Home খবর ফুটপাথ কার? তিন দশকের রাজনৈতিক প্রশ্রয় বনাম নতুন সরকারের বুলডোজার

ফুটপাথ কার? তিন দশকের রাজনৈতিক প্রশ্রয় বনাম নতুন সরকারের বুলডোজার

0 comments 9 views 4 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: আজ বুলডোজার চলছে। দোকান ভাঙছে। রাস্তার ধারে কয়েক দশক ধরে দাঁড়িয়ে থাকা টিন, ত্রিপল, কাঠের স্টল মাটিতে মিশে যাচ্ছে। ক্যামেরার সামনে কেউ কাঁদছেন, কেউ প্রতিবাদ করছেন, কেউ আবার বলছেন—”অবশেষে হাঁটার জায়গা ফিরে পাচ্ছি।”

কিন্তু এই দৃশ্যের ইতিহাস অনেক পুরনো।

কলকাতার ফুটপাথ নিয়ে যে যুদ্ধ আজ নতুন সরকারের আমলে বুলডোজারের মাধ্যমে সামনে এসেছে, তার শুরু অন্তত ষাটের দশকে। এবং এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি প্রশ্ন— ফুটপাথ কার? জীবিকার অধিকার বড়, না নাগরিকের চলাচলের অধিকার? আর রাজনৈতিক দলগুলি কি সত্যিই হকারদের রক্ষা করেছে, নাকি তাদের ভোটব্যাঙ্ক ও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করেছে?

দেশভাগ, উদ্বাস্তু আর ফুটপাথ অর্থনীতির জন্ম

কলকাতার হকার সমস্যার শিকড় দেশভাগে। ১৯৪৭ সালের পরে পূর্ববঙ্গ থেকে লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু পশ্চিমবঙ্গে আসেন। তাঁদের বড় অংশের গন্তব্য ছিল কলকাতা এবং তার উপকণ্ঠ। চাকরি ছিল না, পুঁজি ছিল না, ব্যবসা শুরু করার মতো সামর্থ্যও ছিল না। ফলে ফুটপাথ হয়ে ওঠে জীবিকার প্রথম ঠিকানা। এক টুকরো কাপড় বিছিয়ে ফল বিক্রি, বই বিক্রি, জামাকাপড় বিক্রি—এভাবেই শুরু হয় কলকাতার পথবাজার সংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে তা বিশাল অর্থনীতিতে পরিণত হয়।

২০০৫ সালে হকার সংগ্রাম কমিটির হিসাব অনুযায়ী কলকাতায় হকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ৭৫ হাজার। তাঁদের বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৮,৭৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ অনেক মাঝারি শিল্পগোষ্ঠীর চেয়েও বড় অর্থনৈতিক শক্তি।

ফুটপাথের সমান্তরাল রাষ্ট্র

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসে হকারদের নিজেদের মুখেই। হকার সংগ্রাম কমিটি জানিয়েছিল, কলকাতার হকাররা বছরে প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা ঘুষ দেয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী এই টাকা যায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যস্বত্বভোগী, পুলিশ, স্থানীয় কাউন্সিলর এবং অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে। হকার নেতা শক্তিমান ঘোষ একসময় বলেছিলেন, “রুটি-রুজি করতে গেলেও টাকা দিতে হয়।” এই একটি বাক্যই বুঝিয়ে দেয় ফুটপাথের অর্থনীতি আসলে কত বড় রাজনৈতিক অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল।

বামেদের আন্দোলন থেকে বামেদের উচ্ছেদ অভিযান

ইতিহাসের পরিহাস এখানেই। ষাটের দশকে কংগ্রেস সরকার যখন হকার উচ্ছেদ করতে চেয়েছিল, তখন সিপিএম হকারদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সেই সিপিএমই ১৯৯৬ সালে শুরু করল ‘অপারেশন সানশাইন’। গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার, ধর্মতলা—একের পর এক এলাকা থেকে হকার উচ্ছেদ করা হল। তৎকালীন পুর কমিশনার অসীম বর্মন ২১টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার জন্য কঠোর নিয়ম জারি করেছিলেন।

সেই সময় মনে হয়েছিল কলকাতা হয়তো সত্যিই ফুটপাথ ফিরে পাবে। কিন্তু তা হয়নি। কারণ রাজনীতি বদলায়, ভোটের অঙ্ক বদলায়। অপারেশন সানশাইনের পরেও ধীরে ধীরে হকাররা ফিরে এলেন, আরও শক্তিশালী হয়ে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং হকার রাজনীতি

অপারেশন সানশাইনের সময় হকারদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামেদের বিরুদ্ধে হকারদের ক্ষোভকে তিনি রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিলেন। পরবর্তী দুই দশকে কলকাতার ফুটপাথের চেহারা বদলে যায়। শুধু ফুটপাথ নয়, অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার অংশও ব্যবসার জায়গায় পরিণত হয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে কলকাতা পুলিশের এক ডেপুটি কমিশনার আদালতে স্বীকার করেন, শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ ফুটপাথ হকার এবং অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। পথচারীরা বাধ্য হয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন, এবং ধীরে ধীরে সেটাই অভ্যাস হয়ে যায়।

আদালতের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে

রাজনীতি যখন সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ, তখন ময়দানে নামে আদালত। ১৯৯৬ সাল থেকে কলকাতা হাইকোর্ট বারবার রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করেছে—ফুটপাথ কি পথচারীদের জন্য, না ব্যবসার জন্য? ২০০৬ সালে প্রধান বিচারপতি ভি এস সিরপুরকর এবং বিচারপতি সৌমিত্র সেন ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন, হকার সমস্যা ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। আদালত আরও বলেছিল, মানুষ ফুটপাথে হাঁটতে পারছে না, রাস্তা দিয়েও চলতে পারছে না। এটি কোনও রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল না, এটি ছিল বিচারব্যবস্থার পর্যবেক্ষণ।

ফুটপাথের প্রথম অধিকার কার?

১৯৯৬ সালের সাউথ ক্যালকাটা হকার্স অ্যাসোসিয়েশন বনাম গভর্নমেন্ট অব ওয়েস্ট বেঙ্গল মামলায় আদালত একটি মৌলিক নীতি স্থির করে। আদালত জানায়, হকারদের জীবিকার অধিকার আছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তারা সরকারি রাস্তা বা ফুটপাথ দখল করে বসে থাকার মৌলিক অধিকার পেয়েছেন। ফুটপাথের প্রথম অধিকার পথচারীর। এই নীতিই পরবর্তী তিন দশকের প্রায় সব মামলার ভিত্তি।

সরকারের পর সরকার, পরিকল্পনার পর পরিকল্পনা

এই সময়ে হকিং জোন, ভেন্ডিং জোন, পরিচয়পত্র, নিবন্ধন, পুনর্বাসন, ভেন্ডিং কমিটি, জাতীয় হকার নীতি ইত্যাদি অসংখ্য পরিকল্পনা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কার্যকর হয়েছে খুব কম। কারণ প্রতিবারই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—হকারদের সরালে তারা কোথায় যাবে? আর তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, তাদের সরাতে রাজনৈতিক দলগুলি কতটা প্রস্তুত?

নতুন সরকার এবং বুলডোজারের রাজনীতি

২০২৬ সালে ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন সরকার সেই প্রশ্নের অন্য উত্তর দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, প্রথমে রাস্তা ও ফুটপাথ ফিরিয়ে আনতে হবে, তারপর পুনর্বাসন। ফলে শুরু হয়েছে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান। হাওড়া, শিয়ালদহ, কলেজ স্ট্রিট, গড়িয়াহাট, ধর্মতলা, নিউ মার্কেট—একের পর এক এলাকায় বুলডোজার নামানো হয়েছে। সমর্থকদের মতে এটি আইন প্রয়োগ, বিরোধীদের মতে এটি দরিদ্রবিরোধী অভিযান।

আসলে কী হচ্ছে?

বাস্তবতা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। কারণ আদালত বহু বছর ধরে যেসব কথা বলে এসেছে, নতুন সরকার তারই অনেকটা কার্যকর করছে। আবার এটাও সত্য যে কয়েক লক্ষ মানুষের জীবিকার প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না। এই দ্বন্দ্বই কলকাতার হকার সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু।

যদি ফুটপাথ পথচারীর হয়, তাহলে দখলমুক্ত করা উচিত—এ নিয়ে তর্কের সুযোগ কম। কিন্তু হকারদের সরানো হলে তাদের জন্য বিকল্প কোথায়? গত তিন দশকে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর কোনও সরকারই দিতে পারেনি। বামফ্রন্ট পারেনি, তৃণমূল পারেনি, বর্তমান সরকারও এখনও পারেনি।

কলকাতা এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে

কলকাতার ফুটপাথ নিয়ে বর্তমান সংঘাত কোনও প্রশাসনিক অভিযান নয়, বরং তিন দশকের জমে থাকা একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক হিসাবনিকাশ। আদালত বহুবার সতর্ক করেছে, প্রশাসন বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলি বহুবার অবস্থান বদলেছে। কিন্তু সমস্যার মূল রয়ে গেছে একই—একদিকে নাগরিকের হাঁটার অধিকার, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের জীবিকার অধিকার।

নতুন সরকারের বুলডোজার হয়তো ফুটপাথ খালি করতে পারবে। কিন্তু কলকাতার সামনে আসল চ্যালেঞ্জ অন্যত্র। ফুটপাথকে পথচারীর জন্য ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি, সেই মানুষগুলোর জন্যও কি কোনও মর্যাদাপূর্ণ বিকল্প তৈরি করা যাবে, যারা বহু বছর ধরে ওই ফুটপাথকেই নিজেদের জীবনের একমাত্র অবলম্বন বলে জেনে এসেছে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, বর্তমান অভিযান ইতিহাসে ‘শহর উদ্ধার’ হিসেবে স্মরণীয় হবে, নাকি আরেকটি অসমাপ্ত অপারেশন সানশাইন হিসেবেই থেকে যাবে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles