ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত সংস্করণ সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন করেনি। সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের আর্জি জানিয়ে দায়ের হওয়া একটি মামলার শুনানিতে এ কথা স্পষ্ট করে দিলেন ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।

প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, গত সপ্তাহেই ভারতের নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল, কয়েকটি রাজ্যে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনলাইন ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যুক্ত নতুন ঘোষণাপত্রটি সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদিত।

ফর্ম ৬-এর নতুন ঘোষণাপত্রে পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরে। তাঁদের বক্তব্য ছিল, কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি সংশোধন না করলে এই পরিবর্তন করা যায় না। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করেই নতুন ঘোষণাপত্র কার্যকর করা হয়েছে। এর পরে ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তাতে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে, বিহারের এসআইআর-সংক্রান্ত মামলায় ২০২৬ সালের মে মাসে দেওয়া রায়ে সুপ্রিম কোর্ট ফর্ম ৬-এর এই ঘোষণাপত্রকে বৈধ বলে মেনে নিয়েছে।

কিন্তু বিহারের এসআইআর মামলার রায়ে নতুন ঘোষণাপত্রটি পরীক্ষা করার কোনও সুযোগই সুপ্রিম কোর্টের ছিল না। কারণ, ওই রায় ঘোষণার পরেই সেটি চালু করা হয়েছিল। ‘লাইভল’ আগেই একটি নিবন্ধে এই বিষয়টি তুলে ধরেছিল।

সোমবার প্রধান বিচারপতি বিষয়টি স্পষ্ট করে দেন।

দিল্লির এসআইআর প্রক্রিয়ায় ফর্ম ৬-এর নতুন ঘোষণাপত্র ব্যবহার নিয়ে প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী উদ্বেগ প্রকাশ করলে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, “ফর্ম ৬-এর কোনও পরিবর্তিত সংস্করণ আমরা অনুমোদন করিনি। বিষয়টি পরিষ্কার থাকা দরকার। নথি পেশ করা হলে আমরা দেখতে চাইব, কে এই পরিবর্তন করেছেন।”

নতুন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে জানাতে হবে, আগের এসআইআর-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে তাঁর নিজের অথবা তাঁর বাবা-মায়ের নামের ‘ম্যাপিং’ বা যোগসূত্র স্থাপন করা হয়েছিল কি না। অন্য রাজ্যগুলির এসআইআরে আগে ব্যবহৃত ফর্ম ৬-এ এই তথ্য জানাতে হত না।

প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ আইনজীবী শৈলেন্দ্রমণি ত্রিপাঠীর দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি করছিল। আবেদনে একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা ১৪টি সিদ্ধান্ত বাতিলের আর্জি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনও বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন অথবা বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের দাবি করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সেই তদন্তে সহায়তা করার কথাও বলা হয়েছে।

আবেদনকারী আরও আর্জি জানিয়েছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ, তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না এবং সরকারি দায়িত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগে দায়ী বলে চিহ্নিত অন্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নথিভুক্ত করে ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু করতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হোক। এ ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ নম্বর ধারার উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ধারায় ভোটার তালিকা প্রস্তুত, সংশোধন বা ত্রুটি সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত সরকারি দায়িত্বের নির্দিষ্ট কিছু লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি মেনকা গুরুস্বামীকে বলেন, আবেদনে একসঙ্গে বহু ধরনের প্রতিকার চাওয়া হয়েছে এবং দাবিগুলি ‘এলোমেলো’ বলে মনে হচ্ছে। তবে গুরুস্বামী জানান, আবেদনে জানানো দাবিগুলির পক্ষে তিনি অনড় রয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত বেঞ্চ এই আবেদনে নোটিস জারি করে এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানানো একই ধরনের আর একটি মামলার সঙ্গে এটি যুক্ত করে দেয়।