বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিম এশিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি ঘোষণাই গোটা অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ইরান নীতিগতভাবে তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছে— এই খবর ঠিক তেমনই এক মুহূর্তের ইঙ্গিত বহন করছে। যদি এই চুক্তি বাস্তবে রূপ পায়, তবে তা শুধু তেহরান আর ওয়াশিংটনের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খুলবে না; বদলে যেতে পারে উপসাগরীয় রাজনীতি, জ্বালানি বাজার, এমনকি বিশ্ব কূটনীতির গতিপথও।
প্রায় দুই দশক ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল। পশ্চিমা শক্তির অভিযোগ ছিল, শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি কর্মসূচির আড়ালে ইরান আসলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। তেহরান বরাবরই সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য— ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের সার্বভৌম অধিকার এবং তা কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতি সবসময় ঘোষণার চেয়ে জটিল। গত কয়েক বছরে ইরান যে মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, তা আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল। কারণ ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রযুক্তিগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার সমতুল্য। অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম সাধারণত ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ হয়। অর্থাৎ একবার ৬০ শতাংশে পৌঁছে গেলে পরবর্তী ধাপ আর খুব দীর্ঘ থাকে না।
এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকার মধ্যস্থতায় ইরানের এই নীতিগত সম্মতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি কেবল পারমাণবিক প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পশ্চিম এশিয়ায় সামগ্রিক উত্তেজনা হ্রাসের বৃহত্তর পরিকল্পনা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে যায়। ইরান ও আমেরিকার সংঘাত যখনই বেড়েছে, তখনই হরমুজে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। বিশ্ববাজারে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
যদি এই চুক্তির ফলে হরমুজে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তবে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হতে পারে। ইউরোপ ও এশিয়ার জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলি কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। ভারতও তার মধ্যে অন্যতম।
কারণ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলির একটি। উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লেই ভারতের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ার মাধ্যমে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ফলে ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের এই সম্ভাব্য সমঝোতা ভারতের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এই সমঝোতার পিছনে শুধুই শান্তির আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে এমন ভাবলে ভুল হবে। এর পিছনে রয়েছে কঠোর বাস্তব রাজনীতি।
ইরান আজ প্রবল অর্থনৈতিক চাপে। দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তাদের অর্থনীতিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তেলের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ। দেশের মুদ্রার মূল্য ভেঙে পড়েছে। যুবসমাজের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কমানো ইরানের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন।
অন্যদিকে আমেরিকারও প্রয়োজন ছিল পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আনা। বিশেষত দীর্ঘ যুদ্ধ, প্রক্সি সংঘর্ষ এবং সামুদ্রিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলছিল। ওয়াশিংটন বুঝেছে, শুধুমাত্র সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কূটনৈতিক পথেই স্থায়ী সমাধানের সম্ভাবনা বেশি।
এখানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই এক জটিল ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে। একদিকে তাদের সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও সীমান্ত ও কৌশলগত বাস্তবতা। ফলে পাকিস্তান নিজেকে এমন এক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে তারা উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম।
এই চুক্তি সফল হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারে পশ্চিম এশিয়ার পুরনো শত্রুতা-নির্ভর রাজনীতি। বহুদিন ধরে এই অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্য দাঁড়িয়ে ছিল ভয়, অবিশ্বাস এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল সেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। এখন যদি তেহরান সত্যিই তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করে, তাহলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং অন্যান্য উপসাগরীয় শক্তির নিরাপত্তা-হিসেবও বদলে যাবে।
অবশ্য সংশয়ও কম নয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— “নীতিগত সম্মতি” বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে? ইউরেনিয়াম কোথায় যাবে? আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা International Atomic Energy Agency কীভাবে তা যাচাই করবে? ইরান ভবিষ্যতে আবার সমৃদ্ধকরণ শুরু করবে না, তার নিশ্চয়তা কী? আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা কতটা শিথিল করবে? ইজরায়েল এই সমঝোতাকে কীভাবে দেখছে?
বিশেষত ইজরায়েল বহু বছর ধরেই দাবি করে এসেছে যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ফলে তেল আভিভ এই চুক্তিকে সন্দেহের চোখে দেখতেই পারে। আবার আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই চুক্তি বিতর্ক তৈরি করতে পারে। রিপাবলিকান শিবিরের একাংশ বরাবরই মনে করে, ইরানের সঙ্গে আপস করা মানে তাদের আরও শক্তিশালী করে তোলা।
তবু সমস্ত সংশয়ের মধ্যেও এই ঘটনাকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনও কখনও প্রতীকী পরিবর্তনই বাস্তবতার ভিত্তি তৈরি করে। কয়েক মাস আগেও যে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম মজুতকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছিল, আজ তারাই আলোচনার টেবিলে বসে তা ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত সম্মতি দিচ্ছে— এই পরিবর্তন নিজেই এক বিরাট বার্তা।
পশ্চিম এশিয়া বহুদিন ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, গৃহসংঘর্ষ এবং ভূ-কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিল। সেই অঞ্চলে যদি কূটনীতির নতুন পরিসর তৈরি হয়, তবে তা শুধু আঞ্চলিক শান্তির জন্য নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখন নজর থাকবে একটাই প্রশ্নে— এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনা কি বাস্তব চুক্তিতে পরিণত হবে, নাকি আবারও অবিশ্বাসের পুরনো অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?