International

কেটামিনে সম্মতি কোথায়?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • চারপাশে কী ঘটছে, সেটাও যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
  • কেটামিনের প্রভাবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারেন কেউ কেউ।
  • আর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সেই প্রভাবই নতুন করে তুলছে সম্মতি ও আইনের প্রশ্ন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

কেউ আপনাকে স্পর্শ করছে। আপনি টেরই পাচ্ছেন না। কেউ কথা বলছে, অথচ জবাব দেওয়ার ক্ষমতা নেই। চারপাশে কী ঘটছে, সেটাও যেন ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কেটামিনের প্রভাবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারেন কেউ কেউ। আর যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে সেই প্রভাবই নতুন করে তুলছে সম্মতি ও আইনের প্রশ্ন।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রাক্তন ছাত্রী অভিযোগ করেছেন, ২০২৪ সালে ছাত্রদের একটি ভ্রাতৃসংঘের বাড়িতে পার্টি চলাকালীন তাঁকে বার বার কেটামিন নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তার পর ওই সংগঠনের কয়েক জন সদস্য তাঁকে গণধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ তাঁর। পরিচয় গোপন রেখে ‘জেন ডো’ নামে নিউ ইয়র্ক সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা দেওয়ানি মামলায় কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক ব্যক্তিকে বিবাদী করা হয়েছে।

ঘটনার সময়ে ডো ছিলেন কুড়ি বছরের, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তাঁর দাবি, এর আগে কখনও কেটামিন নেননি। মামলায় অভিযোগ, ‘কাই ফাই’ ভ্রাতৃসংঘের এক সদস্য নিজের পুরুষাঙ্গের উপরে রাখা এক সারি কেটামিন নাক দিয়ে টেনে নিতে তাঁকে ‘আদেশ’ করেছিলেন।

২০২৪ সালে পুলিশি তদন্তকারীদের কাছে দেওয়া বিবৃতিতে ডো বলেন, তাঁর মনে হচ্ছিল যেন তাঁর দু’টি চোখ দু’দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ক্রমশ তিনি সম্পূর্ণ অসাড় হয়ে পড়ছিলেন। তাঁর কথায়, কারা তাঁকে স্পর্শ করেছিলেন, তা তিনি কোনও দিনই জানতে পারবেন না।

ঘটনাটি সামনে আসার পর শুধু ওই মামলাই নয়, নিউ ইয়র্কের ধর্ষণ আইন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, সেখানে কেউ স্বেচ্ছায় মাদক বা অ্যালকোহল গ্রহণ করলে পরে সেই ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলেন না—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করা আইনি ভাবে কঠিন হতে পারে, যদি না প্রমাণ করা যায় যে তিনি শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় ছিলেন।

যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করা অধিকারকর্মী, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের আইনজীবী এবং কয়েক জন আইনজীবীর মতে, এই কাঠামো সেকেলে এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ। তাঁদের বক্তব্য, সম্মতি যে শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, চলতে থাকা যৌন আচরণ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও তার অংশ—আইনে সেই সূক্ষ্ম জায়গাটিই যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুলও শুক্রবার বলেছেন, আইন বদলানো প্রয়োজন।

কেটামিনে কী হয়?

কেটামিন মূলত একটি অবেদনকারী ওষুধ। চিকিৎসায় এর ব্যবহার আইনসঙ্গত। মানসিক স্বাস্থ্যের কিছু সমস্যার চিকিৎসাতেও এটি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বিনোদনের মাদক হিসেবে নেওয়া হলে এর প্রভাব সম্পূর্ণ অন্য রকম অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।

নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক জোসেফ পালামারের মতে, প্রথম বার কেটামিন নেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই ভয়ংকর হতে পারে। কারণ, কী ঘটছে তা বোঝার ক্ষমতাই তখন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কেউ কথা বলতে চাইছেন, কিন্তু মুখ দিয়ে শব্দ বেরোচ্ছে না। কেউ বুঝতে পারছেন যে তাঁর সঙ্গে কিছু ঘটছে, কিন্তু সেটি ঠেকানোর মতো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারছেন না। মাত্রা বেশি হলে বাস্তবতা এবং নিজের শরীর—দুইয়ের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হতে পারে।

অনভিজ্ঞ ব্যবহারকারীরা কখনও কখনও ‘কে-হোল’ নামে পরিচিত অবস্থায় পৌঁছে যেতে পারেন। তখন চারপাশের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোফার্মাকোলজির অধ্যাপক সিলিয়া মর্গ্যানের কথায়, কাউকে বাইরে থেকে দেখে মনে হতে পারে তিনি সচেতন—চোখ খোলা, নির্দেশে সাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু কী ঘটছে, সে সম্পর্কে তাঁর প্রায় কোনও ধারণাই নেই।

আরও বেশি মাত্রায় সেই বিচ্ছিন্নতা প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। মর্গ্যানের মতে, এমন অবস্থায় সম্মতি দেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা থাকা কঠিন।

সমস্যা আরও বাড়ায় মাত্রা নির্ধারণের অনিশ্চয়তা। সামান্য পরিমাণেও তীব্র প্রভাব তৈরি হতে পারে। অনেক ব্যবহারকারী বাড়ির চাবির ডগায় ওঠা গুঁড়োর পরিমাণ দিয়ে কেটামিন নেন। কিন্তু সেটি কোনও নির্ভুল মাপ নয়। ফলে প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি মাত্রা শরীরে চলে যেতে পারে।

‘আপত্তি জানানোর ক্ষমতাটাও সম্মতির অংশ’

কেটামিন ও যৌন সম্মতির সম্পর্কটিই সবচেয়ে জটিল জায়গা।

পালামারের ব্যাখ্যা, কেউ হয়তো যৌন আচরণের একটি পর্যায়ে সম্মত ছিলেন। কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতা চলতে চলতেই কেটামিনের প্রভাব বাড়তে পারে। তখন তিনি হয়তো আর বলতে পারবেন না, ‘এটা আমার ভাল লাগছে না’ বা ‘থামুন’।

এমনকি কেউ তাঁকে স্পর্শ করছে কি না, সেটিও বুঝতে না পারার সম্ভাবনা থাকে। পালামারের কথায়, স্পর্শটি যে অন্য কারও হাতের, সেটিও হয়তো বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে।

অন্যদিকে, কেটামিন সাধারণত যৌন অনুভূতি বাড়ায় না। পালামারের গবেষণায় ব্যবহারকারীরা যৌন অনুভূতি তৈরির ক্ষেত্রে এটিকে তুলনামূলক ভাবে কম কার্যকর মাদক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বরং বেশি মাত্রায় এটি অনুভূতিকে ভোঁতা করে দিতে পারে।

ডো-র অভিযোগ, সেই রাতে তাঁকে বার বার কেটামিন নিতে উৎসাহিত করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাইটেল নাইন তদন্তের কথোপকথনের প্রতিলিপিতেও তাঁর দেওয়া কিছু বার্তার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, তাঁকে কত বার ‘কি’ দেওয়া হয়েছিল, তা তাঁর মনে নেই।

ঘটনার এক সপ্তাহ পরে এক অভিযুক্তকে তিনি বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি এত কেটামিন নিয়েছিলেন যে তাঁর চোখ বেঁকে যাচ্ছিল। তবু তাঁর সঙ্গে যৌনসঙ্গম করা হয়েছিল।

২০২৪ সালে কর্নেল পুলিশের কাছে দেওয়া বিবৃতিতে ডো জানান, রাত যত এগিয়েছিল, তাঁর নেশা তত বেড়েছিল। নিজের নেশার মাত্রাকে দশের মধ্যে প্রায় দশ বলে বর্ণনা করেছিলেন তিনি।

তদন্তকারীদের তিনি বলেছিলেন, জীবনে কখনও এতটা নেশাগ্রস্ত হননি এবং তাঁর মনে হচ্ছিল, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁর নেই।

মদের সঙ্গে বিপদ আরও বাড়ে

কেটামিনের সঙ্গে অ্যালকোহল মিশলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সিলিয়া মর্গ্যানের মতে, দু’টি একসঙ্গে নিলে মানুষ আরও বেশি দিশাহারা হয়ে পড়তে পারেন, মাথা ঘুরতে পারে।

ডো জানিয়েছেন, কেটামিনের পাশাপাশি তাঁকে গাঁজা এবং ‘জামাইকান লিকার’ দেওয়া হয়েছিল। সেটি সম্ভবত উচ্চমাত্রার অ্যালকোহলযুক্ত রাম। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, তখন সব কিছু ঝাপসা লাগছিল এবং ঘটনার স্মৃতিও অত্যন্ত অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।

যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে কেটামিন ব্যবহারের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। জিএইচবি, রোহিপনল, বেঞ্জোডায়াজেপিন বা অ্যালকোহলের তুলনায় কেটামিন শনাক্ত হওয়ার ঘটনা কম হলেও, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদালতে এমন মামলা সামনে এসেছে যেখানে যৌন নির্যাতন সহজ করতে এই মাদক ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

চলতি বছরের গোড়ায় ইংল্যান্ডে ৪৮ বছরের এক ব্যক্তিকে ধর্ষণের দায়ে ১৮ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, তিনি এক নারীকে কেটামিন দিয়েছিলেন এবং মাদকের প্রভাব শুরু হলে তাঁকে ধর্ষণ করেন।

২০২৪ সালে কলোরাডোয় ৪৩ বছরের এক ব্যক্তি একটি শিশুকে অ্যালকোহল, কেটামিন ও কোকেন দেওয়ার অভিযোগে দ্বিতীয় মাত্রার যৌন আক্রমণের অপরাধ স্বীকার করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে শিশুটিকে এতটাই কেটামিন দেওয়া হয়েছিল যে কী ঘটছে, তা বোঝার ক্ষমতাও তার ছিল না।

ওষুধও, মাদকও

কেটামিনের ব্যবহার আমেরিকায় গত দুই দশকে বদলে গেছে। এক সময় এটি মূলত নৈশক্লাবের মাদক হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন পালামারের চলতি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রথম বার কেটামিন নেওয়া ব্যক্তিদের প্রায় অর্ধেক জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের বাড়িতেই প্রথম এটি নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, চিকিৎসার ক্ষেত্রে কেটামিনের একই বিচ্ছিন্নতা তৈরির ক্ষমতা কখনও উপকারী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে তীব্র অবসাদের চিকিৎসায় এর ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। অর্থাৎ, যে বৈশিষ্ট্য বিনোদনের মাদক হিসেবে কাউকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সেটিই অন্য উদ্দেশ্যে কাজে লাগতে পারে।

এই দ্বৈত পরিচয়ই কেটামিনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি করেছে। এক দিকে চিকিৎসায় এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, অন্য দিকে বিনোদনের মাদক হিসেবেও এর ব্যবহার ছড়াচ্ছে। অথচ বিশেষ করে যৌন সম্মতির ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে আইনি বোঝাপড়া এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

নিউ ইয়র্কের বর্তমান আইনে, স্বেচ্ছায় নেশাগ্রস্ত হওয়া ব্যক্তিকে ধর্ষণের ক্ষেত্রে ‘মানসিক ভাবে অক্ষম’ প্রমাণ করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—কেউ নিজে মাদক গ্রহণ করলেও যদি সেই মাদকের প্রভাবে তাঁর চলমান যৌন আচরণ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা চলে যায়, সেই পরিস্থিতিকে আইন কতটা যথাযথ ভাবে চিহ্নিত করছে?

পালামারের কথায়, সম্মতি শুধু শুরুতে ‘হ্যাঁ’ বলার ক্ষমতা নয়। ঘনিষ্ঠতা চলতে থাকলে তা শেষ করে দেওয়ার ক্ষমতাও সম্মতিরই অংশ।

আর কেটামিনের মতো মাদক যখন সেই ক্ষমতাটুকুও কেড়ে নিতে পারে, তখন প্রশ্নটা শুধু মাদক নিয়ে নয়—সম্মতি আসলে কোথায় শেষ হয়ে যায়, সেই প্রশ্ন নিয়েও।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles