Table of Contents
বছরের পর বছর আমি একটি ক্লান্তিকর এবং ব্যয়বহুল চক্রের মধ্যে আটকে ছিলাম। যখনই একঘেয়েমি লাগে, মন খারাপ হয় বা নিজের সম্পর্কে অনিশ্চয়তা কাজ করে, আমি মোবাইল হাতে নিয়ে অনলাইন দোকান ঘাঁটতে শুরু করি। তখন মনে হয়, ঠিক এই জুতোটাই কিনতে পারলে জীবনটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এই ফেসওয়াশটাই হয়তো আমাকে চিরতরুণ ও সুন্দর অনুভব করাবে।
কখনও কখনও নতুন জিনিস পাওয়ার আনন্দ দু’দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় উত্তেজনাটা মিলিয়ে যায় আরও দ্রুত—অনেক সময় অর্ডার নিশ্চিত করার বোতামে চাপ দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই। তারপর অবধারিতভাবে মনে হয়, “আমি এটা কেন কিনলাম?”
তাহলে কীভাবে কেনাকাটা কমানো যায়? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আমরা কথা বলেছি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এবং এমন কিছু মানুষের সঙ্গে, যারা সচেতনভাবে নিজেদের খরচ কমিয়ে এনেছেন।
আমরা এত বেশি কেনাকাটা করি কেন?
ওমাহা সিম্ফনির সংগীতশিল্পী এবং ইউটিউব চ্যানেল ‘কনশাস কনজিউমারিজম’-এর নির্মাতা অ্যালেক্সা ব্রাউনের মতে, আজকের দিনে হঠাৎ করে কিছু কিনে ফেলার প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, পুরো সমাজটাই এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যাতে প্রতিটি মুহূর্তে মানুষকে আরও বেশি ভোগবাদী করে তোলা যায়।”
আমাদের দুর্বলতা ও নিরাপত্তাহীনতাকে লক্ষ্য করে তৈরি বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখানো অত্যন্ত লক্ষ্যভিত্তিক প্রচার, এবং সামাজিক মাধ্যমে নানান পণ্য বিক্রি করা প্রভাবশালীরা—সব মিলিয়ে অতিরিক্ত ভোগ শুধু স্বাভাবিক নয়, অনেকের কাছে সেটাই আকাঙ্ক্ষিত জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে।
মিনিমালিজম ও মিতব্যয়ী জীবন নিয়ে কাজ করা কনটেন্ট নির্মাতা নিকোলাস গ্যারোফোলার মতে, কেনাকাটা অনেক সময় চাপ, উদ্বেগ বা একঘেয়েমি থেকে সাময়িক মুক্তির উপায় হয়ে দাঁড়ায়।
“নতুন কিছু কেনার মধ্যে একটা উত্তেজনা আছে,” তিনি বলেন। “নতুন জিনিস হাতে পাওয়ার আনন্দ বাস্তব এবং স্পষ্ট।”
আর অনেক সময় আমরা জানিই না, এর বাইরে কী করা যায়।
স্থিতিশীল জীবনযাপন নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ শেলবি অর্ম বলেন, “অনেক মানুষ জানেনই না ভোগের বাইরে কীভাবে জীবন কাটাতে হয়।”
তার নিজের পরিবারে বড়দের কোনও বিশেষ শখ ছিল না। ফলে কেনাকাটাই ছিল বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ধীরে ধীরে সেটাই অভ্যাসে পরিণত হয়। অর্মের মতে, অনেকের কাছেই কেনাকাটা এক ধরনের শখ। ফলে এই ভোগবাদী চক্র থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে মানুষ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও একা মনে করতে পারে।
অতিরিক্ত কেনাকাটার সমস্যা কোথায়?
প্রথমত, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
ব্রিটেন ও আমেরিকা—দুই দেশেই ভোক্তা ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ব্রিটেনে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় ক্রেডিট কার্ড ঋণ প্রায় ১,৪২৫ পাউন্ড। আমেরিকায় সেই অঙ্ক ৬,৭০০ ডলারেরও বেশি।
ঋণের বোঝা শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিও ডেকে আনে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা ঋণের চাপে ভুগছেন তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ, অসন্তোষ, মাদক বা মদ্যপানের প্রবণতা এবং মাথাব্যথা কিংবা হজমজনিত সমস্যার হার বেশি।
গ্যারোফোলা বলেন, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতায় এমন অনেক জিনিস ছিল যা তিনি ব্যবহারই করতেন না। কিন্তু সেগুলো ঘরে জমে থাকতে থাকতে তাঁর কাছে যেন এক ধরনের মানসিক বোঝা হয়ে উঠেছিল।
একসময় তিনি বুঝতে পারেন, কেনাকাটা আসলে তাঁর জন্য বাস্তব সমস্যাগুলি এড়িয়ে যাওয়ার একটি কৌশল ছিল।
“যদি সুখী হতে আমাকে বারবার কিছু কিনতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে জীবনের অন্য কোনও সমস্যার মুখোমুখি হওয়া দরকার,” তিনি বলেন।
ভবিষ্যতের ক্ষতিও হতে পারে
বস্টনের মনোবিজ্ঞানী এবং ফ্যামিলি ওয়েলথ কনসাল্টিং-এর মালিক ড. জেমস গ্রাবম্যানের মতে, অতিরিক্ত খরচ শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতেরও ক্ষতি করে।
অযথা অর্থ ব্যয় করলে জরুরি প্রয়োজনে সঞ্চয় গড়ে তোলা কঠিন হয়ে যায়। আর্থিক নিরাপত্তা দুর্বল হয়। এমনকি পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থসংক্রান্ত চাপ কিংবা অন্যের কাছ থেকে ধার চাওয়ার প্রয়োজন অনেক সময় সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করে।
পরিবেশের ওপরও এর বড় প্রভাব আছে
অতিরিক্ত ভোগের ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়।
অ্যালেক্সা ব্রাউন বলেন, বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ওপরও ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “সস্তা ও ফ্যাশনেবল অনেক পণ্য, বিশেষ করে পোশাক, প্লাস্টিক থেকে তৈরি হয়। ভাবলে মন খারাপ লাগে যে এই জিনিসগুলোর বড় অংশ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আবর্জনায় পরিণত হয়।”
চাহিদা বাড়ার ফলে সংস্থাগুলি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি উৎপাদন করছে। শুধু পোশাক শিল্পেই প্রতি বছর উৎপাদিত পোশাকের ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি হয় না।
এসব অবিক্রীত পোশাকের বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঘানা, ভারতসহ নানা দেশে পৌঁছায়। সেখানে সেগুলো পরিবেশ দূষণ এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে ওঠে।
তাই যখন নতুন একটি কুশন, পোশাক বা সাজসজ্জার জিনিস কিনতে ইচ্ছা করে, তখন এই বিষয়গুলোও মনে রাখা উপকারী হতে পারে।
নিজেকে দোষারোপ নয়, সচেতনতা দরকার
অ্যালেক্সা ব্রাউন মনে করিয়ে দেন, সমাজ যে জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেই পথেই চলার জন্য মানুষকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়।
তিনি বলেন, “এটা নৈতিকতার পরীক্ষা নয়, বা অন্যদের চেয়ে নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার বিষয়ও নয়।”
বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা প্রত্যেকে যতটুকু পারি অপচয় কমানোর চেষ্টা করা।
তার কথায়, “কম অপচয় করে, আরও সচেতনভাবে জিনিস কেনা ও ব্যবহার করার দিকে ছোট ছোট পদক্ষেপও মূল্যবান। কারণ শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই নৌকায় আছি।”