International

জিএসটিতে গ্রেফতারের ক্ষমতা কি কমছে? ৭ অক্টোবর পরিষদে বড় আলোচনা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • করকর্তাদের হাতে থাকা গ্রেফতারের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে জিএসটি পরিষদের আগামী বৈঠকে।
  • ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
  • তবে এখনও কোনও আইন বদলায়নি; সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রস্তাব রয়েছে আলোচনার টেবিলেই।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

করকর্তাদের হাতে থাকা গ্রেফতারের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হতে পারে জিএসটি পরিষদের আগামী বৈঠকে। ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলি বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। তবে এখনও কোনও আইন বদলায়নি; সিদ্ধান্ত হয়নি, প্রস্তাব রয়েছে আলোচনার টেবিলেই।

নজরে ৭ অক্টোবর

জিএসটি চালুর প্রায় নয় বছর পর কর প্রশাসনের হাতে থাকা গ্রেফতারের ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবছে কেন্দ্র। অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানির অভিযোগের জেরে আগামী ৭ অক্টোবর জিএসটি পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি উঠতে পারে।

প্রস্তাবটি পরিষদে গৃহীত হলে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে সংশ্লিষ্ট আইনে সংশোধনী আনার পথ খুলতে পারে। তবে আপাতত সেটি শুধুই আলোচনার পর্যায়ে। আইন এখনও বদলায়নি।

‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত আট থেকে নয় মাস ধরে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্যবসায়ী মহলের উদ্বেগও সেই আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষত ব্যাঙ্কিং, বিমা এবং অন্যান্য পরিষেবা ক্ষেত্রে গ্রেফতারের আশঙ্কাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ সামনে এসেছে।

উদ্দেশ্য, করদাতাদের মধ্যে ভয় কমানো এবং ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশে আস্থা ফেরানো।

জালিয়াতিতে ছাড় নয়

তবে গ্রেফতারের বিশেষ ক্ষমতা তুলে দেওয়ার অর্থ ইচ্ছাকৃত কর জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য, জালিয়াতির ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খোলা থাকবে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১–২২ থেকে ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষের মধ্যে কেন্দ্রীয় জিএসটি কর্তৃপক্ষ ৭২,৩৯৩টি অপরাধসংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত করেছে এবং ৮৮৭ জনকে গ্রেফতার করেছে। রাজ্য কর্তৃপক্ষের গ্রেফতার এই হিসাবের বাইরে।

অর্থাৎ, প্রস্তাবটির লক্ষ্য কর ফাঁকির দায় মুছে দেওয়া নয়; বরং কর প্রশাসনের হাতে থাকা গ্রেফতারের বিশেষ ক্ষমতার ব্যবহার নতুন করে নির্ধারণ করা।

আইটিসির ফাঁকফোকর

এই বিতর্কে ‘ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট’ বা আইটিসি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসার কাজে কেনা পণ্য বা পরিষেবার উপর দেওয়া কর নির্দিষ্ট শর্তে পরবর্তী করদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করা যায়।

কিন্তু সমস্যা হয় যখন পণ্য বা পরিষেবা সরবরাহ না করেই চালান তৈরি করা হয়, সেই নথি দেখিয়ে করছাড় নেওয়া হয়, কিংবা ক্রেতার কাছ থেকে কর আদায় করেও সরকারকে তা জমা দেওয়া হয় না। জিএসটি আইনে এই ধরনের অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

তাই গ্রেফতারের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ককে কর ফাঁকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হিসেবে দেখলে ভুল হবে। অভিযোগের ধরন, প্রমাণ এবং কোন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সেগুলি আলাদা প্রশ্ন।

কী বলে আইন?

বর্তমানে কেন্দ্রীয় জিএসটি আইনের ৬৯ ধারায় গ্রেফতারের ক্ষমতা রয়েছে। কমিশনারের কাছে যদি নির্দিষ্ট অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণ থাকে, তা হলে তিনি কোনও কেন্দ্রীয় কর আধিকারিককে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেফতারের অনুমতি দিতে পারেন।

অর্থাৎ, সব ধরনের করবিরোধে ইচ্ছেমতো গ্রেফতারের অনুমতি আইন দেয় না। ১৩২ ধারায় নির্দিষ্ট করে দেওয়া অপরাধ এবং তার শাস্তির বিধানের সঙ্গেই এই ক্ষমতা যুক্ত।

গ্রেফতারের পরেও রয়েছে সুরক্ষার ব্যবস্থা। নির্দিষ্ট আমলযোগ্য ও জামিনঅযোগ্য অপরাধে গ্রেফতার করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ জানাতে হবে এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে রয়েছে পৃথক বিধান।

অর্থাৎ, ক্ষমতা থাকা, ক্ষমতা প্রয়োগের শর্ত এবং গ্রেফতারের পরের আইনি প্রক্রিয়া—তিনটি বিষয় এক নয়।

সতর্ক করেছিল সিবিআইসি

গ্রেফতার নিয়ে সতর্কতার নির্দেশ অবশ্য নতুন নয়। কেন্দ্রীয় পরোক্ষ কর ও শুল্ক পর্ষদ বা সিবিআইসি ২০২২ সালের ১৭ অগস্টের নির্দেশিকায় স্পষ্ট করেছিল, গ্রেফতার কোনও যান্ত্রিক বা নিয়মমাফিক পদক্ষেপ হতে পারে না।

অভিযোগের প্রকৃতি, অপরাধের গুরুত্ব, অভিযুক্তের ভূমিকা এবং তদন্তে তাঁর সহযোগিতা—সবই বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু আইনে গ্রেফতারের ক্ষমতা রয়েছে বলেই তা ব্যবহার করা যথেষ্ট নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ, কর আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে নিছক মতভেদের ক্ষেত্রে গ্রেফতার না করার কথা বলা হয়েছিল। ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকি বা অসাধু উদ্দেশ্যের প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে বলা হয়।

অভিযুক্ত পালিয়ে যেতে পারেন কি না, প্রমাণ নষ্ট বা সাক্ষীকে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, কিংবা তদন্তে তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গ্রেফতার সত্যিই প্রয়োজন কি না—এসব প্রশ্নও বিবেচনায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিরোধ আর জালিয়াতি এক নয়

বিষয়টি সহজ উদাহরণে বোঝা যায়। কোনও লেনদেনের ক্ষেত্রে কোন করের নিয়ম প্রযোজ্য, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও কর বিভাগের ব্যাখ্যা আলাদা হতে পারে। সেই মতবিরোধের নিষ্পত্তি আর সাজানো লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণার তদন্ত এক বিষয় নয়।

প্রথম ক্ষেত্রটিকেও শুরু থেকেই অপরাধ হিসেবে দেখলে ব্যবসায়ীর নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। তাই গ্রেফতার সত্যিই প্রয়োজন কি না, তা আলাদা করে যাচাই করার উপর জোর দিয়েছিল সিবিআইসির নির্দেশিকা।

পুরনো আপত্তি, নতুন করে

এই বিতর্কের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেরও পুরনো যোগ রয়েছে।

জিএসটি পরিষদের সরকারি নথিতে সংরক্ষিত ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের আলোচনায় দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধি করকর্তাদের হাতে গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, ভ্যাট ব্যবস্থায় পুলিশের কাছে এফআইআর করার পথ ছিল। সে ক্ষেত্রে কর প্রশাসনের নিজের হাতেই গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল পশ্চিমবঙ্গ।

মহারাষ্ট্রের অতিরিক্ত মুখ্যসচিবও তখন বলেছিলেন, গ্রেফতার ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা ব্যবসা সহজ করার নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তামিলনাড়ুও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিল।

অন্য দিকে, কয়েকটি রাজ্য কর ফাঁকি ঠেকাতে কঠোর ক্ষমতার পক্ষে ছিল। শেষ পর্যন্ত সীমিত ক্ষেত্রে গ্রেফতার এবং অপব্যবহার ঠেকাতে শর্ত রাখার ভাবনা উঠে আসে। কর নির্ধারণের বিষয়েই যদি অস্পষ্টতা থাকে, সে ক্ষেত্রে গ্রেফতার না করার কথাও আলোচনায় এসেছিল।

শুধু ক্ষমতা সরালেই?

তাই বর্তমান প্রস্তাবের গুরুত্ব শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিধি শিথিল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল প্রশ্ন আরও বড়—কর আদায়ের প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সীমা কোথায় টানা হবে?

গ্রেফতার নিজে শাস্তি নয়। কিন্তু তার তাৎক্ষণিক ব্যক্তিগত ও পেশাগত প্রভাব যথেষ্ট গুরুতর। ফলে অভিযোগ যাচাই এবং কাউকে হেফাজতে রাখার প্রয়োজন—দুই সিদ্ধান্তকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

পরের প্রশ্নটাই বড়

প্রস্তাব কার্যকর হলে কোন অপরাধের তদন্ত কোন পথে এগোবে, কর বিভাগ ও ফৌজদারি তদন্তকারী সংস্থার দায়িত্ব কী হবে—সংশোধনী আইনে সেগুলি স্পষ্ট করা জরুরি।

ব্যবসায়ীদের কাছেও আসল প্রশ্ন হবে, করের দাবি নিয়ে আপত্তি জানানোর বাস্তব সুযোগ কতটা বাড়ল।

শুধু একটি ক্ষমতা সরানোই কি যথেষ্ট? নাকি তার সঙ্গে দরকার আরও স্বচ্ছ তদন্ত, নির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা এবং অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা?

৭ অক্টোবরের আলোচনার পর সেই প্রশ্নগুলিই সম্ভবত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles