হাইলাইটস:

• বিধানসভায় ভাঙনের পর এখন নজর সংসদীয় দলের দিকে।
• একাধিক সাংসদের অসন্তোষ প্রকাশ্যে না এলেও জল্পনা ক্রমশ বাড়ছে।
• যদি সাংসদদের একটি বড় অংশ আলাদা ব্লক গঠন করেন, তবে জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের গুরুত্ব নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
• বিজেপির কাছে এটি শুধু পশ্চিমবঙ্গের লড়াই নয়, সংসদের সংখ্যার অঙ্কেও একটি বড় লাভ।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন আর বিধানসভাকে ঘিরে নয়। প্রশ্ন হল, বিধানসভায় যা ঘটেছে, তা কি শেষ পর্যন্ত সংসদীয় দলেও প্রতিফলিত হবে?

রাজনীতিতে একটি পুরনো সত্য আছে। কোনও দলের পতন কখনও একদিনে হয় না। প্রথমে দেখা যায় নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে হতাশা। তারপর স্থানীয় নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। এরপর শুরু হয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান। যখন সেই প্রবণতা বিধায়ক থেকে সাংসদ স্তরে পৌঁছে যায়, তখন সাধারণত দলটি অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারানোর পরে তৃণমূলের সামনে এখন সেই আশঙ্কাই দেখা দিয়েছে।

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি পাওয়া নতুন পরিষদীয় গোষ্ঠীর উত্থান শুধু একটি সাংগঠনিক ঘটনা নয়। এটি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বহু বিধায়ক যখন প্রকাশ্যে পুরনো নেতৃত্ব থেকে দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের মধ্যে কি একই ধরনের চিন্তাভাবনা তৈরি হচ্ছে?

রাজনীতির বাস্তবতা হল, সাংসদরা সাধারণত বিধায়কদের তুলনায় বেশি সতর্ক হন। কারণ তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু রাজ্যের উপর নির্ভর করে না। দিল্লির জাতীয় সমীকরণ, সংসদীয় কমিটি, কেন্দ্রীয় প্রকল্প, রাজনৈতিক যোগাযোগ—সবকিছুই তাঁদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। ফলে তাঁরা প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করতে দেরি করেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন না।

বরং অনেক ক্ষেত্রে সাংসদরা বিধায়কদের চেয়ে বেশি হিসেবি হন।

আজ তৃণমূলের সাংসদদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। যদি দলের পুনরুত্থানের সম্ভাবনা স্পষ্ট না হয়, যদি সংগঠন ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে, যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কমতে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।

এখানেই বিজেপির আগ্রহ।

বিজেপি জানে, কয়েকজন বিধায়কের দলত্যাগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সীমিত প্রভাব ফেলে। কিন্তু যদি সাংসদ স্তরে ভাঙন শুরু হয়, তাহলে তার প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রথমত, সংসদে তৃণমূলের শক্তি কমে যাবে।

দ্বিতীয়ত, বিরোধী রাজনীতিতে দলের গুরুত্ব কমে যাবে।

তৃতীয়ত, জাতীয় স্তরে এই বার্তা যাবে যে তৃণমূল আর ভবিষ্যতের শক্তি নয়, বরং অতীতের শক্তি।

রাজনীতিতে এই বার্তাটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।

কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাধারণত ডুবন্ত জাহাজে শেষ পর্যন্ত থাকতে চান না। তাঁরা সেই দিকেই ঝোঁকেন যেখানে আগামী নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা বেশি। বিজেপি যদি এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে পশ্চিমবঙ্গে আগামী বহু বছর তাদেরই প্রাধান্য থাকবে, তাহলে তৃণমূলের ভিতরে অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।

আরও একটি বিষয় বিজেপির পক্ষে কাজ করছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে তৃণমূলের মধ্যে বহু স্তরের নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই নেতৃত্বের অনেকেই নিজস্ব রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। ক্ষমতায় থাকার সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে সেই চাপা অসন্তোষ সামনে আসার সুযোগ পায়।

ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ আছে।

কংগ্রেসের ভাঙন, জনতা দলের ভাঙন, এনসিপির বিভাজন, শিবসেনার দ্বিখণ্ডন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, দল দুর্বল হওয়ার পরে নেতারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। আদর্শ, আবেগ বা অতীতের আনুগত্য তখন দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়।

তৃণমূলও সেই বাস্তবতা থেকে মুক্ত নয়।

তবে এটাও সত্য যে সাংসদদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বিধায়কদের মতো সরল নয়।

লোকসভার সদস্যদের এখনও কয়েক বছরের সাংসদ পদ রয়েছে। রাজ্যসভার সদস্যদের ক্ষেত্রেও মেয়াদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ তাঁদের কম। অনেকেই অপেক্ষা করতে পারেন। তাঁরা দেখতে চাইবেন দল আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারে কি না, সংগঠন পুনর্গঠিত হয় কি না, নেতৃত্ব কোনও নতুন রাজনৈতিক রণকৌশল নিয়ে আসে কি না।

অর্থাৎ অবিলম্বে কোনও নাটকীয় ঘটনা ঘটবে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

কিন্তু রাজনীতিতে অনেক সময় ঘটনাটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয় সম্ভাবনা।

আজ দিল্লির রাজনৈতিক মহলে যে প্রশ্নটি ঘুরছে, সেটি হল—তৃণমূলের সাংসদরা এখনও একসঙ্গে আছেন কারণ তাঁরা থাকতে চান, নাকি এখনও যাওয়ার সঠিক সময় আসেনি?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী কয়েক মাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণ করবে।

যদি সাংসদদের একটি অংশ মনে করেন যে তাঁদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আলাদা পথে বেশি নিরাপদ, তাহলে সংসদীয় দলের ভিতরে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। সেটা সরাসরি বিজেপিতে যোগদানও হতে পারে, আবার আলাদা গোষ্ঠী বা স্বতন্ত্র ব্লক তৈরির চেষ্টাও হতে পারে।

সেই পরিস্থিতিতে বিজেপির লাভ হবে বহুমাত্রিক।

পশ্চিমবঙ্গে প্রধান প্রতিপক্ষ আরও দুর্বল হবে। সংসদে সংখ্যার অঙ্কে সুবিধা মিলবে। বিরোধী জোটের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় কথা, রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের লড়াইয়ে বিজেপি একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে পারবে—তৃণমূলের পতন শুধু নির্বাচনী পরাজয় নয়, সংগঠনগত ভাঙনের পর্যায়েও পৌঁছে গিয়েছে।

রাজনীতিতে অনেক সময় একটি দল নির্বাচনে হেরে গিয়েও টিকে যায়। কারণ তার নেতারা ঐক্যবদ্ধ থাকেন। আবার এমনও হয়েছে, একটি দল এখনও উল্লেখযোগ্য ভোটব্যাঙ্ক ধরে রেখেছে, কিন্তু নেতাদের ধারাবাহিক প্রস্থানের ফলে দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে।

তৃণমূল এখন এই দুই সম্ভাবনার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

সাংসদরা কী করবেন, তার উত্তর আজ কারও কাছে নেই। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত, বিধানসভার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দিল্লির করিডরেও গভীর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপি অপেক্ষা করছে। তৃণমূলও অপেক্ষা করছে। আর রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা খুঁজছেন সেই প্রথম সংকেত, যা জানিয়ে দেবে বিধানসভার এই ফাটল দিল্লির সংসদীয় রাজনীতিতেও ভাঙন ধরাতে চলেছে কি না।