে।
• ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলন এবং ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের শক্তিশালী চিত্র উঠে এসেছে।
• লেখকদের মতে, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ইরানে কখনও নিঃশেষ হয়নি; তা বারবার নতুন রূপে ফিরে এসেছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের বোমাবর্ষণ শুরুর আগে অনেকেই মনে করেছিলেন, এই যুদ্ধ হয়তো ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের কারণ হবে। বছরের পর বছর ধরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জনঅসন্তোষে দুর্বল হয়ে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থাকে চূড়ান্ত ধাক্কা দেবে বাইরের সামরিক আঘাত। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। যুদ্ধ দেশটির সবচেয়ে কঠোর ও আপসহীন শক্তিগুলোকেই আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
আধুনিক ইরান নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা মানুষের কাছে এটি অপ্রত্যাশিত ছিল না। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যে ঘটনাগুলোকে শাসনব্যবস্থার শেষ অধ্যায় বলে মনে হয়, সেগুলোই প্রায়শই তাকে নতুনভাবে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ইয়েগানেহ তোরবাতি এবং প্রবীণ ইরান-বিষয়ক সংবাদদাতা বোজর্গমেহর শরাফেদিন তাঁদের নতুন বই ‘স্টোলেন রেভলিউশন’-এ ঠিক এই পুনরাবৃত্ত ইতিহাসের অনুসন্ধান করেছেন। আধুনিক ইরানের গত অর্ধশতকের আন্দোলন, আশা, বিশ্বাসঘাতকতা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক গভীর ও বেদনাময় দলিল এই বই।
বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি শুধু রাষ্ট্রের দমনযন্ত্রের গল্প বলে না; বরং সেই দমনের ভেতরেও টিকে থাকা আশার ক্ষীণ আলোকে খুঁজে বের করে।
১৯৭৯: এক বিপ্লব, বহু স্বপ্ন
লেখকদের মতে, ১৯৭৯ সালের বিপ্লব হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি। এর শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত।
পঞ্চাশের দশকে সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার পর থেকেই ইরানি সমাজে ক্ষোভ জমতে শুরু করে। সেই ক্ষোভের সঙ্গে মিশে ছিল স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং বিদেশি প্রভাবমুক্ত জাতীয় মর্যাদার স্বপ্ন।
শাহবিরোধী জোট ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। সেখানে ধর্মীয় নেতা ছিলেন, বামপন্থী ছিলেন, ছাত্র ছিলেন, জাতীয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরাও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে ঐকমত্য ছিল না; ছিল কেবল বর্তমানকে প্রত্যাখ্যান করার ইচ্ছা।
অবশেষে শাহের পতন ঘটল। কিন্তু ক্ষমতা দ্রুত কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করল আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির চারপাশে গড়ে ওঠা ধর্মীয় নেতৃত্বের হাতে।
বিপ্লবের প্রথম দিকের বহু সহযোদ্ধাকে নির্বাসিত করা হলো, কারারুদ্ধ করা হলো, এমনকি হত্যা করা হলো।
তোরবাতি ও শরাফেদিন লিখেছেন, “সমতা ও বিপুল আশার আদর্শ নিয়ে শুরু হওয়া এক বিপ্লব শেষ পর্যন্ত একটি মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।”
মেহেদি কাররুবি: বিপ্লবের সন্তান, পরে তার সমালোচক
বইটির প্রথম অংশে ইসলামি পণ্ডিত মেহেদি কাররুবির জীবনকে কেন্দ্র করে বিপ্লবের ইতিহাস বলা হয়েছে।
১৯৬৬ সালে তরুণ কাররুবি গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ইরাকে যান নির্বাসিত খোমেনির সঙ্গে দেখা করতে। সীমান্তের কাছে খেজুরবাগানে লুকিয়ে থাকার পর তিনি নাজাফে পৌঁছান। খোমেনির হাত চুম্বন করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরবর্তী কয়েক দশক তিনি খোমেনির ভাষণ ইরানের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেন। শাহের গোপন পুলিশ তাঁকে বারবার গ্রেফতার করে। তিনি বহু বছর কারাগারে কাটান বামপন্থী ও ধর্মীয় কর্মীদের সঙ্গে।
বিপ্লবের পরে কাররুবি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজে অংশ নেন। তিনি রক্ষণশীল পোশাকবিধি সমর্থন করেন এমনকি পশ্চিমা সংগীত নিষিদ্ধ করার পক্ষেও ছিলেন।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি দেখতে পান, যে রাষ্ট্র গড়ে তুলতে তিনি সাহায্য করেছিলেন, সেটি তাঁর কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে। গণফাঁসি, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক দমনপীড়ন সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়।
আশির দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করে। যুদ্ধ ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে অসাধারণ ক্ষমতা দেয় এবং আত্মত্যাগ, নজরদারি ও স্থায়ী জরুরি অবস্থার সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
দুই হাজার সালের পর কাররুবি সংসদে বসে নিরাপত্তা রাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন। ২০০৯ সালের সবুজ আন্দোলনের সময় তিনি শাসকগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সমালোচকে পরিণত হন।
প্রতিরোধের নতুন প্রজন্ম
বইটির দ্বিতীয় অংশে লেখকরা নজর দিয়েছেন সেই তরুণ প্রজন্মের দিকে, যারা ১৯৭৯ সালের বিপ্লব দেখেনি, কিন্তু তার উত্তরাধিকার বহন করছে।
মোহাম্মদ খাতামির শাসনকালে নাগরিক সমাজের পুনর্জাগরণের গল্প এখানে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
সংবাদপত্রের প্রসার ঘটে। ছাত্র সংগঠন, সাহিত্যচক্র এবং সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। এসব সংগঠনে তরুণেরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করতে শেখে।
লেখকদের ভাষায়, “গণতন্ত্র ছিল তাদের সংগঠন পরিচালনার পদ্ধতি। ফলে তাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করে যে একটি দেশও একইভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত।”
এই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল ছোট ছোট সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
একটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, ১৭ বছর বয়সী কর্মী হিলা সেদিঘি ৫০০ মানুষের জন্য একটি কবিতা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। শেষ মুহূর্তে প্রশাসন অনুষ্ঠানটি বাতিল করে দেয়। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েন না। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ঘুরে অবশেষে একজন কর্মকর্তা তাঁকে অনুমতি দেন।
অনুমতির কাগজে স্বাক্ষর করতে করতে সেই কর্মকর্তা বলেন, “আমি শুধু তোমার জন্য নয়, নিজের জন্যও এই আগুন জ্বালাচ্ছি।”
সবুজ আন্দোলন: আশা ও পরাজয়ের কাহিনি
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর সবুজ আন্দোলন ইরানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় রচনা করে।
তেহরানের মেট্রো স্টেশনে ব্লুটুথের মাধ্যমে প্রচারসামগ্রী ছড়িয়ে পড়ে। শহরজুড়ে মানুষের দীর্ঘ মানবশৃঙ্খল তৈরি হয়। তরুণ কর্মীরা বিশ্বাস করতেন, বিপুল জনসমর্থন থাকলে রাষ্ট্র আর কারচুপি করে টিকতে পারবে না।
লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে।
তারা জবাবদিহি দাবি করে, ভোটের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলে।
কিন্তু আবারও রাষ্ট্র টিকে যায়। কারণ বিরোধিতাকে দমন করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল, সেগুলো আন্দোলনের শক্তির চেয়ে বেশি সংগঠিত ও ক্ষমতাবান ছিল।
‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’
বইয়ের সবচেয়ে জীবন্ত অংশগুলোর একটি হলো ২০২২ সালের ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের বিবরণ।
কুর্দি-ইরানি কর্মী রোঝিন ইউসুফজাদেহ একদিন মাথার ওড়না ছাড়া তেহরানের রাস্তায় হাঁটতে বের হন। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, যেকোনো মুহূর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে।
কিন্তু তিনি দেখলেন, আশপাশের মানুষ তাঁর সাহস দেখে নীরবে অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
পরে তাঁকে সত্যিই গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ততদিনে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কয়েক মাসের মধ্যে তেহরানের বহু এলাকায় নারীরা প্রকাশ্যে ওড়না ছাড়া চলাফেরা করতে শুরু করেন।
এই পরিবর্তন ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু ইরানের মতো সমাজে এটি ছিল এক বড় সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ।
বইটির সীমাবদ্ধতা
রেজা আসলানের মতে, বইটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর নাম।
‘স্টোলেন রেভলিউশন’ বা ‘চুরি হয়ে যাওয়া বিপ্লব’ শিরোনামটি এমন ধারণা দেয় যে বিপ্লবের আদর্শ হঠাৎ করে ছিনতাই হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু বইটির তথ্য-উপাত্ত বরং দেখায় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র বিপ্লবের ভেতরের দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য থেকেই জন্ম নিয়েছিল। এটি বাইরের কোনো শক্তির আরোপিত কাঠামো ছিল না; বরং বিপ্লবের মধ্যেই তার বীজ লুকিয়ে ছিল।
আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, কখনও কখনও লেখকদের বর্ণনায় মনে হয় দমন-পীড়নের দিকে যাত্রা যেন অবশ্যম্ভাবী ছিল। অথচ বইয়ের ভেতরেই এমন বহু মুহূর্ত রয়েছে, যখন ইতিহাস অন্য পথে মোড় নিতে পারত।
শেষ কথা
‘স্টোলেন রেভলিউশন’ মূলত একটি রাষ্ট্রের নয়, একটি সমাজের গল্প।
এটি দেখায় যে ইরানে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কখনও মরে যায়নি। কখনও তা ছাত্র আন্দোলনের রূপ নিয়েছে, কখনও কবিতা পাঠের আসরে, কখনও নারীদের পোশাকবিধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে।
আজ যুদ্ধ, দমন এবং নিরাপত্তার অজুহাতে সেই নাগরিক পরিসর আরও সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু তোরবাতি ও শরাফেদিনের বই শেষ পর্যন্ত হতাশার বই নয়।
কারণ তাঁদের বর্ণনায় বারবার ফিরে আসে একটি ধারণা—মানুষের সংগঠিত হওয়ার ক্ষমতা, বিকল্প কল্পনা করার ক্ষমতা, এবং অন্যরকম ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা।
সেই অর্থে, ইরানের বিপ্লব কখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। তা কখনও আড়ালে সরে যায়, কখনও কঠিন হয়ে জমাট বাঁধে, আবার কখনও নতুন রূপে ফিরে আসে। আর সেই কারণেই ইরানের ইতিহাস এখনও অসমাপ্ত।