বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের নতুন সরকার গঠনের পরে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ছন্দ দেখা যায়। মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেন, তারপর দ্রুত পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা ঘোষণা করা হয়, যাতে প্রশাসনিক স্তরে ক্ষমতার হস্তান্তর সম্পূর্ণ হয় এবং রাজনৈতিক বার্তাও স্পষ্ট থাকে। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। মুখ্যমন্ত্রী-সহ মাত্র পাঁচজন মন্ত্রী শপথ নেওয়ার পরেও দুই সপ্তাহের বেশি সময় কেটে গেছে, অথচ বিজেপি এখনও পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেনি। এই বিলম্ব নিছক সাংগঠনিক শৈথিল্য নয়; বরং এর ভিতরে বহুস্তরীয় রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েন কাজ করছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

প্রথম কারণটি সম্ভবত গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের “ক্যাডারভিত্তিক শৃঙ্খলাবদ্ধ দল” হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে ক্ষমতায় এলে তারাও কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দলগুলির মতো একই ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে আক্রান্ত হয়। বিশেষ করে কোনও রাজ্যে প্রথমবার বা দীর্ঘ বিরতির পরে ক্ষমতায় এলে এই সমস্যা তীব্র হয়। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে— কে কতটা “আসল অবদানকারী”? কার রাজনৈতিক বিনিয়োগ কতটা? কে সংগঠনের পুরনো মুখ আর কে দিল্লির আশীর্বাদপুষ্ট নতুন নেতা?

বিজেপির ভিতরে সাধারণত তিন ধরনের শক্তিকেন্দ্র থাকে। প্রথমত, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ আদর্শবাদী সংগঠকরা; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী যন্ত্র হিসেবে কাজ করা বাস্তববাদী নেতারা; তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ব্যক্তিগত আস্থাভাজনরা। সরকার গঠনের সময়ে এই তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। মাত্র পাঁচজনকে নিয়ে প্রাথমিক শপথ করানো সম্ভবত সেই সংঘাত সাময়িকভাবে ঠেকানোর একটি উপায় ছিল। অর্থাৎ, “প্রথমে সরকার গঠন হোক, পরে দেখা যাবে”— এই ধরনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা।

দ্বিতীয় বড় কারণ হতে পারে জাতপাত, অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে জটিল সমীকরণ। বিজেপি আজ সর্বভারতীয় দল হলেও প্রতিটি রাজ্যে তার সামাজিক ভিত্তি আলাদা। কোথাও ওবিসি ভোট তার মেরুদণ্ড, কোথাও উচ্চবর্ণ, কোথাও আদিবাসী, কোথাও আবার শহুরে মধ্যবিত্ত। ফলে মন্ত্রিসভা গঠন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক মানচিত্রও। কোন অঞ্চল থেকে কতজন মন্ত্রী হবেন, কোন জাতিগোষ্ঠী কতটা প্রতিনিধিত্ব পাবে, সংখ্যালঘু মুখ থাকবে কি না, মহিলা মন্ত্রী কতজন— এই সব প্রশ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল।

ধরা যাক, কোনও গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল থেকে বিজেপি বিপুল সাফল্য পেয়েছে কিন্তু সেই অঞ্চলের উপযুক্ত মুখ কম। আবার কোথাও দল সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য সেখানকার প্রতিনিধিকে মন্ত্রী করতেই হবে। এই টানাপোড়েন প্রায়ই বিলম্ব ঘটায়। কারণ এক জনকে মন্ত্রী করা মানে অন্য দশ জনকে অসন্তুষ্ট করা।

তৃতীয় কারণ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ। বিজেপির বর্তমান সাংগঠনিক সংস্কৃতিতে রাজ্যস্তরের সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই দিল্লিনির্ভর। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রেই যেমন শেষ কথা কেন্দ্র বলে, তেমনই মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত কঠোর। ফলে রাজ্যের নেতা যাদের নিয়ে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ, কেন্দ্র হয়তো তাদের নিয়ে সন্দিহান। আবার কেন্দ্র যাদের চায়, মুখ্যমন্ত্রী হয়তো তাদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ বোধ করছেন না।

এই দ্বৈত ক্ষমতা কাঠামো প্রায়ই অচলাবস্থা তৈরি করে। বিশেষ করে যদি মুখ্যমন্ত্রী তুলনামূলকভাবে দুর্বল হন বা “সমঝোতার প্রার্থী” হিসেবে নির্বাচিত হন। তখন তিনি নিজের দলই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। দিল্লি আবার অপেক্ষা করে পরিস্থিতি বোঝার জন্য। ফলে সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে।

চতুর্থ কারণ প্রশাসনিক ও আইনি যাচাই। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিজেপি “দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন”-এর ভাবমূর্তি বজায় রাখতে সচেষ্ট। ফলে মন্ত্রী হওয়ার আগে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক সম্পর্ক, এমনকি অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্যও খতিয়ে দেখা হয়। কারণ একবার মন্ত্রী করার পরে যদি কোনও কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসে, তাহলে বিরোধীরা সেটিকে বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে।

এই কারণে অনেক সময় শেষ মুহূর্তে নাম বাদ পড়ে যায়। বিশেষ করে যদি রাজ্যে দলে ব্যাপক দলবদল ঘটে থাকে। বিরোধী দল থেকে আসা নেতাদের দ্রুত মন্ত্রী করলে পুরনো কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। আবার তাদের পুরোপুরি বাদ দিলেও নির্বাচনী বাস্তবতায় সমস্যা হয়। বিজেপি এখন বহু রাজ্যে “দলবদল-নির্ভর বিস্তার”-এর উপর নির্ভরশীল। ফলে বিশ্বস্ত পুরনো ক্যাডার বনাম নির্বাচনীভাবে কার্যকর নতুন মুখ— এই দ্বন্দ্ব মন্ত্রিসভা গঠনে জটিলতা তৈরি করে।

পঞ্চম কারণ হতে পারে বিজেপির বৃহত্তর জাতীয় কৌশল। অনেক সময় রাজ্য মন্ত্রিসভা শুধু রাজ্যের প্রয়োজন দেখে গঠন করা হয় না। সামনে যদি লোকসভা নির্বাচন, বিধান পরিষদ নির্বাচন, বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই থাকে, তাহলে মন্ত্রিসভার প্রতিটি পদকে ভবিষ্যতের নির্বাচনী বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়। কে কোন সম্প্রদায়ের কাছে কী বার্তা দেবে, কোন মুখ ভবিষ্যতে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে, কে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে উঠে আসতে পারে— এসবও বিবেচনায় থাকে।

এখানে আর একটি সূক্ষ্ম দিক আছে। বিজেপির রাজনীতিতে এখন ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে অত্যন্ত জনপ্রিয় বা স্বাধীন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি করতে পারে এমন নেতাদের নিয়ে কেন্দ্র প্রায়ই সতর্ক থাকে। একটি অসম্পূর্ণ মন্ত্রিসভা কখনও কখনও সেই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশলও হতে পারে। অর্থাৎ, সবাইকে অনিশ্চয়তায় রেখে কেন্দ্র নিজের কর্তৃত্ব অটুট রাখে।

ষষ্ঠ কারণ প্রশাসনিক পুনর্গঠন। নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে প্রায়ই দপ্তর পুনর্বিন্যাস করা হয়। কোন মন্ত্রক ভাগ হবে, কোনটি একত্রিত হবে, নতুন কোন দপ্তর তৈরি হবে— এসব নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চলে। বিশেষ করে বিজেপি এখন “গভর্ন্যান্স মডেল”কে রাজনৈতিক ব্র্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে তারা শুধু রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশ্নও সামনে রাখে। কিন্তু বাস্তবে দক্ষ, গ্রহণযোগ্য এবং রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ মুখ খুঁজে পাওয়া সবসময় সহজ নয়।

আরও একটি কারণ হতে পারে অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা ও গোয়েন্দা রিপোর্ট। বিজেপি নির্বাচনের পরে সাধারণত খুব দ্রুত বিস্তারিত পোস্ট-পোল অ্যানালিসিস করে। কোথায় কেন জিতল, কোথায় অসন্তোষ, কোন নেতা জনপ্রিয়, কার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে, এসব নিয়ে বিশদ রিপোর্ট তৈরি হয়। মন্ত্রিসভা গঠনের আগে সেই রিপোর্টের জন্যও অপেক্ষা করা হতে পারে।

এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়। বিরোধীরা ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলছে— বিজেপি কি সরকার চালানোর জন্য প্রস্তুত ছিল না? মুখ্যমন্ত্রীর কি নিজের দলেই নিয়ন্ত্রণ নেই? কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কি মতবিরোধ তৈরি হয়েছে? প্রশাসনিক স্তরেও এর প্রভাব পড়ে। কারণ পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলির কাজ ধীর হয়ে যায়। আমলাতন্ত্র তখন অপেক্ষার অবস্থায় থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

তবে বিজেপির সমর্থকেরা পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন যে তাড়াহুড়ো করে মন্ত্রিসভা গঠন করার চেয়ে সময় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সরকার তৈরি করাই ভাল। তাঁদের মতে, অতীতে অনেক রাজ্যে দ্রুত মন্ত্রী বানিয়ে পরে দুর্নীতি বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বিজেপি এবার সেই ভুল এড়াতে চাইছে।

কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা হল, ক্ষমতার প্রথম কয়েক সপ্তাহই সরকারের চরিত্র নির্ধারণ করে দেয়। যদি শুরুতেই অনিশ্চয়তা, বিলম্ব ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ইঙ্গিত দেখা যায়, তাহলে বিরোধীরা সেটিকে “দুর্বল সরকারের লক্ষণ” হিসেবে প্রচার করতে শুরু করে। ফলে বিজেপির সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ— একদিকে অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য রক্ষা, অন্যদিকে জনসমক্ষে স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী সরকারের ভাবমূর্তি বজায় রাখা।

সব মিলিয়ে, পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা গঠনে এই অস্বাভাবিক বিলম্ব সম্ভবত কোনও একক কারণে হয়নি। বরং এটি বিজেপির বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর এক জটিল প্রতিচ্ছবি যেখানে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সমীকরণ, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রশাসনিক সতর্কতা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল একসঙ্গে কাজ করছে। ক্ষমতায় ওঠার পরে বিজেপির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন আর বিরোধীদের মোকাবিলা নয়; বরং নিজেদের ভিতরের বহুস্বরকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সেটাই।