Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: দেবকে নিয়ে এখন বাংলার রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আদৌ তৃণমূল ভাঙবে কি ভাঙবে না, সেটা নয়। প্রশ্ন হল, দেব ভাঙলেন কি ভাঙলেন না। কারণ তৃণমূলের দুই তীরের মাঝখানে তিনি এমন এক নৌকা বেয়ে চলেছেন, যার মাঝি তিনিই, যাত্রীও তিনিই, আবার গন্তব্যও তিনিই।
দিল্লিতে সহমর্মী, ঘাটালে বিশ্বস্ত সৈনিক
দিল্লিতে বিদ্রোহী সাংসদদের সঙ্গে দেখা হলে দেবের চোখেমুখে এমন এক সহমর্মিতার আভা দেখা যায়, যেন তিনি বহুদিন ধরেই অন্তরে অন্তরে বিদ্রোহী। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হয়, “হ্যাঁ, তোমাদের যন্ত্রণা আমি বুঝি। তোমাদের বেদনা আমারও বেদনা।” বিদ্রোহী শিবিরের নেতারাও তখন মুগ্ধ হয়ে ভাবেন, এই তো আমাদের লোক। আজ না হোক কাল নিশ্চয়ই এদিকে চলে আসবেন। চা শেষ হয়, বৈঠক শেষ হয়, কিন্তু আশাটা শেষ হয় না।
তারপর দেব ঘাটালে ফিরে আসেন। মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক সভায় গিয়ে এমনভাবে হাসিমুখে বসেন, যেন দিল্লির কোনও ঘটনা তাঁর জীবনে কখনও ঘটেইনি। সভা শেষে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বুক ঠুকে ঘোষণা করেন, “আমি তো দিদির লোক। দিদি যেখানে, আমিও সেখানে।”
এই ঘোষণার পর বিদ্রোহী শিবিরে হালকা মাথা ঘোরা শুরু হয়। কারণ ঘণ্টা ছয়েক আগেও যে মানুষটি তাঁদের কাঁধে হাত রেখে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার গল্প শোনাচ্ছিলেন, সেই মানুষটিই এখন আবার দিদির পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে অটল আনুগত্যের প্রতীক।
শ্রোডিঙ্গারের নেতা
ফলে দেব এখন আর একজন সাংসদ নন। তিনি একই সঙ্গে শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল এবং শ্রোডিঙ্গারের নেতা। বাক্স না খোলা পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে না তিনি কার দলে আছেন। কাকলিদির? দিদির? নাকি নিজের?
আসলে দেব বহুদিন আগেই বুঝে গিয়েছেন যে বাংলার রাজনীতিতে মতাদর্শের চেয়ে মূল্যবান জিনিস হল সম্ভাবনা। আপনি যদি স্পষ্ট করে বলে দেন আপনি কার সঙ্গে আছেন, তাহলে অর্ধেক দরজা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এমনভাবে কথা বলেন যাতে সবাই ভাবে আপনি তাঁদের সঙ্গেই আছেন, তাহলে সব দরজাই খোলা থাকে।
তাই দেবের রাজনীতি অনেকটা ঘাটালের বন্যার জলের মতো। কোনও স্থায়ী সীমানা নেই। আজ এদিকে, কাল ওদিকে। জলকে যেমন জিজ্ঞেস করা যায় না সে কোন পাড়ের, দেবকেও তেমন জিজ্ঞেস করা যায় না তিনি কার শিবিরের।
এবং সম্ভবত এই রহস্যটাকেই তিনি যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখতে চান। কারণ বাংলার রাজনীতিতে এখন অনেক নেতা আছেন, অনেক বিদ্রোহী আছেন, অনেক অনুগত সৈনিকও আছেন। কিন্তু একই সঙ্গে বিদ্রোহী এবং অনুগত—এই বিরল শিল্পকলার একমাত্র সফল শিল্পী বোধহয় এখনও দেবই।
অভিনেতার রাজনীতি, রাজনীতিকের অভিনয়
দেবকে নিয়ে সমস্যাটা হল, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়ার আগে একজন সফল অভিনেতা। আর একজন সফল অভিনেতার সবচেয়ে বড় গুণ হল, তিনি একই দিনে একাধিক চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন। সকালে যদি তিনি বিদ্রোহীদের সহযোদ্ধা হন, তাহলে বিকেলে তিনি দিদির বিশ্বস্ত সৈনিক, আর রাতে টেলিভিশনের পর্দায় তিনি আবার সাধারণ মানুষের প্রিয় নায়ক।
রাজনীতির পুরনো নিয়ম ছিল, নেতা মানে অবস্থান। তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা সবাই জানবে। কিন্তু দেব সেই প্রাচীন ধারণাকে অচল করে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, আধুনিক রাজনীতিতে অবস্থান নয়, অবস্থানের সম্ভাবনাই আসল সম্পদ। আপনি যদি নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েন, তাহলে আপনার চলাফেরার জায়গা কমে যায়। কিন্তু যদি এমনভাবে দাঁড়ান যে সবাই ভাবে আপনি তাঁদের দিকেই এগোচ্ছেন, তাহলে আপনি সর্বত্র গ্রহণযোগ্য থাকেন।
বিদ্রোহী সাংসদদের দিকে তাকিয়ে দেবের মুখে যে সহানুভূতির হাসি দেখা যায়, তা দেখে মনে হয় তিনি যেন বহুদিন ধরেই দমবন্ধ অবস্থায় ছিলেন। আবার দিদির পাশে দাঁড়ালে তাঁর মুখে এমন এক বিশ্বস্ততার দীপ্তি ফুটে ওঠে যে মনে হয়, এই মানুষটিই শেষ সৈনিক, যিনি দুর্গ পতনের আগ পর্যন্ত পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
দু’পক্ষেরই আপন
ফলে দু’পক্ষই তাঁকে নিজেদের লোক বলে মনে করে। বিদ্রোহীরা ভাবে, দেব এখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসেননি, কিন্তু মন থেকে তাঁদের সঙ্গেই আছেন। অন্যদিকে মূল শিবির ভাবে, দেবের মতো জনপ্রিয় মুখ কখনও দল ছাড়বেন না। তিনি মাঝে মাঝে একটু অভিমান করেন, একটু দূরে যান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন।
দেব এই ভুল বোঝাবুঝিগুলো কখনও ভাঙেন না। কারণ তিনি জানেন, রহস্যের বাজারদর সবসময় স্পষ্টতার চেয়ে বেশি। যে নেতা প্রতিদিন ঘোষণা করেন তিনি কার সঙ্গে আছেন, তাঁকে নিয়ে দু’দিন পরে আর কারও কৌতূহল থাকে না। কিন্তু যে নেতা কখনও সম্পূর্ণ হ্যাঁ বলেন না, আবার সম্পূর্ণ না-ও বলেন না, তাঁকে নিয়ে প্রতিদিন নতুন আলোচনা হয়।
রাজনৈতিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স
এ যেন রাজনৈতিক কোয়ান্টাম মেকানিক্স। পর্যবেক্ষক অনুযায়ী দেবের অবস্থান বদলে যায়। বিদ্রোহী তাঁকে দেখলে বিদ্রোহী দেবকে দেখেন, অনুগত কর্মী তাঁকে দেখলে অনুগত দেবকে দেখেন। আর সাংবাদিক তাঁকে দেখলে দেখেন এমন এক মানুষকে, যিনি একটি বাক্য বলেও তিনটি ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারেন।
সম্ভবত এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য। যখন চারপাশে সবাই পক্ষ বেছে নিতে ব্যস্ত, তখন তিনি নিজেই একটি পক্ষ হয়ে উঠেছেন। তাঁর নামের পাশে আর কোনও বিশেষণ বসে না। তিনি বিদ্রোহী নন, অনুগতও নন। তিনি ‘দেব’।
আর বাংলার রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সেটাই সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। কারণ যদি কাল ক্ষমতার হাওয়া অন্যদিকে বইতে শুরু করে, তাহলে দেখা যাবে দেব কোথাও যাননি। তিনি আগের মতোই সবার সঙ্গে ছিলেন। শুধু দর্শকরা ভুল করে ভেবেছিলেন তিনি কারও একজনের সঙ্গে আছেন।
অভিনয়ের জগতে একে বলে চরিত্রের ভিতরে ঢুকে যাওয়া। রাজনীতির জগতে একে বলে সব দরজা খোলা রাখা। আর দেবের কৃতিত্ব হল, তিনি এমন দক্ষতার সঙ্গে এই দুই শিল্পকে একসঙ্গে মিশিয়েছেন যে আজ আর বোঝাই যায় না তিনি রাজনীতি করছেন, নাকি অভিনয়; নাকি অভিনয় করতে করতেই রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন দৃশ্যটা নিখুঁতভাবে অভিনয় করে চলেছেন।