বাণিজ্যে আটকে ভারত-আমেরিকা

যা জানা জরুরি
- ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নতুন করে দাবি তোলা বা আরও ছাড় দেওয়া—দুই পক্ষের কাছেই কঠিন।
- সোমবার, ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে এমনটাই জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন।
- তাঁর বক্তব্য, সমঝোতার সামান্য সুযোগও যদি বাকি থাকে, তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে দু’পক্ষই।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারত ও আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে দরকষাকষি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নতুন করে দাবি তোলা বা আরও ছাড় দেওয়া—দুই পক্ষের কাছেই কঠিন। তবে আলোচনা থেমে যায়নি। সোমবার, ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে মিউনিখ লিডার্স মিটিংয়ে এমনটাই জানালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। তাঁর বক্তব্য, সমঝোতার সামান্য সুযোগও যদি বাকি থাকে, তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে দু’পক্ষই।
সীতারামন বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তি নিয়ে দীর্ঘ এবং কঠিন আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনও চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছনো যায়নি। তাঁর কথায়, আলোচনা আপাতত এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ‘দেওয়া-নেওয়া’র পরিসর খুবই সীমিত। ফলে দ্রুত চুক্তি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তাতে কিছুটা ধাক্কা লাগল। এর আগে আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারও জানিয়েছিলেন, ভারতের সঙ্গে চুক্তি অবিলম্বে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
দরকষাকষির কেন্দ্রে রয়েছে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার পণ্য বাণিজ্যে নয়াদিল্লির উদ্বৃত্ত রয়েছে—অর্থাৎ আমেরিকা থেকে ভারত যত পণ্য আমদানি করে, তার চেয়ে বেশি পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে। ওয়াশিংটন সেই ঘাটতি কমাতে চাইছে। সীতারামনের বক্তব্য, মার্কিন পক্ষ অতীতের এই ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যেই আলোচনায় আরও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে।
বৈদেশিক বাণিজ্য দপ্তরের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষে ভারত ও আমেরিকার পণ্য বাণিজ্যের মোট পরিমাণ ছিল ১৪০.৭৭ বিলিয়ন ডলার। ভারতের রফতানি ৮৭.৩১ বিলিয়ন এবং আমদানি ৫৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ৩৩.৮৬ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবর্ষে এই উদ্বৃত্ত ছিল ৪০.৮৯ বিলিয়ন ডলার। ব্যবধান কমেছে ঠিকই, কিন্তু বাণিজ্যের পাল্লা এখনও ভারতের দিকেই ঝুঁকে।
এই বাণিজ্য ঘাটতিই কেন আলোচনায় এত গুরুত্বপূর্ণ, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, আমেরিকা এখন শুল্ককে বাণিজ্য আলোচনায় চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অতীতে শুল্ক নিয়ে দরকষাকষির পাশাপাশি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, আমদানির বাধা কমানো এবং দুই পক্ষের সুবিধা মিলিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা হত। এখন সেই কাঠামো থাকলেও শুল্ক বাড়িয়ে বাণিজ্যের ভারসাম্য বদলানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে তাঁর বক্তব্য।
এ প্রসঙ্গে চিনের সঙ্গে ভারতের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির উদাহরণও টেনেছেন সীতারামন। তাঁর দাবি, ২০১৪ সালের পর এই ঘাটতি উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন তুলেছেন—ভারত যদি বাণিজ্য ভারসাম্যকে এতটাই গুরুত্ব দেয়, তা হলে চিনের ক্ষেত্রেও কি একই ভাবে শুল্ককে চাপ তৈরির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত? তাঁর বক্তব্য, ঘাটতি কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পথ হল আলোচনা এবং পারস্পরিক সমঝোতা। কোনও দেশের সঙ্গে ঘাটতি থাকলেই তার বিরুদ্ধে ক্রমাগত শুল্ক বাড়ানোকে স্বাভাবিক সমাধান হিসেবে দেখা যায় না।
আমেরিকার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা কোনও নির্ধারক শর্ত ছিল না। আলোচনার আগে বা চলাকালীন নানা বিষয় আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাবে উঠতে পারে। কিন্তু রুশ তেল কেনার প্রশ্নে ভারতের অবস্থানই চুক্তির পরবর্তী গতিপথ ঠিক করবে—এমন শর্ত আলোচনার টেবিলে রাখা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইউরোপের সঙ্গে আলোচনায় বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলিও সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা হয়েছে। কৃষি, দুগ্ধ ও সয়াবিনের মতো ক্ষেত্রে ভারত নিজের উৎপাদকদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সীতারামন। অর্থাৎ, বিদেশি বাজারে সুযোগ বাড়ানোর সঙ্গে দেশীয় উৎপাদকদের উপর চাপ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই নয়াদিল্লির লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রীর মতে, বহুপাক্ষিক বাণিজ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক দেশ এখন দ্বিপাক্ষিক চুক্তির দিকে বেশি ঝুঁকছে এবং নতুন বাণিজ্য অংশীদার খুঁজছে। তবে এর অর্থ বহুপাক্ষিক সহযোগিতার অবসান নয়। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতকে একই সঙ্গে নতুন বাজারের সুযোগ নিতে, সরবরাহ ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমাতে এবং প্রতিটি বাণিজ্য চুক্তিতে নিজের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে।
আমেরিকার সঙ্গে আলোচনাতেও সেই সীমারেখাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে দরজা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, চুক্তির পথ যে এখনও বেশ খানিকটা বাকি—নির্মলা সীতারামনের মন্তব্যে সেই ছবিই স্পষ্ট।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



