হাইলাইটস:

  • গত ২৪ বছরে দেশের বিভিন্ন নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় অন্তত ৪৫ বার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরীক্ষার্থী, মধ্যস্বত্বভোগী বা স্থানীয় চক্র ধরা পড়লেও মূল হোতারা শাস্তির বাইরে থেকে গিয়েছেন।
  • বহু পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
  • তদন্ত হয়েছে, কমিটি গঠিত হয়েছে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির অত্যন্ত বিরল।
  • সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে প্রশ্নফাঁস চক্র আরও সংগঠিত ও লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি এমন এক পুনরাবৃত্ত সংকট, যা প্রায় প্রতি বছরই দেশের কোথাও না কোথাও নিয়োগ পরীক্ষা, ভর্তি পরীক্ষা কিংবা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাকে বিপর্যস্ত করে দেয়। সাম্প্রতিক একটি তদন্তমূলক প্রতিবেদনে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস দেখিয়েছে যে গত ২৪ বছরে অন্তত ৪৫টি বড় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হল—এই বিপুল সংখ্যক কেলেঙ্কারির পরও খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নজির পাওয়া যায়।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হন পরীক্ষার্থীরা। বছরের পর বছর প্রস্তুতি, কোচিং, অর্থব্যয় এবং মানসিক চাপের পর তারা পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছন। তারপর জানা যায় প্রশ্ন আগেই বাজারে বিক্রি হয়েছে। পরীক্ষা বাতিল হয়। নতুন করে পরীক্ষা নেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে।

এই সমস্যা নতুন নয়। ২০০০-এর দশকের শুরু থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে বোর্ড পরীক্ষা, শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশ নিয়োগ, মেডিক্যাল প্রবেশিকা, প্রকৌশল প্রবেশিকা—প্রায় সব ধরনের পরীক্ষাতেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ঘটনাগুলির মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। প্রতিবারই প্রশাসন প্রথমে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলে। কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়। তদন্ত শুরু হয়। তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি জনস্মৃতি থেকে মুছে যায়।

ফলে প্রশ্ন উঠছে, সমস্যা কি কেবল নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা? নাকি এর থেকেও বড় সমস্যা হল দায়মুক্তির সংস্কৃতি?

প্রশ্নপত্র ফাঁস সাধারণত একক ব্যক্তির কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মুদ্রণ সংস্থা, পরিবহণ ব্যবস্থা, পরীক্ষাকেন্দ্র, প্রযুক্তি কর্মী, মধ্যস্বত্বভোগী এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক স্তরের লোকজন। অর্থাৎ এটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক। কিন্তু তদন্তের শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখা যায়, শাস্তি পায় মূলত নীচুতলার কয়েকজন ব্যক্তি। যাঁরা পুরো ব্যবস্থাকে পরিচালনা করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করা যায় না বা মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে।

গত দুই দশকে প্রশ্নফাঁসের ধরনও বদলেছে। আগে মুদ্রিত প্রশ্নপত্র চুরি বা ফটোকপি করে ছড়িয়ে দেওয়া হত। এখন স্মার্টফোন, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং ডিজিটাল স্টোরেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে প্রশ্ন পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। প্রযুক্তি যেমন পরীক্ষার আধুনিকীকরণ করেছে, তেমনি অপরাধীদেরও নতুন অস্ত্র দিয়েছে।

তদন্তে দেখা গিয়েছে, প্রশ্নফাঁস এখন একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে প্রশ্নপত্রের বিনিময়ে। চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে এই অবৈধ ব্যবসার আকর্ষণ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া। কারণ একটি চাকরির জন্য কখনও কখনও কয়েক লক্ষ আবেদন জমা পড়ে। একটি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা শুধু পরীক্ষা বাতিল করে না, পুরো নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

এই পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ সামাজিক প্রভাবও রয়েছে। সৎভাবে প্রস্তুতি নেওয়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বাড়ে। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে শুধুমাত্র মেধা দিয়ে আর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হওয়া সম্ভব নয়। এই অবিশ্বাস গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর জন্যও বিপজ্জনক।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দাবি বহুদিনের। সম্প্রতি কেন্দ্র সরকার পাবলিক পরীক্ষার নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করেছে। কঠোর শাস্তি, জরিমানা এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আইন তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন তিনটি বিষয়। প্রথমত, প্রশ্নপত্র তৈরির থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছনো পর্যন্ত পুরো শৃঙ্খলকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা। দ্বিতীয়ত, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা। তৃতীয়ত, এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যাতে ভবিষ্যতে কেউ এই ধরনের অপরাধে জড়াতে সাহস না পায়। কারণ গত ২৪ বছরের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা যতটা বড় সমস্যা, তার থেকেও বড় সমস্যা হল অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া।

ভারতের কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর কাছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়; এটি সামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক নিরাপত্তা এবং জীবনের নতুন সুযোগের দরজা। সেই ব্যবস্থার উপর আস্থা যদি বারবার ভেঙে পড়ে, তাহলে ক্ষতি শুধু কয়েকটি পরীক্ষার নয়, ক্ষতি পুরো রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতার।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ইতিহাস তাই কেবল দুর্নীতির ইতিহাস নয়। এটি দায়মুক্তির ইতিহাসও। আর সেই ইতিহাস না বদলালে ৪৫-এর সংখ্যা আগামী দশকে হয়তো ৫০, ৬০ বা তারও বেশি হয়ে যাবে। তখন প্রশ্ন থাকবে না—প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না। প্রশ্ন হবে, আবার কবে হবে।