Home খবর প্রশান্ত বর্মন: ফাইল বিভ্রাট ও জামিনের উপাখ্যান

প্রশান্ত বর্মন: ফাইল বিভ্রাট ও জামিনের উপাখ্যান

0 comments 16 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: প্রশান্ত বর্মনের কাহিনী শুনলে আজকাল আর কেউ অবাক হন না। এ রাজ্যে অবাক হওয়ার ক্ষমতা বহুদিন আগেই সরকারি ফাইলে নথিভুক্ত হয়ে হারিয়ে গেছে। যে সমাজে পরীক্ষার খাতার চেয়ে সুপারিশপত্রের ওজন বেশি, যে প্রশাসনে অপরাধের গুরুত্ব বিচার হয় রাজনৈতিক উপযোগিতার নিরিখে, সেখানে প্রশান্ত বর্মন কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক যুগের প্রতীক। এক বিশেষ প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিনিধি মুখ।

জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি গভীর রাতে মদ্যপ অবস্থায় জনতার হাতে ধরা পড়েছিলেন। পুলিশ নয়, ধরেছিল সাধারণ মানুষ। এই তথ্যটিই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলার সাধারণ মানুষ ক্রমশ বুঝে নিচ্ছেন, অপরাধী ধরার প্রকৃত দায়িত্ব পুলিশের নয়। পুলিশের কাজ হল সঠিক সময়ে সঠিক ব্যক্তিকে না ধরা। আর যদি কখনও ভুলবশত কেউ ধরা পড়েও যায়, তাহলে নথি গায়েব, কাগজ অসম্পূর্ণ, চার্জশিট অপূর্ণ, ডায়েরি অনুপস্থিত, সাক্ষ্য অমিল — এই সুবিশাল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে সম্মানের সঙ্গে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

প্রশান্ত বর্মনের ক্ষেত্রেও তা-ই হল।

মানুষ খুনের অভিযোগ। চাকরি থেকে বরখাস্ত। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন। ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় মাত্র উনিশ নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ার বিস্ময়কর নজির। যে পরীক্ষায় সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা রাত জেগে পড়াশোনা করেন, কোচিং সেন্টারে বছরের পর বছর ব্যয় করেন, সেখানে প্রশান্তবাবু সম্ভবত উত্তরপত্রের বদলে অন্য কোনও যোগ্যতা জমা দিয়েছিলেন। উনিশ নম্বরেও যে প্রশাসনের দরজা খুলে যেতে পারে, তা তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন। শিক্ষাব্যবস্থায় যাঁরা মেধাতন্ত্রের কথা বলেন, তাঁদের এই ঘটনা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। কারণ এ ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মেধা নয়, ব্যবস্থার সঙ্গে সখ্যই এখানে আসল যোগ্যতা।

কিন্তু এতকিছুর পরেও শেষ রক্ষা হয়নি। কারণ এই প্রশাসনিক নাটকে শেষ দৃশ্যটি সবসময় সবচেয়ে চমকপ্রদ হয়। আদালতে মামলার প্রয়োজনীয় নথি সময়মতো পৌঁছল না। কী আশ্চর্য ঘটনা! যেন এই প্রথমবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হল রাজ্য। যেন ফাইল হারানো, রিপোর্ট দেরিতে পাঠানো, তদন্তের কাগজ যথাসময়ে না পৌঁছনো — এসব এ রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ নয়।

আসলে বাংলার সরকারি দপ্তরে ফাইলেরও এক ধরনের স্বাধীনতা আছে বলে মনে হয়। তারা ইচ্ছে হলে হাঁটে, ইচ্ছে হলে হারিয়ে যায়, কখনও ঘুমিয়ে পড়ে, কখনও ছুটিতে চলে যায়। কোনও কোনও ফাইল আবার রাজনৈতিক আবহাওয়া বুঝে আচরণ করে বলে অভিযোগ। বিরোধীর বিরুদ্ধে হলে প্রক্রিয়া দ্রুত এগোয়, আপনজনের ক্ষেত্রে হাঁপিয়ে পড়ে। প্রশান্ত বর্মনের ফাইল সম্ভবত অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তাই আদালতে পৌঁছতে পারেনি।

ফলাফল — জামিন।

এখানেই এই উপাখ্যানের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে। জনতা যাঁকে ধরে ফেলল, প্রশাসন তাঁকে বাঁচিয়ে দিল। বাংলা চলচ্চিত্রের এক উল্টো সংস্করণ। এখানে অভিযুক্তকে রক্ষা করতে গোটা সিস্টেম একজোট হয়ে যায়, আর সাধারণ মানুষ টেলিভিশনের পর্দার সামনে বসে ভাবতে থাকেন — “তা হলে এত নাটক হল কেন?”

বিচারব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হল, অভিযুক্ত দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ বলে গণ্য হবেন। এই নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনস্বীকার্য। কিন্তু বাংলার মানুষ আইনের বইয়ের পাশাপাশি ঘটনাপঞ্জিও পড়েন। তাঁরা লক্ষ করেন, কোন মামলায় পুলিশ বিদ্যুৎগতিতে সক্রিয় হয়, আর কোন মামলায় হঠাৎ টাইপিস্ট অসুস্থ হয়ে যান, গাড়ির টায়ার পাংচার হয়, সরকারি কৌঁসুলি ফাইল পান না, অথবা তদন্তকারী অফিসার হঠাৎ বদলি হয়ে যান।

এই রাজ্যে এখন অপরাধের চেয়েও বড় শিল্প হল অদক্ষতার অভিনয়। কেউ সরাসরি বলে না — “আমরা বাঁচাতে চাই।” তার বদলে সবাই এমনভাবে আচরণ করেন যেন তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সবকিছু ঠিক সময়ে হয়ে ওঠেনি। যেন গোটা প্রশাসনটাই একটি চিরস্থায়ী দুর্ঘটনার শিকার।

তবে এই দুর্ঘটনাগুলি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সেগুলি সবসময় নির্দিষ্ট ধরনের মানুষদের পক্ষেই ঘটে।

প্রশান্ত বর্মনের জামিন তাই কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি নয়। এটি একটি ব্যবস্থার প্রকাশ্য আত্মপ্রকাশ। এমন এক ব্যবস্থার, যেখানে জনতার ক্রোধ আছে, সংবাদমাধ্যমের সরব উপস্থিতি আছে, আদালতের পর্যবেক্ষণ আছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও একটি অদৃশ্য হাত সবকিছু আলগা করে দেয়। গিঁট খুলে যায়। কাগজ দেরিতে পৌঁছয়। মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যায়।

এ রাজ্যের সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা আজ বুঝে নিয়েছেন, পরীক্ষার হলে যতই নম্বর পাওয়া যাক, প্রকৃত প্রতিযোগিতা সেখানে নয়। সেই প্রতিযোগিতায় জেনারেল নলেজ আসে না, আসে “যোগাযোগ”, “সুরক্ষা”, “ঘনিষ্ঠতা”, “কার ফোন ধরতে হয়” — এই সব বিষয়। প্রশান্ত বর্মন সেই অলিখিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল স্নাতক বলেই মনে করছেন অনেকে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, আগামী কয়েকদিন টেলিভিশনের পর্দায় আবার গম্ভীর মুখে অনেকে বলবেন — “আইন আইনের পথে চলবে।” এই বাক্যটি বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে এখন এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কারণ আইন এখানে পথে চলে ঠিকই কিন্তু সে পথ এতটাই ঘুরপাক খায় যে শেষ গন্তব্য কোথায়, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন।

কখনও কখনও মনে হয়, এ রাজ্যে বিচারকের আদেশের চেয়ে ফাইলের ভাগ্য বেশি নির্ণায়ক। বিচারক আদেশ দেন, পুলিশ তদন্ত করে, আইনজীবী সওয়াল করেন কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে একটি কাগজের ওপর। সে সময়মতো পৌঁছবে কি পৌঁছবে না, তার ওপর নির্ভর করে ন্যায়বিচারের গতিপথ।

প্রশান্ত বর্মনের গল্প তাই কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলার প্রশাসনিক বাস্তবতার একটি জলন্ত দৃষ্টান্ত। এখানে অপরাধের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সিস্টেমের সঙ্গে অভিযুক্তের সম্পর্ক। জনতার হাতে ধরা পড়া যায়, সংবাদমাধ্যমে নিন্দিত হওয়া যায়, চাকরি খোয়ানো যায় কিন্তু যদি সময়মতো কাগজ না পৌঁছয়, তবে স্বাধীনতার দরজা আবার খুলে যেতে পারে।

বাংলার মানুষ এখন আর তীব্র ক্রোধও প্রকাশ করেন না। তাঁরা কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। কারণ তাঁরা জানেন, এই নাটকের স্ক্রিপ্ট বহু আগেই লেখা হয়ে গেছে। শুধু অভিনেতারা বদলে বদলে যায়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles