জ্ঞানেশ না সরলে ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, ঘোষণা সিজেপির

যা জানা জরুরি
- মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর, শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখাবে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।
- শুক্রবার, ২ অক্টোবর মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে সমাবেশের পর রাতে এই ঘোষণা করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
- দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সমর্থকদের রাজধানীতে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে আগামী ১০ অক্টোবর, শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখাবে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। শুক্রবার, ২ অক্টোবর মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে সমাবেশের পর রাতে এই ঘোষণা করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সমর্থকদের রাজধানীতে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই আন্দোলনের পরবর্তী দিনক্ষণ জানাল সংগঠন।
সমাজমাধ্যম এক্সে দীপকে জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ ইস্তফা না দিলে সারা দেশের ‘ককরোচেরা’ দিল্লি গিয়ে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ জানাবেন। কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। মহাত্মা গান্ধীর দেখানো পথেই আন্দোলন চলবে বলে তাঁর বক্তব্য। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান, এমন প্রত্যেক নাগরিককে এই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন সিজেপি নেতা। তাঁর ভাষায়, এই লড়াই ভারতের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার।
তবে শান্তিপূর্ণ অবস্থানের আশ্বাসের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন দীপকে। তিনি বলেছেন, সরকার ও পুলিশই ঠিক করুক, তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করবে, নাকি ২০ জুলাইয়ের মতো নৃশংসতার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। তাঁর এই মন্তব্যে আগের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ফিরে এসেছে। একই সঙ্গে পরবর্তী কর্মসূচি সামলানোর ক্ষেত্রে প্রশাসনের আচরণের দিকেও নজর টেনেছেন তিনি।
গত জুলাইয়ে নিটের প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে সিজেপির আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল যন্তর মন্তর। ২০ জুলাই সেখানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযানের ঘটনা ঘটে। সেই আন্দোলনের সময় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। পরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পায়। সেই অভিজ্ঞতার পর এবার নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে একই জায়গায় জনসমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠন।
নতুন ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে বহু মানুষ জড়ো হন। সমাবেশে দীপকের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ ও শাবানা আজমি, গায়ক বিশাল দাদলানি, পরিচালক বিশাল ভরদ্বাজ এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী। বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত মুখের এই উপস্থিতি কর্মসূচিটিকে বাড়তি প্রচার দিয়েছে। তবে সমাবেশের কেন্দ্রীয় দাবি ছিল নির্বাচন পরিচালনায় নিরপেক্ষতা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের জবাবদিহি।
মুম্বইয়ের সভায় দীর্ঘ আন্দোলনের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন দীপকে। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম, প্রয়োজন হলে কয়েক দিনের বদলে কয়েক মাস ধরে প্রতিবাদ চলবে। শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে আন্দোলনের অল্প সময়ের মধ্যেই ফের রাস্তায় নামতে হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেন তিনি। সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাসও জানিয়েছেন, জ্ঞানেশ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে। ফলে ১০ অক্টোবরের ঘোষণা ধারাবাহিক চাপ তৈরির পরিকল্পনার অংশ।
এই আন্দোলনের পটভূমিতে রয়েছে এসআইআর এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে অভিযোগ। সিজেপি ও বিরোধীদের বক্তব্য, তালিকা সংশোধনের নামে বহু যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার বিপন্ন হচ্ছে। বিষয়টি তাই কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ত্রুটি নিয়ে আপত্তিতে সীমিত নেই। কারা ভোট দিতে পারবেন এবং সেই অধিকার নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। যদিও নির্বাচন কমিশন ও সরকার অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিতর্ক আরও তীব্র হয় একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পরে। সেখানে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু এবং বিবেক জোশী দশ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন-বিয়োজন, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন এবং তালিকার তথ্য নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অজান্তে নেওয়া হয়েছিল বলেও ওই প্রতিবেদনে অভিযোগের কথা উঠে আসে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এই আপত্তিগুলিকে প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধ হিসেবে দেখানোর ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, খসড়া তৈরির পর্যায়ে প্রশ্ন, পরামর্শ ও মতামত আদানপ্রদান স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। এসআইআরের সময়সূচি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত ছিল বলেও কমিশন জানিয়েছে। ফলে কমিশনের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগ এবং তার সরকারি ব্যাখ্যার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক রয়েছে। সেই বিতর্ককে কেন্দ্র করেই পদত্যাগের দাবিতে চাপ বাড়াচ্ছে আন্দোলনকারীরা।
সিজেপির দাবি অবশ্য জ্ঞানেশের ইস্তফাতেই শেষ হচ্ছে না। সংগঠন আগে এসআইআর স্থগিত রাখা, সংশোধনের আগের ভোটার তালিকা ফিরিয়ে আনা এবং নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ সংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছে। নিয়োগব্যবস্থা বদলানোর ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণও চেয়েছে তারা। এসআইআর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্তের দাবিও রয়েছে। অর্থাৎ একজন পদাধিকারীর পাশাপাশি নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানটির কাজকর্ম ও নিয়োগপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে সিজেপি।
এদিকে শুক্রবার দিল্লিতেও জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় হয়। আম আদমি পার্টি, বামপন্থী সংগঠন, ছাত্রগোষ্ঠী এবং নাগরিক আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন অতিশী, সৌরভ ভরদ্বাজ, মনোজ ঝা এবং যোগেন্দ্র যাদবের মতো পরিচিত মুখ। আটকের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেলেও কয়েকশো মানুষকে আটক করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি ঘোষণায় রাজধানীতে প্রতিবাদের নতুন দিন নির্দিষ্ট হল। তবে ঘোষণা এবং কর্মসূচির প্রশাসনিক অনুমতি এক বিষয় নয়; এখনও পর্যন্ত ওই দিনের অনুমতি মেলার নিশ্চিত তথ্য নেই। দীপকে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কথা বলেছেন, আবার পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে পরবর্তী কয়েক দিনে সংগঠনের প্রস্তুতি, প্রশাসনের অবস্থান এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে। মুম্বইয়ের সমাবেশের পরে দিল্লিতে কত বড় জমায়েত হয়, সেটিও দেখার।
সিজেপির কাছে এটি আগের আন্দোলনের সমর্থনকে নতুন দাবিতে একত্র করার পরীক্ষাও। আর প্রশাসনের সামনে থাকবে সমাবেশ সামলানো এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্ন, যা এবার বিশেষভাবে আলোচিত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



