হাইলাইটস
- নাটকের গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে মোবাইলে মেসেজ পাঠাচ্ছিলেন এক দর্শক
- অভিনয় শেষে সরাসরি সেই দর্শকের আচরণের সমালোচনা করেন রোজামুন্ড পাইক
- “অভিনেতা ও দর্শকের মধ্যে এক পবিত্র সম্পর্ক থাকে”—মন্তব্য অভিনেত্রীর
- পাইকের বক্তব্যে করতালিতে ফেটে পড়ে প্রেক্ষাগৃহ
- আধুনিক যুগে থিয়েটারে মোবাইল ব্যবহারের সমস্যা ফের আলোচনায়
লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ডের একটি নাট্যমঞ্চে ঘটে যাওয়া একটি ছোট্ট ঘটনা এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়। কারণ ঘটনাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন হলিউড ও ব্রিটিশ মঞ্চের অন্যতম পরিচিত অভিনেত্রী Rosamund Pike। নাটক চলাকালীন এক দর্শকের মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানোর আচরণে এতটাই বিরক্ত হন তিনি যে, অভিনয় শেষ হওয়ার পর মঞ্চ থেকেই প্রকাশ্যে সেই দর্শককে ভর্ৎসনা করেন।
ঘটনাটি ঘটেছে Wyndham’s Theatre-এ, যেখানে পাইক বর্তমানে অভিনয় করছেন Inter Alia নাটকে। নাটকের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন দৃশ্য চলাকালীন দর্শকাসনের এক ব্যক্তি নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে শুরু করেন। আলো জ্বলা পর্দা ও তার নড়াচড়া মঞ্চ থেকে স্পষ্টই চোখে পড়ে অভিনেত্রীর।
থিয়েটারের জগতে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিনেতারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু না বলে অভিনয় চালিয়ে যান। পাইকও সেদিন তাই করেছিলেন। তবে নাটক শেষ হওয়ার পর পর্দা পড়ার আগে তিনি বিষয়টি নিয়ে মুখ খোলেন।
দর্শকদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর বক্তব্যে ছিল বিরক্তি, হতাশা এবং খানিকটা রসবোধও। তিনি বলেন, নাটকের সেই মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সময় একজন দর্শকের মোবাইল ব্যবহার শুধু তাঁর নিজের মনোযোগই নষ্ট করেনি, বরং মঞ্চে অভিনেতাদের সঙ্গে দর্শকদের যে আবেগগত সংযোগ তৈরি হয়, সেটিকেও ব্যাহত করেছে।
পাইক উল্লেখ করেন, থিয়েটার এমন একটি শিল্পমাধ্যম যেখানে অভিনেতা ও দর্শক একসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার অংশ হন। সিনেমা হলে বা টেলিভিশনের সামনে বসে দেখার মতো নয়; এখানে প্রত্যেক দর্শকের উপস্থিতি ও মনোযোগ নাটকের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে একজনের অসচেতন আচরণ গোটা পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাঁর বক্তব্যের একটি অংশে রসিকতার সুরও ছিল। তিনি বলেন, হয়তো সেই ব্যক্তির কাছে অত্যন্ত জরুরি কোনও কারণ ছিল। হয়তো পৃথিবী বাঁচানোর মতো কোনও বার্তা পাঠাতে হচ্ছিল। কিন্তু তবুও সেই কাজটি নাটকের মাঝখানে না করলেই ভালো হত।
এই মন্তব্যে পুরো প্রেক্ষাগৃহ হেসে ওঠে। এরপরই দর্শকদের করতালিতে মঞ্চ মুখর হয়ে ওঠে। উপস্থিত অধিকাংশ দর্শকই অভিনেত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন জানান।
ঘটনার পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে আলোচনা। অনেকেই বলেছেন, থিয়েটারে মোবাইল ফোন ব্যবহার এখন ক্রমশ বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেলেও, কিছু জায়গা এখনও আছে যেখানে সম্পূর্ণ মনোযোগ ও উপস্থিতি জরুরি। থিয়েটার সেই জায়গাগুলির অন্যতম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইভ পারফরম্যান্সের শক্তিই হল তার তাৎক্ষণিকতা। মঞ্চে যা ঘটছে, তা একবারই ঘটছে। সেই অভিজ্ঞতা পুনরায় তৈরি করা সম্ভব নয়। ফলে দর্শকের মনোযোগ বিচ্যুত হলে শুধু তিনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, শিল্পী ও অন্যান্য দর্শকের অভিজ্ঞতাও ক্ষুণ্ণ হয়।
গত কয়েক বছরে বিশ্বের নানা প্রান্তে থিয়েটার, অপেরা, শাস্ত্রীয় সংগীতের আসর কিংবা কনসার্টে মোবাইল ফোন সংক্রান্ত বিতর্ক বেড়েছে। কোথাও ফোন বেজে ওঠে, কোথাও দর্শক ভিডিও করতে শুরু করেন, আবার কোথাও সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার চালানো হয়। ফলে শিল্পীরা বারবার দর্শকদের কাছে শিষ্টাচার বজায় রাখার আবেদন জানাচ্ছেন।
রোজামুন্ড পাইকের এই মন্তব্য সেই বৃহত্তর বিতর্ককেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সচেতনতা তৈরি করা। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, একটি নাটক দেখতে যাওয়া শুধু বিনোদন গ্রহণ নয়; এটি শিল্পের সঙ্গে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া।
আজকের ডিজিটাল যুগে, যখন মানুষের মনোযোগ কয়েক সেকেন্ড অন্তর মোবাইলের পর্দায় টেনে নেওয়া হচ্ছে, তখন থিয়েটার যেন এক ধরনের প্রতিরোধের জায়গা। সেখানে দর্শককে কিছু সময়ের জন্য হলেও বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মঞ্চের গল্পে ডুবে যেতে হয়।
সেই কারণেই হয়তো পাইকের বক্তব্য এত সাড়া ফেলেছে। কারণ এটি শুধু একজন দর্শকের মোবাইল ব্যবহারের সমালোচনা নয়; বরং আধুনিক মানুষের ক্রমহ্রাসমান মনোযোগ ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক শিল্পীর প্রতিবাদ। আর সেই প্রতিবাদে করতালি দিয়ে সেদিন লন্ডনের দর্শকরা যেন জানিয়ে দিয়েছেন—মঞ্চের জাদু এখনও অটুট রাখতে চান তাঁরা।