ব্রাজিলে ডান ঝড়

যা জানা জরুরি
- প্রথম দফাতেই জয়ের আশা করেছিলেন লুলা দা সিলভার সমর্থকেরা।
- ক্ষমতাসীন বামপন্থী প্রেসিডেন্টকে পিছনে ফেলে প্রথম দফায় এগিয়ে গেলেন দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো।
- প্রায় সম্পূর্ণ ভোটগণনায় ফ্লাভিওর ঝুলিতে ৪৭.০৩ শতাংশ বৈধ ভোট, লুলার ৪৫.১৬ শতাংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রথম দফাতেই জয়ের আশা করেছিলেন লুলা দা সিলভার সমর্থকেরা। কিন্তু ব্রাজিলের ভোটে এল বড় ধাক্কা। ক্ষমতাসীন বামপন্থী প্রেসিডেন্টকে পিছনে ফেলে প্রথম দফায় এগিয়ে গেলেন দক্ষিণপন্থী ফ্লাভিও বলসোনারো। প্রায় সম্পূর্ণ ভোটগণনায় ফ্লাভিওর ঝুলিতে ৪৭.০৩ শতাংশ বৈধ ভোট, লুলার ৪৫.১৬ শতাংশ। ভোটের ব্যবধান প্রায় ২২ লক্ষ। ফলে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন দু’জন।
অর্থাৎ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এখনও শেষ হয়নি। প্রথম দফায় জিততে প্রয়োজন ছিল বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি। সেই সীমা কেউ ছুঁতে না পারায় এবার সরাসরি লড়াই হবে লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে। তবে প্রথম দফার ফল বিরোধী শিবিরকে নিঃসন্দেহে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রত্যাশার তুলনায় পিছিয়ে পড়ে নতুন করে প্রচারের কৌশল সাজাতে হচ্ছে লুলাকে।
৪৫ বছরের ফ্লাভিও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর বড় ছেলে এবং লিবারেল পার্টির সেনেটর। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ৮০ বছরের লুলা, যিনি চতুর্থ বার, যদিও পরপর নয়, প্রেসিডেন্ট হতে চাইছেন। ফল প্রকাশের পরে ফ্লাভিওর বার্তা ছিল স্পষ্ট—ব্রাজিল পরিবর্তন চাইছে। লুলাও স্বীকার করেছেন, ফল তাঁর প্রত্যাশামতো হয়নি। তবে দ্বিতীয় দফায় লড়াই আরও জোরদার করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
ফ্লাভিওর এই উত্থানের নেপথ্যে অবশ্যই রয়েছে তাঁর বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হারের পর জাইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। তিনি এখন গৃহবন্দি এবং নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য। কিন্তু ভোটের ফল দেখিয়ে দিল, বলসোনারো-ঘরানার রাজনীতি এখনও ব্রাজিলের বড় ভোটব্যাঙ্ককে নাড়াতে পারে।
শুধু পারিবারিক পরিচয়েই ফ্লাভিওর এই সাফল্য নয়। প্রচারে তিনি অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান, সরকারি খরচ কমানো, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রের আকার ছোট করার কথা বলেছেন। ব্রাজিলের বহু ভোটারের কাছে অপরাধ, জীবনযাত্রার খরচ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এখন বড় উদ্বেগ। সেই ক্ষোভকেই নিজের পক্ষে টানতে পেরেছেন ফ্লাভিও।
লুলার শিবিরের সমস্যা অন্য জায়গায়। তাঁর তৃতীয় মেয়াদে অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি এলেও সেই সুফল সব মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সমানভাবে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, পরিবারের ঋণ এবং জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তার সঙ্গে অপরাধ ও নিরাপত্তার প্রশ্নও রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান দেখিয়ে ভোটারদের মন জেতা এবার আগের চেয়ে কঠিন।
আরও বড় ধাক্কা এসেছে কংগ্রেসে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পাশাপাশি সংসদীয় ভোটেও শক্তি বাড়িয়েছে ডানপন্থী শিবির। ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি সেনেটে ১৫ থেকে বেড়ে ২৮টি আসন পাওয়ার পথে, আর নিম্নকক্ষেও দলটি সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। ফলে লুলা দ্বিতীয় দফায় জিতলেও সংসদে নিজের নীতি বাস্তবায়ন করতে তাঁকে আরও কঠিন রাজনৈতিক দরকষাকষির মুখে পড়তে হতে পারে।
বলসোনারো পরিবারের সাফল্যও নজরকাড়া। ফ্লাভিওর পাশাপাশি তাঁর পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে জাইর নিজে ভোটে না থেকেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব যে অটুট, প্রথম দফার ফল তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভোটের মানচিত্রেও স্পষ্ট বিভাজন। ফ্লাভিও দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ ও মধ্য-পশ্চিমের বড় অংশে শক্তিশালী ফল করেছেন, আর লুলা উত্তর-পূর্বে তাঁর পুরনো ঘাঁটি ধরে রেখেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মিনাস জেরাইসেও ফ্লাভিও লুলার উপর এগিয়ে গিয়েছেন। এই আঞ্চলিক বিভাজন দ্বিতীয় দফার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে ফ্লাভিওর সামনে বড় প্রশ্নও রয়েছে। প্রথম দফায় তৃতীয়, চতুর্থ ও অন্যান্য প্রার্থীরা যে ভোট পেয়েছেন, তার একটি অংশ দ্বিতীয় দফায় তাঁকে পেতেই হবে। অন্যদিকে লুলার সামনে রয়েছে আরও বড় কাজ—প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পর নিজের ভোটব্যাঙ্ককে ফের সক্রিয় করা এবং অন্য প্রার্থীদের সমর্থকদের একাংশকে নিজের দিকে টানা। প্রায় ২১ শতাংশ ভোটার প্রথম দফায় ভোট দেননি—দ্বিতীয় দফায় তাঁদের ভূমিকা নিয়েও নজর থাকবে।
দ্বিতীয় দফার লড়াই তাই শুধু লুলা বনাম ফ্লাভিও নয়। এটি এক অর্থে ব্রাজিলের বাম বনাম ডান, পুরনো রাজনৈতিক মেরুকরণ বনাম পরিবর্তনের দাবিরও লড়াই। ফ্লাভিওর প্রচারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বার্তা যেমন রয়েছে, তেমনই লুলা জোর দিচ্ছেন ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে। ফলে ফলের প্রভাব ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়েও পড়তে পারে।
প্রথম দফা তাই লুলার জন্য সতর্কবার্তা, কিন্তু পরাজয়ের সিলমোহর নয়। ফ্লাভিও এগিয়ে থাকলেও প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তাঁকে আরও এক ধাপ পেরোতে হবে। আগামী তিন সপ্তাহে দুই শিবিরের লক্ষ্য একটাই—নিজেদের ভোট ধরে রাখা এবং মাঝখানের ভোটারদের মন জয় করা।
২৫ অক্টোবরের দ্বিতীয় দফাতেই ঠিক হবে, ব্রাজিল কি লুলার হাতে ফিরবে, নাকি বলসোনারো পরিবারের হাত ধরে আরও ডানদিকে ঘুরবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



