Home খবর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১.৬ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা ঘোষণা সুইডেনের

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধাক্কা: জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ১.৬ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা ঘোষণা সুইডেনের

নির্বাচনের চার মাস আগে ভর্তুকির বন্যা, অর্ধেক করা হচ্ছে গণপরিবহনের ভাড়া

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 1 views 3 minutes read
A+A-
Reset

স্টকহোম, ১ জুন: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর কার্যত অচলাবস্থার ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সুইডেন সরকার পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য প্রায় ১৭.৩ বিলিয়ন ক্রোনা (প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ইউরো) মূল্যের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপ হল ছয় মাসের জন্য গণপরিবহনের মাসিক পাসের দাম অর্ধেক করে দেওয়া।

কিন্তু এই ঘোষণার রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। কারণ, আর মাত্র চার মাস পরেই সুইডেনে জাতীয় নির্বাচন। ফলে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই ব্যয়বহুল কর্মসূচিকে নির্বাচনী সুবিধা আদায়ের চেষ্টা বা তথাকথিত “পর্ক ব্যারেল পলিটিক্স” বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছে।


নির্বাচনের আগে উদার রক্ষণশীল সরকারের ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ

সুইডেনের রাজনৈতিক অভিধানে একটি জনপ্রিয় শব্দ রয়েছে—“Valfläsk”। এর অর্থ, ভোটের আগে জনগণকে খুশি করতে সরকার যখন বিপুল অর্থ ব্যয় করে নানা সুবিধা ঘোষণা করে।

সাধারণত আর্থিক শৃঙ্খলা ও ব্যয়সংযমের পক্ষপাতী হিসেবে পরিচিত বর্তমান ডানপন্থী-উদারপন্থী জোট সরকারকে এবার সেই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।

ক্ষমতাসীন জোটের চারটি দল—মডারেট পার্টি (কনজারভেটিভ), খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাট, লিবারেল পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থী সুইডেন ডেমোক্র্যাটস—মিলে এই বিশাল সহায়তা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

সরকারের বক্তব্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার অভিঘাত থেকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাকে রক্ষা করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।


বাস-ট্রেনের মাসিক পাসের দাম কমবে ৫০ শতাংশ

প্যাকেজের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো গণপরিবহন ভর্তুকি।

১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুইডেনের বিভিন্ন শহরে বাস, মেট্রো ও অন্যান্য গণপরিবহনের মাসিক পাসের মূল্য অর্ধেক করা হবে।

এই কর্মসূচির জন্য সরকারের খরচ হবে প্রায় ৬.৫ বিলিয়ন ক্রোনা

প্রধানমন্ত্রী Ulf Kristersson জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব অন্তত বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে বলে সরকার মনে করছে।

তাঁর কথায়,

“আমরা চাই মানুষ বিকল্প হিসেবে গণপরিবহন ব্যবহারের সুযোগ বিবেচনা করুক। জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে এটি তাদের আর্থিক স্বস্তি দেবে।”


বিরোধীদের প্রশ্ন: এখন কেন?

সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের আগে জনমত সমীক্ষায় পিছিয়ে থাকা মধ্য-বাম বিরোধী জোট সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে।

তবে তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছে।

বিরোধী নেতাদের বক্তব্য, গত কয়েক বছরে গণপরিবহনের ভাড়া কমানোর জন্য তারা একাধিকবার প্রস্তাব দিলেও বর্তমান সরকার ও তাদের মিত্ররা সবসময় তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

তাহলে নির্বাচনের ঠিক আগে হঠাৎ এই মনোভাব পরিবর্তনের কারণ কী?

এই প্রশ্নই এখন সুইডেনের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।


শুধুই গণপরিবহন নয়, সুবিধা পাবেন গাড়িচালকরাও

গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের জন্যও বড় সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে।

১ জুলাই থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত জ্বালানির উপর কর কমানো হবে প্রতি লিটারে ২.৪০ ক্রোনা

বর্তমানে সুইডেনে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি প্রায় ১৮.৫০ ক্রোনা, আর ডিজেলের দাম ২০.৫০ ক্রোনারও বেশি

কর হ্রাসের ফলে সাধারণ চালকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

বিদ্যুতের বিল পরিশোধে সহায়তার সঙ্গে মিলিয়ে এই অংশের জন্য সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৮.৭ বিলিয়ন ক্রোনা


কৃষক, মৎস্যজীবী ও বিমান পরিবহনও পাচ্ছে সহায়তা

সরকারের প্যাকেজে শুধু ভোক্তাদের জন্যই নয়, বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য ১.৬ বিলিয়ন ক্রোনা
  • অভ্যন্তরীণ বিমান পরিবহন খাতের জন্য ৫২০ মিলিয়ন ক্রোনা

সরকারের মতে, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই খাতগুলিও ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে এবং তাদের টিকিয়ে রাখতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন।


‘আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট’

অর্থমন্ত্রী Elisabeth Svantesson এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতিকে “আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর জ্বালানি সংকট” বলে বর্ণনা করেন।

তাঁর যুক্তি, সুইডেনের সরকারি অর্থভাণ্ডার এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী।

বর্তমানে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) মাত্র ৩৫ শতাংশ, যা ইউরোপের অধিকাংশ দেশের তুলনায় অনেক কম।

এই কারণেই সরকার পরিবার ও ব্যবসাকে সহায়তা করার মতো আর্থিক সামর্থ্য রাখে বলে তিনি দাবি করেন।


অর্থনীতির গতি কমলেও ব্যয়ের পথে সরকার

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়।

সুইডিশ সরকার ইতিমধ্যেই ২০২৬ সালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে।

আগে যেখানে প্রবৃদ্ধি ২.৮ শতাংশ হবে বলে আশা করা হয়েছিল, এখন সেই পূর্বাভাস নামিয়ে ২.৩ শতাংশ করা হয়েছে।

অর্থাৎ একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার বিপুল পরিমাণ ব্যয় বৃদ্ধি করছে।

এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই সুইডেনে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক—এটি কি সত্যিই জ্বালানি সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, নাকি ভোটের আগে জনগণের মন জয়ের জন্য এক বিশাল নির্বাচনী প্যাকেজ?

১৩ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের ফলই হয়তো সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেবে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles