জেফ্রি আর্চার: কৈশোর থেকে যৌবনের অনিবার্য সঙ্গী

যা জানা জরুরি
- অঙ্কিতা সেনাপতি: “We all make mistakes but one has to move on.” জেফ্রি আর্চারের এই কথাটি তাঁর কোনও উপন্যাসের চরিত্রের মুখে বসালেও বেমানান লাগত…
- কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথাটি যেন সবচেয়ে বেশি সত্যি হয়ে রইল তাঁর নিজের জীবনেই।
- ভুল করেছেন, হেরেছেন, বিতর্কে জড়িয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন, জেলেও গিয়েছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
জেফ্রি আর্চারের এই কথাটি তাঁর কোনও উপন্যাসের চরিত্রের মুখে বসালেও বেমানান লাগত না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথাটি যেন সবচেয়ে বেশি সত্যি হয়ে রইল তাঁর নিজের জীবনেই। ভুল করেছেন, হেরেছেন, বিতর্কে জড়িয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন, জেলেও গিয়েছেন। তারপর আবার লিখতে বসেছেন। যেন জীবনে যা-ই ঘটুক, পরের পৃষ্ঠাটা উল্টে ফেলতেই হবে।
ঠিক বাস্তবের আর্চারের মতোই।৫ অক্টোবর, ৮৬ বছর বয়সে থেমে গেল সেই জীবন। মৃত্যুর ঘটনাটিও আশ্চর্য ভাবে যেন তাঁরই লেখা কোনও উপন্যাসের শেষ অধ্যায়—নিজের বাড়িতে লেখালেখির মধ্যেই চলে গেলেন জেফ্রি আর্চার, তাঁর শেষ উপন্যাস প্রকাশের ঠিক এক দিন আগে।আর্চারের মতো জীবনের জন্য এর চেয়ে আর্চারসুলভ শেষ সম্ভবত লেখা কঠিন।
দৌড়টা শুরু হয়েছিল সত্যিই দৌড় দিয়ে

জেফরি আর্চার (৩ নম্বর জার্সি পরিহিত)
অক্সফোর্ডে তিনি অ্যাথলেটিকসে ‘ব্লু’ অর্জন করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেটিকস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। ১৯৬৬ সালে ১০০ ইয়ার্ড দৌড়ে গ্রেট ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্বও করেছিলেন।
তাঁর পরের জীবনটির দিকে ফিরে তাকালে ঘটনাটি যেন বেশ মানানসই মনে হয়।
আর্চার আসলে কোনও দিনই ধীরে চলার মানুষ ছিলেন না। তিনি দ্রুত উঠতে চেয়েছেন। আরও উপরে যেতে চেয়েছেন। সামনে কেউ থাকলে তাকে টপকে যেতে চেয়েছেন। খেলাধুলা থেকে রাজনীতি, রাজনীতি থেকে ব্যবসা, ব্যবসায় বিপর্যয় থেকে সাহিত্য—এক দৌড় শেষ হলেই যেন আর একটি শুরু হয়েছে।
সাধারণ পরিবারে জন্ম। বাবা কার্যত অনুপস্থিত, সাংবাদিক মা-ই তাঁকে বড় করেন। বৃত্তি পেয়ে ভর্তি হন সমারসেটের নামী ওয়েলিংটন স্কুলে, পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। জন্ম যা দিতে পারেনি, বুদ্ধি আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দিয়ে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু খুব তাড়াতাড়িই।
সম্ভবত নিজের সেই শুরুর জীবন থেকেই তিনি পরে লিখেছিলেন,
“Sometimes it’s an advantage to be disadvantaged.”
অক্সফোর্ডে পড়ার সময়ই তাঁর আর একটি ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মানুষকে রাজি করানো।
তিনি দাতব্য সংস্থার জন্য টাকা তুলতেন। অক্সফ্যামের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে এমনকি দ্য বিটলসকেও বিশ্ববিদ্যালয়ে আনতে পেরেছিলেন। পোস্টারে লেখা ছিল, “Jeffrey Archer presents The Beatles in concert.”
আর্চারের বন্ধু শেরিডান মর্লি পরে স্মৃতিচারণ করেছিলেন, রিঙ্গো স্টার নাকি আর্চার সম্পর্কে বলেছিলেন, “লোকটাকে আমার মন্দ লাগেনি, তবে ও এমন লোক, যে তোমার মূত্র বোতলে ভরে বেচে দেবে।” অতিরঞ্জন হোক বা না হোক, আর্চারের অসামান্য আত্মপ্রচার, ব্যবসায়িক প্রবৃত্তি এবং সুযোগ চিনে নেওয়ার ক্ষমতার এক চমৎকার সারাংশ ছিল কথাটি।
সংসদ থেকে দেউলিয়া, দেউলিয়া থেকে বেস্টসেলার
একটি কানাডীয় বিনিয়োগে বিপুল টাকা হারিয়ে কার্যত দেউলিয়া হয়ে গেলেন আর্চার, ছাড়তে হল সংসদও। অনেকের জীবনেই এমন একটি ঘটনা দীর্ঘ ছায়া ফেলে যায়। আর্চারের ক্ষেত্রে সেই আর্থিক বিপর্যয়ই খুলে দিল নতুন দরজা। দেনা শোধ করার প্রয়োজনেই তিনি লিখতে শুরু করেন।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় Not a Penny More, Not a Penny Less। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাসই তাঁকে আর্থিক বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার রাস্তা দেখায়। জীবন তাঁকে যা দিয়ে আঘাত করেছিল, সেটাকেই তিনি গল্পে বদলে বিক্রি করলেন।
এই প্যাটার্নটি তাঁর জীবনে বারবার ফিরে এসেছে। সংসদীয় অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে First Among Equals। সাহিত্য আর কেলেঙ্কারি চিরকালের মতো জড়িয়ে গেল, একটিকে অন্যটি ছাড়া দেখা প্রায়ই অসম্ভব।

রাজনীতিও অবশ্য তাঁকে ছাড়েনি। পরে তিনি হন কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি চেয়ারম্যান, ১৯৯২ সালে লাইফ পিয়ার হয়ে ঢোকেন হাউস অব লর্ডসে। তাঁর স্বল্পস্থায়ী রাজনৈতিক কেরিয়ারের পিছনে ছিলেন প্রয়াত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার, জীবনের সেই শক্তিময়ী নারীদের একজন, যাঁদের কাছে আর্চার নিজের ঋণ মানতেন।
আর্চার লিখেছিলেন,
“We all suffer in our different ways from being prisoners of birth.”
রাজনৈতিক বিষয়বস্তু-সম্বলিত ‘ফার্স্ট অ্যামং ইকুয়ালস’ (First Among Equals) বইটির মাধ্যমেই রাজনীতিতে ফিরে আসার ব্যাপারে আর্চারের তীব্র আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

মার্গারেট থ্যাচার ও আর্চার
১৯৮৫ সালে তিনি সেই সুযোগটি পেয়ে যান; মার্গারেট থ্যাচার তাঁর কর্মস্পৃহা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কনজারভেটিভ পার্টির ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈতনিক দায়িত্ব প্রদান করেন, যার মূল কাজ ছিল তহবিল সংগ্রহ করা।
তবে এই দায়িত্বের মেয়াদ ছিল মাত্র এক বছর।
ভোর ছ’টার লেখক
গল্প বানানোতেও একই নিয়ম। প্রায়ই আগে শেষটা ঠিক করে তিনি পিছন দিকে প্লট সাজাতেন। তাই তাঁর টুইস্টগুলো এলোমেলো লাগত না। শেষ পাতায় পাঠক অবাক হতেন, কিন্তু পিছনে তাকালে দেখতেন, সূত্রগুলো তো ছিলই। নিজের জীবনও তিনি এভাবেই কাটিয়েছেন। প্রতিটি বিপর্যয়ের পর ভাবতেন না, সব শেষ। ভাবতেন, এখান থেকে পরের গল্পে যাওয়া যায় কী করে।
ধূসর মানুষ
“I have discovered with advancing years that few things are entirely black or white, but more often different shades of grey.”
এক ট্যাবলয়েড তাঁর বিরুদ্ধে এক নারীকে যৌনতার জন্য অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছিল। আর্চার মানহানির মামলা করেন এবং জেতেন।
কিন্তু গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।
বহু বছর পরে প্রমাণিত হয়, সেই মামলায় তিনি মিথ্যা বলেছেন এবং ভুয়ো অ্যালিবাই তৈরি করেছিলেন। ২০০১ সালে মিথ্যা সাক্ষ্য এবং বিচারপ্রক্রিয়া বিকৃত করার ষড়যন্ত্রের দায়ে তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় দু’বছর জেলে কাটান।
খ্যাতিমান রাজনীতিক। যৌন কেলেঙ্কারি। আদালতে জয়। বহু বছর পরে সেই জয়ের ভিত ভেঙে পড়া। শেষে কারাবাস।
আর্চার নিজে লিখলে হয়তো প্লটটিকে কেউ কেউ ‘অতিরিক্ত নাটকীয়’ বলতেন।
যাঁরা অন্ধকার সময়ে এগিয়ে আসেন

লর্ড ও লেডি আর্চার
আর্চার লিখেছিলেন,
“Some people stand by you in your darkest hour while others walk away; only a select few march towards you and become even closer friends.”
কারাগারেও আর্চার গল্প খুঁজে পেয়েছিলেন। জেলের অভিজ্ঞতা থেকে লিখলেন তিন খণ্ডের A Prison Diary: Hell, Purgatory আর Heaven। তিনি যেন কোনও অভিজ্ঞতাকেই নষ্ট হতে দিতেন না। তাঁর আর একটি কথা ছিল, “Sometimes an abundance of sympathy can be more overwhelming than solitude.” তিনি করুণার মানুষ হতে চাননি। তিনি কাজে ফিরতে চেয়েছিলেন।
যে আর্চারকে পাঠক চিনতেন
তিনি সেই মানুষ, যাঁর বই রাতে ‘আর একটু পড়ে রাখি’ বলতে বলতে ভোর হয়ে যেত।
Kane and Abel; Not a Penny More, Not a Penny Less; First Among Equals; Honour Among Thieves; A Quiver Full of Arrows; পরে Clifton Chronicles—একটির পর একটি বই।
সাহিত্যসমালোচকেরা তাঁর ভাষাকে খুব উঁচু আসন না-ও দিতে পারেন। কিন্তু পাঠককে পরের পৃষ্ঠা উল্টে যেতে বাধ্য করার একটি ক্ষমতা তাঁর ছিল।
এবং জনপ্রিয় সাহিত্যে সেই ক্ষমতা মোটেই ছোট জিনিস নয়।
আমাদের মতো, ইংরেজি যাঁদের মাতৃভাষা নয়, তাঁদের কাছে তাঁর বইয়ের নামও কখনও কখনও ছোট আবিষ্কার ছিল।
First Among Equals বা Honour Among Thieves-এর মতো শব্দবন্ধ অনেকে প্রথম চিনেছিলেন তাঁর মলাটেই। A Quiver Full of Arrows-এর নামে ছিল আলাদা এক টান। আর Shall We Tell the President? – এর মতো এত অন্তরঙ্গ অথচ এত উচ্চাভিলাষী শিরোনাম আর কটা আছে!
ভারতের রাস্তায় জেফ্রি আর্চার
শেষ টুইস্ট
জীবন তাঁকে দেউলিয়া করেছে, তিনি লিখেছেন। রাজনীতি ভেঙে পড়েছে, তিনি লিখেছেন। জেলে গিয়েছেন, সেখান থেকেও বই লিখেছেন। বয়স হয়েছে, তবু ভোরে উঠে হাতে লিখেছেন। হয়তো সে কারণেই তাঁর একটি ছোট্ট বাক্য এত বড় হয়ে ওঠে:
“We all make mistakes but one has to move on.”
মৃত্যুও যেন তাঁর জন্য শেষ একটি টুইস্ট জমিয়ে রেখেছিল। শেষ বই প্রকাশের মাত্র এক দিন আগে তিনি চলে গেলেন। বইটির নাম, Adam and Eve।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



