হাইলাইটস
- একসময় ঝরনা ও স্বচ্ছ জলের জন্য পরিচিত কাশ্মীরের একটি গ্রাম আজ খনি কার্যকলাপের চাপে পরিবেশগত সংকটে।
- পাহাড় কেটে পাথর ও খনিজ উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ বদলেছে, জল দূষিত হয়েছে।
- কৃষকদের অভিযোগ, উর্বর জমি ধুলো ও পাথরের স্তরে ঢেকে অনাবাদি হয়ে পড়ছে।
- স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির বদলে তারা পেয়েছেন পরিবেশ ধ্বংস ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।
- বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ না করা হলে গোটা অঞ্চলের জলসম্পদ বিপন্ন হতে পারে।
কাশ্মীরকে বলা হয় জল, বন আর পাহাড়ের দেশ। সেই কাশ্মীরেরই এক পাহাড়ি গ্রাম, যা একসময় অসংখ্য প্রাকৃতিক ঝরনা ও স্বচ্ছ জলের উৎসের জন্য পরিচিত ছিল, আজ পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসা ঝরনার জল দিয়ে চাষবাস চলত, গবাদি পশুর তৃষ্ণা মিটত এবং গ্রামের দৈনন্দিন জীবন আবর্তিত হত, সেখানে এখন দেখা যাচ্ছে ধুলোয় ঢেকে যাওয়া জমি, ক্ষতবিক্ষত নদীখাত এবং শুকিয়ে যাওয়া জলধারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ দ্রুত বিস্তার লাভ করা খনি শিল্প। পাথর, বালি এবং অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী উত্তোলনের জন্য পাহাড়ের ঢালে একের পর এক খনি চালু হয়েছে। ভারী যন্ত্রপাতি, বিস্ফোরণ এবং অবাধ খননের ফলে শুধু পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠনই বদলায়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোটা জলব্যবস্থা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা স্মরণ করেন, একসময় আশপাশের এলাকা থেকে মানুষ এখানে আসতেন ঝরনার জল সংগ্রহ করতে। গ্রীষ্মকালেও ঝরনাগুলি শুকিয়ে যেত না। কিন্তু এখন সেই ঝরনাগুলির অধিকাংশই হয় সম্পূর্ণ অদৃশ্য, নয়তো জলপ্রবাহ এত কমে গেছে যে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর উপর। নদীটি একসময় ছিল এলাকার প্রাণরেখা। কৃষিজমিতে সেচ, মাছ ধরা এবং পানীয় জলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল এটি। কিন্তু খনি কার্যকলাপের ফলে নদীতে বিপুল পরিমাণ পাথরের গুঁড়ো, ধুলো এবং বর্জ্য জমতে শুরু করেছে। নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে, অনেক জায়গায় স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। বর্ষাকালে হঠাৎ বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে জলাভাব—দুই সমস্যাই এখন ক্রমশ বাড়ছে।
কৃষকদের দুর্দশা আরও প্রকট। বহু কৃষক অভিযোগ করছেন, খনি থেকে উড়ে আসা ধুলো তাদের ফসলের উপর জমে থাকে। ধানের জমি, সবজিক্ষেত এবং ফলের বাগান আগের মতো ফলন দিচ্ছে না। অনেক জায়গায় জমির উপর পাথুরে স্তর জমে মাটির উর্বরতা নষ্ট হয়েছে। ফলে চাষের খরচ বাড়লেও আয় কমে যাচ্ছে।
এক কৃষকের কথায়, “আগে এই জমি আমাদের পরিবারের ভরসা ছিল। এখন ফসলের ফলন অর্ধেকেরও কম। নদীর জল আগের মতো পরিষ্কার নয়। অনেক সময় সেচ দেওয়ার জন্যও পর্যাপ্ত জল পাওয়া যায় না।”
পরিবেশবিদদের মতে, এই সমস্যা কেবল একটি গ্রামের নয়; এটি হিমালয় অঞ্চলের একটি বৃহত্তর সংকটের প্রতিচ্ছবি। পাহাড়ি অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত খনন শুধু ভূমিক্ষয় বাড়ায় না, ভূগর্ভস্থ জলস্তরকেও প্রভাবিত করে। ঝরনাগুলি মূলত পাহাড়ের অভ্যন্তরে সঞ্চিত জলের প্রাকৃতিক বহিঃপ্রকাশ। যখন বিস্ফোরণ ও ভারী খননের মাধ্যমে সেই ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন ঝরনাগুলির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের আরেকটি বড় অভিযোগ স্বাস্থ্য নিয়ে। ধুলোর কারণে শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা বাড়ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এই সমস্যা বিশেষভাবে প্রকট। গ্রামের মানুষদের মতে, আগে যে নির্মল পরিবেশ ছিল, এখন সেখানে দিনের বড় অংশ জুড়ে ধুলোর আস্তরণ ভাসতে দেখা যায়।
অবশ্য খনি মালিক ও শিল্পমহলের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, খনি শিল্প বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। এলাকায় অর্থনৈতিক কার্যকলাপ বেড়েছে এবং স্থানীয় বাজারে নগদের প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের পাল্টা প্রশ্ন, যদি সেই উন্নয়নের মূল্য হয় নদী, ঝরনা এবং কৃষিজমির ধ্বংস, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত লাভ কার?
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র, খননের সীমা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি কতটা মানা হচ্ছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ রয়েছে। বহুবার অভিযোগ জানানো হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে তাঁদের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মাধ্যমে খনির প্রকৃত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নদী ও ঝরনার উৎস অঞ্চলকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা দরকার। তৃতীয়ত, খনি সংস্থাগুলিকে কঠোর পরিবেশগত শর্ত মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বাসিন্দাদের জন্য পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
কাশ্মীরের এই গ্রামের গল্প আসলে উন্নয়ন ও পরিবেশের দ্বন্দ্বের গল্প। একদিকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক লাভের দাবি, অন্যদিকে প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানুষের জীবিকার অস্তিত্বের লড়াই। যে গ্রাম একসময় তার ঝরনার জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেখানে মানুষ প্রশ্ন তুলছে—পাহাড়ের বুক চিরে যে সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে, তার বিনিময়ে কি হারিয়ে যাচ্ছে আরও মূল্যবান কিছু?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ওই গ্রামের জন্য নয়, সমগ্র হিমালয় অঞ্চল এবং ভারতের পরিবেশ নীতির ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।