Home সংস্কৃতি ও বিনোদনসিনেমা ‘ডন ৩’ বিতর্ক: রণবীর বনাম ফারহান

‘ডন ৩’ বিতর্ক: রণবীর বনাম ফারহান

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পে সম্পর্ক ভাঙার শব্দ সাধারণত খুব ধীরে শোনা যায়। কেউ সরাসরি কিছু বলে না, সবাই “তারিখ সমস্যা”, “সৃজনশীল মতভেদ”, “পেশাগত সিদ্ধান্ত” — এই শব্দগুলোর আড়ালে সংঘাতকে নরম করে দেয়। কিন্তু কখনও কখনও এমন কিছু ঘটে, যখন শিল্পের নীরবতাই সবচেয়ে বড় বার্তা হয়ে দাঁড়ায়। রণবীর সিং এবং ফারহান আখতারের মধ্যে ‘ডন ৩’ ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান সংঘাত ঠিক সেই ধরনেরই এক ঘটনা।

বলিউডে বহু বিতর্ক এসেছে, বহু অভিনেতা ছবি ছেড়েছেন, বহু প্রযোজক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কিন্তু ফেডারেশন অফ ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িস বা এফডব্লিউআইসিই-এর তরফে সরাসরি “অসহযোগ নির্দেশিকা” জারি হওয়া ঘটনাটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। কারণ এটি কেবল একটি ছবি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা নয়; এটি শিল্পের ক্ষমতার ভারসাম্য, পেশাদারিত্বের ধারণা এবং তারকাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে এক বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বহু প্রতীক্ষিত ‘ডন ৩’। হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে ‘ডন’ শুধুমাত্র একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়; এটি এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। অমিতাভ বচ্চন থেকে শাহরুখ খা ঝুঁকি এবং একইসঙ্গে এক সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে।ন — এই চরিত্রের বিবর্তন ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। সেই জায়গায় নতুন প্রজন্মের ‘ডন’ হিসেবে রণবীর সিংকে ঘোষণা করা হয়েছিল এক বিরাট

রণবীরের মধ্যে ছিল এনার্জি, অস্থিরতা, স্টাইল এবং স্ক্রিনে বিস্ফোরক উপস্থিতি। অন্যদিকে ফারহান আখতারের ছিল আধুনিক আরবান থ্রিলার নির্মাণের অভিজ্ঞতা। ফলে শিল্পের এক বড় অংশ বিশ্বাস করেছিল, এই জুটি হয়তো ‘ডন’ ফ্র্যাঞ্চাইজিকে নতুন যুগে নিয়ে যেতে পারবে।

কিন্তু সেই স্বপ্নই এখন ভাঙনের মুখে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ছবির শুটিং শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে রণবীর সিং হঠাৎ সরে দাঁড়ান। প্রযোজনা সংস্থা এক্সেল এন্টারটেইনমেন্ট দাবি করেছে, ততদিনে প্রায় ৪৫ কোটি টাকার প্রি-প্রোডাকশন খরচ হয়ে গিয়েছিল। এই অর্থ কেবল  সেট ডিজাইন বা লোকেশন বুকিংয়ে নয়; আন্তর্জাতিক অ্যাকশন টিম, কস্টিউম, স্টাইলিং, প্রিভিজ্যুয়ালাইজেশন, স্ক্রিপ্ট ওয়ার্কশপ, বিদেশি টেকনিশিয়ান—সব মিলিয়ে এক বিশাল প্রস্তুতির অংশ ছিল।

আজকের বলিউডে একটি বড় বাজেটের ছবি শুরুর আগেই কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে যায়। বিশেষত ‘ডন ৩’-এর মতো ধারাবাহিক চলচ্চিত্রে প্রি-প্রোডাকশনই আসল যুদ্ধ। কারণ দর্শক কেবল গল্প নয়, স্কেলও দেখতে চায়। ফলে নায়ক বদলে গেলে পুরো কনসেপ্টই নতুন করে ভাবতে হয়।

এই জায়গাতেই ফারহান আখতারের ক্ষোভকে শিল্পের অনেকেই “ব্যক্তিগত অপমান” হিসেবে দেখছেন। কারণ রণবীরের কাস্টিংকে ঘিরে প্রথম দিন থেকেই প্রবল বিতর্ক ছিল। শাহরুখ খানের জায়গায় নতুন অভিনেতাকে বসানো সহজ কাজ ছিল না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছিল, ভক্তদের একাংশ তীব্র আপত্তিও জানিয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে ফারহান প্রকাশ্যে রণবীরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

অথচ এখন অভিযোগ উঠছে, সেই অভিনেতাই শেষ মুহূর্তে প্রজেক্ট ছেড়ে দিয়েছেন।

এফডব্লিউআইসিই-এর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই ধরনের বিরোধ গোপনে মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়। কিন্তু সংগঠনটির তরফে বারবার নোটিস পাঠানোর পরেও রণবীর সিং সাড়া দেননি বলে অভিযোগ। এবং সেই কারণেই অসহযোগ নির্দেশিকা বা নন-কোঅপারেশন ডিরেক্টিভ জারি হয়েছে।

এই নির্দেশের অর্থ অত্যন্ত গুরুতর। এর মানে শিল্পের বিভিন্ন কর্মী সংগঠন অভিনেতার সঙ্গে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদিও বাস্তবে এই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কতটা কার্যকর হয় তা নিয়ে বিতর্ক আছে, কিন্তু প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। এটি কার্যত শিল্পের তরফে প্রকাশ্য ভর্ৎসনা।

এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল বলিউডের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা। গত কয়েক বছরে হিন্দি ছবির বাজার ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে গেছে। বহু বড় বাজেটের ছবি চলচ্চিত্র মুক্তির পরে ব্যর্থ হয়েছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দর্শকের অভ্যাস বদলে দিয়েছে। প্রযোজকরা এখন তারকাদের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন “বিশ্বাসযোগ্যতা”-কে।

একজন অভিনেতা শেষ মুহূর্তে ছবি ছেড়ে দিলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না; গোটা অর্থায়ন কাঠামো কেঁপে ওঠে। বিমা, বিতরণ, ব্র্যান্ড চুক্তি — সবকিছু নতুন করে ভাবতে হয়।

এই কারণেই অশোক পণ্ডিতের মতো প্রবীণ সংগঠকরা প্রকাশ্যে রণবীরের আচরণের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত তারকাখ্যাতির চেয়ে শিল্পের সমষ্টিগত স্বার্থ বড়।

তবে গল্পের অন্য দিকও রয়েছে।

রণবীর সিংয়ের কেরিয়ার গত কয়েক বছরে অদ্ভুত ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গেছে। একসময় তিনি ছিলেন বলিউডের সবচেয়ে বিস্ফোরক তারকা — ‘বাজিরাও মস্তানি’, ‘পদ্মাবৎ’, ‘গাল্লি বয়’-এর মতো ছবিতে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছিলেন এক বিরল অভিনেতা হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর কয়েকটি ছবি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। শিল্পের ভিতরে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, তিনি নিজের ভাবমূর্তি এবং প্রজেক্ট বাছাই নিয়ে নতুন করে ভাবছিলেন।

‘ডন ৩’ নিয়ে দর্শকের প্রতিক্রিয়াও পুরোপুরি ইতিবাচক ছিল না। শাহরুখ খানের বিশাল জনপ্রিয়তার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন। ফলে হয়তো রণবীর অনুভব করেছিলেন, এই ঝুঁকি তাঁর কেরিয়ারের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

প্রশ্ন হল, কোনও অভিনেতার কি ছবি ছেড়ে দেওয়ার অধিকার নেই?

অবশ্যই আছে। সিনেমা একটি সৃজনশীল মাধ্যম, এবং অভিনেতা কোনও প্রজেক্টে স্বচ্ছন্দ না হলে সরে দাঁড়াতেই পারেন। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় সময় এবং পদ্ধতি নিয়ে। যদি সত্যিই শুটিং শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়ে থাকে, তাহলে প্রযোজকদের ক্ষোভ অস্বাভাবিক নয়।

বলিউডের ইতিহাসে এরকম ঘটনা নতুন নয়। বহুবার তারকারা শেষ মুহূর্তে প্রকল্প ছেড়েছেন। কখনও স্বাস্থ্যগত কারণ, কখনও পারিশ্রমিক, কখনও সৃজনশীল মতবিরোধ — কারণ নানা রকম। কিন্তু বর্তমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই ধরনের সংঘাত আর স্টুডিওর দেওয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিটি খবর মুহূর্তে জনসমক্ষে চলে আসে, এবং তার সঙ্গে তৈরি হয় জনমত।

এই ঘটনাতেও সেটাই হয়েছে।

একদিকে রণবীর সিংয়ের সমর্থকেরা বলছেন, একজন অভিনেতাকে জোর করে কোনও ছবিতে রাখা যায় না। অন্যদিকে ফারহান আখতারের সমর্থকেরা বলছেন, পেশাদার দায়বদ্ধতা বলে একটা বিষয় আছে।

আসলে এই সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বলিউডের এক গভীর সংকট সামনে এসেছে — তারকা বনাম ব্যবস্থা।

একসময় বলিউড পুরোপুরি তারকাকেন্দ্রিক ছিল। মহাতারকা যা চাইতেন, সেটাই হত। কিন্তু এখন কর্পোরেট স্টুডিও, আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিং এবং সংগঠিত প্রোডাকশন সিস্টেমের যুগে অভিনেতাদের উপরেও দায়বদ্ধতার চাপ বেড়েছে।

এফডব্লিউআইসিই-এর এই পদক্ষেপ সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক। তারা যেন বলতে চাইছে — “তারকা” হলেও নিয়মের বাইরে কেউ নন।

তবে বাস্তব ছবিটা আরও জটিল। কারণ বলিউড শেষ পর্যন্ত সম্পর্কের ইন্ডাস্ট্রি। আজকের শত্রু আগামী দিনের সহকর্মী। ফলে এই সংঘাত আদালত বা সংগঠনের বৈঠকের টেবিলে যতটা চলছে, তার চেয়ে বেশি চলছে ফোন কল, ব্যক্তিগত আলোচনা এবং বন্ধ দরজার আড়ালে।

ফারহান আখতার এবং রণবীর সিং — দু’জনেই আধুনিক বলিউডের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। একজন নির্মাতা হিসেবে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন, অন্যজন অভিনয়ের তীব্রতা দিয়ে এক প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছেন। ফলে এই সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে গেলে ক্ষতি দু’পক্ষেরই।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন ‘ডন ৩’-এর ভবিষ্যৎ। নতুন নায়ক কে হবেন? প্রজেক্ট কি পিছিয়ে যাবে? নাকি সম্পূর্ণ নতুনভাবে তৈরি হবে?

কিন্তু তার থেকেও বড় প্রশ্ন — এই ঘটনা কি বলিউডে নতুন এক নজির তৈরি করবে?

কারণ যদি সত্যিই সংগঠনগুলি এই ধরনের ঘটনায় কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে তারকারা প্রজেক্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর আগে অনেক বেশি সতর্ক হবেন। আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে, অভিনেতার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসরও সংকুচিত হতে পারে।

অর্থাৎ ‘ডন ৩’-এর এই বিতর্ক আসলে কেবল একটি সিনেমার সংকট নয়। এটি এমন এক মুহূর্ত, যেখানে বলিউড নিজের ভবিষ্যৎ চরিত্র নিয়ে লড়াই করছে —সুপারস্টারের যুগ কি এখনও আগের মতোই অক্ষত থাকবে, নাকি ইন্ডাস্ট্রি ধীরে ধীরে আরও সংগঠিত, আরও চুক্তিনির্ভর এক ব্যবস্থার দিকে এগোবে?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এখনই মিলবে না। কিন্তু আপাতত মুম্বইয়ের  মুম্বইয়ের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে একটা বিষয় স্পষ্ট—‘ডন ৩’ এখনও তৈরি হয়নি, অথচ তার নাটক ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles