হাইলাইটস:

  • দক্ষিণ ইরানের বেমানি অঞ্চলের দুটি জলসংরক্ষণ কেন্দ্র ধ্বংস হওয়ায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠেছে।
  • সামরিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জলাধারগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকে, তবে তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
  • ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, হামলাটি মার্কিন বাহিনী চালিয়েছে, যদিও স্বাধীনভাবে তা নিশ্চিত করা যায়নি।
  • মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তারা ঘটনার রিপোর্ট খতিয়ে দেখছে।
  • ভয়াবহ খরা ও তীব্র গরমের মধ্যে এই হামলা প্রায় ২০ হাজার মানুষের পানীয় জলের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছে।
  • মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরাও হামলার বৈধতা ও লক্ষ্য নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ ইরানের ছোট্ট উপকূলীয় অঞ্চল বেমানি। হরমুজ প্রণালীর মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই এলাকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার ১০ জুনের এক বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ঘটনাটি এখন আন্তর্জাতিক আইন, সামরিক নীতি এবং মার্কিন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল নিয়ে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই জলাধারগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধবিধির লঙ্ঘন হতে পারে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রাক্তন আইনজীবী ব্রায়ান ফিনুকেনের ভাষায়, “কোনও স্থাপনা হয় সামরিক লক্ষ্যবস্তু, নয়তো বেসামরিক সম্পদ। যদি এটি বেসামরিক সম্পদ হয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আক্রমণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি যুদ্ধাপরাধ।”

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, হামলাটি মার্কিন বাহিনী চালিয়েছে। যদিও এই দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স বলেছেন, “ঘটনা সম্পর্কে রিপোর্ট পেয়েছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”

ঘটনার সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কয়েক ঘণ্টা আগেই CENTCOM ঘোষণা করেছিল যে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং নজরদারি রাডারে হামলা চালিয়েছে।

এরপরই বেমানির জলাধার ধ্বংস হওয়ার খবর সামনে আসে।

যুদ্ধবিরতির মাঝেই চাপ বাড়ানোর কৌশল?

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, হামলাটি কেবল সামরিক অভিযান নয়; বরং ইরানকে মার্কিন শর্তে আলোচনায় বাধ্য করার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে।

এপ্রিল মাসে ঘোষিত নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির পরও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা কমেনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে আলোচনা দীর্ঘায়িত হলে ইরানকে “মূল্য চুকাতে হবে”।

বুধবার তিনি দাবি করেন, “গতকাল আমরা ওদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি, আজও করব।”

অন্যদিকে, একই দিনে তিনি আবার বলেন যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির কারণে নতুন হামলা স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু ইরানের সরকার জানিয়েছে, কোনও চূড়ান্ত সমঝোতা এখনও হয়নি।

জলসংকটের দেশে ভয়াবহ প্রভাব

ইরান এমনিতেই দীর্ঘদিনের জলসংকটে ভুগছে। দেশটির বহু অঞ্চল ঐতিহাসিক খরার মুখোমুখি।

আন্তর্জাতিক সংকট গবেষণা সংস্থার ইরান বিশেষজ্ঞ আলি ভায়েজ বলেন, “ইরানের জলসংকট দেশটিকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে যেখানে সামান্য বিঘ্নও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই ধরনের হামলা সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে।”

বেমানির জলাধার ধ্বংস হওয়ায় আশপাশের প্রায় ২০ হাজার মানুষের পানীয় জল সরবরাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

লক্ষ্যভ্রষ্ট হামলা নাকি সচেতন সিদ্ধান্ত?

ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ধ্বংসপ্রাপ্ত জলাধারের ছবি প্রকাশ করেছে। সেখানে পাওয়া বোমার টুকরো বিশ্লেষণ করে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ট্রেভর বল জানান, সেগুলি সম্ভবত GBU-39 নামের মার্কিন তৈরি নির্ভুল নির্দেশিত বোমার অংশ।

বল বলেন, “এটি একটি প্রত্যন্ত এলাকা। দুটি স্থাপনায় সরাসরি আঘাত লেগেছে। যদি ওগুলো লক্ষ্যবস্তু না হতো, তাহলে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।”

এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে—এটি কি ভুলবশত হয়েছে, নাকি জলাধারই ছিল প্রকৃত লক্ষ্য?

মার্কিন সামরিক অভিযানের সঙ্গে যুক্ত বহু প্রাক্তন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতায় জল পরিকাঠামোকে কখনও লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন বাহিনীকে পরামর্শ দেওয়া প্রাক্তন কর্মকর্তা ওয়েস ব্রায়ান্ট বলেন, “আমার কর্মজীবনে কোনও অভিযানে জল পরিকাঠামোতে হামলার কথা কখনও আলোচনাতেও আসেনি। আগে হলে আমি বলতাম এটা নিশ্চয়ই ভুল শনাক্তকরণ। কিন্তু এখন আর এতটা নিশ্চিত নই।”

আন্তর্জাতিক আইনে কী বলে?

আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী, কোনও হামলার আগে দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হয়।

প্রথমত, লক্ষ্যবস্তুটি বৈধ সামরিক লক্ষ্য কি না।

দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য সামরিক সুবিধার তুলনায় বেসামরিক মানুষের ক্ষতি অতিরিক্ত হবে কি না।

ফিনুকেনের মতে, প্রথম প্রশ্নটির উত্তরই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, “যদি এটি বৈধ সামরিক লক্ষ্য না হয়, তাহলে সেটি বেসামরিক অবকাঠামো। আর বেসামরিক অবকাঠামোয় ইচ্ছাকৃত হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।”

কংগ্রেসে নতুন বিতর্ক

মার্কিন কংগ্রেস ইতিমধ্যেই ইরানে প্রেসিডেন্টের সামরিক ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে। চারজন রিপাবলিকান সদস্যও সেই প্রস্তাবকে সমর্থন করেছিলেন।

ডেমোক্র্যাট সেনেটর টিম কেইন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক হামলার পর তিনি নতুন করে ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজল্যুশন’ আনবেন এবং পেন্টাগনের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাইবেন।

তাঁর মতে, “ইরান পৃথিবীর সবচেয়ে জলসংকটগ্রস্ত দেশগুলির একটি। বছরের সবচেয়ে গরম সময়ে বেসামরিক জল সরবরাহে আঘাত করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।”

কেইন আরও একটি নতুন উদ্বেগের কথা তুলেছেন—সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

তাঁর সতর্কবার্তা, “যথাযথ মানবিক তদারকি ছাড়া এআই ব্যবহার করলে ভয়াবহ ভুল হতে পারে। মিনাবের স্কুলে হামলার ক্ষেত্রেও আমাদের এই প্রশ্ন ছিল। বেমানির ঘটনাতেও সেই প্রশ্ন উঠবে।”

বেমানির জলাধারে হামলা ইরান-মার্কিন সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এটি যদি কেবল লক্ষ্যভ্রষ্ট বোমাবর্ষণ না হয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারেও একটি গুরুতর নজির হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর ওয়াশিংটন ও পেন্টাগনের ব্যাখ্যার দিকে কারণ সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে এটি যুদ্ধের কুয়াশায় হারিয়ে যাওয়া একটি ভুল, নাকি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের একটি নতুন অধ্যায়।