নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের এক সপ্তাহ পরেও বিপর্যয়ের প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। বুধবার নেপাল পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,১২৭। এখনও নিখোঁজ ৪,৮০০-র বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপ সরানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে মৃতদেহ এবং দেহাংশ উদ্ধার হওয়ায় প্রতি কয়েক ঘণ্টায় বদলে যাচ্ছে সরকারি পরিসংখ্যান। প্রশাসনের আশঙ্কা, চূড়ান্ত মৃত্যুসংখ্যা আরও অনেক বাড়তে পারে।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের বিরাট অংশ ভেঙে পড়ার পর প্রবল জলস্রোত রসুয়া জেলার ভোতে কোশী নদী দিয়ে নেমে আসে। জল, বরফ, পাথর ও কাদার সেই স্রোত ক্রমশ শক্তি সঞ্চয় করে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী উপত্যকার জনপদ, সড়ক, সেতু, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সীমান্তের বাণিজ্যিক পরিকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। বহু মৃতদেহ ঘটনাস্থল থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান, নওয়ালপরাসি, তানাহুন ও গোরখা জেলায় উদ্ধার হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতে। অন্তত ১২টি প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু শ্রমিক এখনও সুড়ঙ্গের ভিতরে আটকে রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা সুড়ঙ্গে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা করে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছেন। তবে বিপর্যয়ের সাত দিন পরে জীবিত উদ্ধারের আশা দ্রুত ক্ষীণ হয়ে আসছে। কয়েকটি জায়গায় ভারী যন্ত্র দিয়ে কাদা ও পাথরের স্তূপ সরানো হলেও নতুন ধসের আশঙ্কায় কাজ বারবার বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি ভারত, চিন, দক্ষিণ কোরিয়া এবং কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশেষজ্ঞ দল উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছে। ড্রোন, অনুসন্ধানী কুকুর, ভূগর্ভে প্রাণের স্পন্দন শনাক্ত করার যন্ত্র এবং ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। বহু মৃতদেহ শনাক্ত করার অবস্থায় না থাকায় পরিবারের সদস্যদের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ-র মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন দেশের কয়েকশো পর্যটক, তীর্থযাত্রী ও শ্রমিক নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।

সরকারি হিসাবে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে বিপর্যস্ত এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বহু প্রত্যন্ত গ্রাম এখনও সড়কপথে বিচ্ছিন্ন। নদীর উপর অস্থায়ী সেতু তৈরি করে সেখানে খাবার, পানীয় জল ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। হেলিকপ্টার থেকেও ত্রাণসামগ্রী ফেলা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে চালু হলেও বহু এলাকায় মোবাইল সংযোগ নেই। ফলে নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় প্রায় ২২ লক্ষ টন কাদা-পাথর ও আবর্জনা জমেছে। প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। দূষিত পানীয় জল, অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়শিবির এবং পচতে থাকা মৃতদেহ থেকে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা শিবির খোলা হয়েছে। বিপর্যস্ত মানুষদের মানসিক আঘাত সামলাতে পরামর্শদাতাও পাঠাচ্ছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, রসুয়ার বিপর্যয় কোনও সাধারণ বন্যা নয়। তাঁর বক্তব্য, হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রায় ১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তার ফলে হিমবাহের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে এবং বরফ-পাথরের বিরাট অংশ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করে তিনি জানান, অনেক উঁচু থেকে হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়ে বরফ ও পাথরের ধস তৈরি করেছিল। সেই ধাক্কায় বিপুল জলরাশি নিচে নেমে এসে ভোতে কোশী উপত্যকাকে ধ্বংস করেছে।

“জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য গোটা বিশ্ব দায়ী; অতএব এই বিপর্যয় মোকাবিলার দায়িত্বও গোটা বিশ্বের”—এই বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, হিমালয়ের দেশগুলির বিপদকে আর স্থানীয় সমস্যা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। দ্রুত হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিকাঠামো নির্মাণের নীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি জোরালোভাবে তোলার কথাও বলেছেন শাহ।

এখন উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছে নেপাল। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশো কোটি ডলার ছাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা—রসুয়ার বিপর্যয় কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; উষ্ণ হতে থাকা হিমালয়ে ভবিষ্যতের আরও ভয়াবহ বিপদের পূর্বাভাস। , সময় যত গড়াচ্ছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও তত কমছে।